এ এক অদ্ভুত বিশ্বকাপ। আবেগ আর উন্মাদনায় যেন ৮৪ বছরের ইতিহাসকে পেছনে ফেলে এগিয়ে চলা। আর্জেন্টিনা আর সুইজারল্যান্ড ম্যাচের কথাই ধরা যাক না। সবাই যখন আরেকটি রুদ্ধশ্বাস পেনাল্টি শুট আউটের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তখন এক ক্ষুদে জাদুকরের বিস্ময়কর ফাইনাল পাস বদলে দেয় সব হিসাব।
তবে এ খেলাকে ঘিরে স্টেডিয়ামের বাইরে উন্মাদনা ছিল আরও বেশি। হাজার হাজার আর্জেন্টাইন সমর্থক সীমান্ত পাড়ি দিয়ে চলে আসেন ব্রাজিলে। সাও পাওলো পরিণত হয় এক গুচ্ছ আর্জেন্টিনায়। অথচ ম্যাচে কোন টিকিট অবিক্রীত ছিল না। যারা এসেছেন তাদের অনেকের হাতেও ছিল না কোন টিকিট। খেলা দেখতে পারবেন কিনা তারও কোন নিশ্চয়তাও নেই।
তবুও আর্জেন্টিনাকে সমর্থন জানাতে ছুটে আসেন তারা। সমর্থকরা জানতেন টিকিটের দাম হবে আকাশছোঁয়া। তবে এতটা আকাশছোঁয়া হবে তা হয়তো তারাও ভাবতে পারেননি। দুই হাজার থেকে তিন হাজার ডলারে বিক্রি হয়েছে টিকিট। যারা খেলা দেখতে এসেছেন তাদের অভিযোগ, শুধু টিকিট কেনার মানুষ আছেন, বিক্রয় করার মতো লোক নেই।
তবে যারা স্টেডিয়ামে ঢুকতে পারেননি তাদের নিরাশ করেনি ফিফা। তাদের বড় পর্দায় খেলা দেখার ব্যবস্থা করা হয়। ‘আর্জেন্টাইন ফ্যান ফিল রাইট অ্যাট হোম’ শীর্ষক প্রতিবেদনে নিউ ইয়র্ক টাইমস ব্রাজিলে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের এ উন্মাদনার বিবরণ দিয়েছে।
এমনকি খেলা শুরু হওয়ার দুই ঘণ্টা আগেই হাজার হাজার আর্জেন্টাইন স্টেডিয়ামের আশপাশে অবস্থান নেন। তাদের হাতে ছিল আর্জেন্টিনার পতাকা, গায়ে ছিল আর্জেন্টিনার জার্সি। সকালের দিকেই অবশ্য উন্মাদনা শুরু হয়ে যায়। একজন সমর্র্থক চিৎকার করে বলছিলেন, আজ আমরা সবাই ভাই।
বোকা-রিভার কোন ব্যাপার নেই। আর্জেন্টিনার প্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাব বোকা জুনিয়র্স এবং রিভার প্লেটের কথা উল্লেখ করে তিনি এ কথা বলেন। দীর্ঘ পরিভ্রমণের পরও তারা ছিলেন উৎফুল্ল। দীর্ঘদিন থেকেই তাদের বিশ্বকাপ স্বপ্ন অধরা। এখন তাদের সামনে বেলজিয়াম।
বেলজিয়ামকে পরাজিত করতে পারলেই সেমিফাইনালে পৌঁছে যাবে আর্জেন্টিনা। আকাশি-নীলের ঢেউয়ের মধ্যেও আশাবাদী ছিলেন কিছু সুইজারল্যান্ডের সমর্থক। যদি বাস্তবতা সম্পর্কেও তাদের জ্ঞান ছিল। খেলা শুরুর আগে সুইজারল্যান্ডের সমর্থক লুকাস বলেন, জার্মানিও পরাজয়ের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। কম হলেও আমাদেরও জেতার সুযোগ রয়েছে।
আর্জেন্টাইন সমর্থকরা সব টিকিট কিনে ফেলেছে বলেও দাবি করেন তিনি। আর্জেন্টাইনরা ছিলেন হাস্যোজ্জ্বল। তাদের জন্য ব্রাজিলই মনে হচ্ছে সবচেয়ে ভাল জায়গা। তারা ফুটবলপ্রেমী। যদিও তারা এখানে এসেছেন আর্জেন্টিনার জয় দেখতে। দিয়েগো ডবসন, মেরিয়ানো রোসাস এবং এন্ড্রিজ রডরিগেজ এসেছেন আর্জেন্টিনার মেনডোজা থেকে।
ডবসন বলেন, এ ভ্রমণ খুবই আনন্দদায়ক। আমরা তিন বন্ধু এক সঙ্গে এসেছি। ব্রাজিলিয়ানরা খুবই অতিথিপরায়ণ। আমরা ফুটবল ভালবাসি। তারাও বিশ্বের অন্যতম সেরা দল। ফার্নান্দো জিমেন্স বুয়েন্স আয়ার্স থেকে ৪০ ঘণ্টা গাড়িতে ভ্রমণ করে এসেছেন। যদিও ফুটবলের কাছে তার এ ভ্রমণ ক্লান্তি তুচ্ছ। তিনি বলেন, আমি এ ম্যাচটি বাড়িতে বসেও দেখতে পারতাম।
কিন্তু এটাই ফুটবলের আকর্ষণ যা আমাকে এখানে টেনে নিয়ে এসেছে। শুধু ব্রাজিল, আর্জেন্টিনাই নয় ব্রাজিলে এখন কলম্বিয়া, উরুগুয়ে, মেক্সিকোর সমর্থকদেরও দেখা যাচ্ছে। এ টুনার্মেন্ট যেন শুধু ব্রাজিলের নয় তা পরিণত হয়েছে দক্ষিণ আমেরিকার আয়োজনে।
সুইজারল্যান্ড বনাম আর্জেন্টিনা ম্যাচ চলাকালে অবশ্য আর্জেন্টিনার সমর্থকরা কিছুটা নীরবই ছিলেন। তারা সুইজারল্যান্ডের রক্ষণাত্মক কৌশলের সমালোচনা করেন। ম্যাচের অন্তিম মুহূর্তে ডি মারিয়া জয় সূচক গোল করেন। একজন সমর্থককে তখন দেখা গেল নীল-সাদা ব্যাগে চুমু খেতে।
নীরব থাকা আর্জেন্টিনাইনরা যেন গর্জে উঠলেন মুহূর্তেই। পতাকা আর শার্ট উড়িয়ে উৎসব করছিলেন তারা। যারা দুই দিন থেকে গাড়িতে ছিলেন এ গোল তাদের জন্য মুক্তির বার্তা নিয়ে আসে। যেন তাদের পরিশ্রম সার্থক হয়েছে। একজন আর্জেন্টিনাইন ফ্যান বলে উঠেন- গতকাল থেকে আমি না ঘুমিয়ে আছি। শেষ পর্যন্ত তা সার্থক হলো।
ঢাকা, ৩ জুলাই (টাইমনিউজবিডি.কম)//এসএইচ





