সতীর্থ নাথান আদ্রিয়ান শেষপ্রান্ত ছোঁয়ার সঙ্গে সঙ্গে দু’হাত প্রসারিত করলেন মাইকেল ফেলপস। জোড় করে চেপে ধরলেন সদা হাস্যোজ্জ্বল ঠোঁট জোড়া। বৈদ্যুতিক উজ্জ্বল আলোয় চিকচিক করে উঠলো চোখের কোণ। বিজয়মঞ্চের দিকে পা বাড়াতে গিয়ে আর লুকাতে পারলেন না। চোখের কোণ থেকে গাল বেয়ে নামলো দু’ফোটা লবণাক্ত জল।
গ্যালারিতে বসে ছিলেন বাগদত্তা নিকোল জনসন। তার অশ্রু বিন্দুটুকু আরো ঝলমলে। আরো উজ্জ্বল। তিন মাসের ছোট্ট শিশু বুমারও যেন ফুপিয়ে উঠছেন মায়ের বুকে মাথা রেখে। রিও থেকে সেই কান্নার সুর প্রতিধনিত হলো পৃথিবীর আনাচে-কানাচে।
কিংবদন্তির বিদায়ে কাঁদছে পুরোবিশ্ব। অলিম্পিক পুল আর হয়তো হাসবে না সর্বশ্রেষ্ঠ অলিম্পিয়ানের আকর্ণ বিস্তৃত হাসিতে। দেশের হয়ে ৪–১০০ মিটার মিডলেতে স্বর্ণজয়ের আনন্দ মিশ্রিত কান্নায় সাঁতারকে বিদায় জানালেন ফেলপস।
বছর ১৬ আগে সিডনি অলিম্পিকে অভিষেক হয়েছিল কৈশোরের গন্ধ গায়ে মাখা এক তরুণের। বিদায় বেলায় যখন দু’দাত প্রসারিত করলেন, সেই হাতের আলো যেন ছাপিয়ে যেতে চাইলো রিও ডি জেনিরোর স্ট্যাচু অব দ্যা ক্রাইস্টরেডিমারের ঔজ্জ্বল্যকেও। সত্যিকারের কিংবদন্তির মতোই বিদায় নিলেন ফেলপস।
লন্ডন অলিম্পিকের পরও একবার এমন করুণ সুর বেজেছিল কোটি মানুষের প্রাণে। ফিরে এসেছিলেন ফেলপস। কিন্তু এবার আর না। কিংবদন্তি জানিয়ে দিলেন, ‘বাস থেকে নেমে পুলে হেঁটে আসা পর্যন্ত কান্না থামাতে পারছিলাম না। শেষ প্রস্তুতি, শেষবারের মতো সুট গায়ে পড়া, মানুষের সামনে হাঁটা, দেশের প্রতিনিধিত্ব করা। স্বপের মতো শেষ হলো আমার ক্যারিয়ার।’
একটু কী ভুল হলো না! এতবড় স্বপ্ন দেখার সাহস দেখতে পারে পৃথিবীর ক’জন মানুষ? এথেন্সে চারটি, বেইজিংয়ে আটটি, লন্ডনে চারটি, রিও-তে পাঁচটিসহ মোট ২৩ বার বিজয়মঞ্চে স্বর্ণজয়ের গর্বে হেসেছেন। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্বর্ণজয়ী রাশিয়ান লরিসা লাতিনিনার চেয়ে সংখ্যাটা দ্বিগুণেরও বেশি। সব মিলিয়ে ২৮ টি অলিম্পিক পদক। রিও অলিম্পিকে না আসলেও ফেলপসের কিংবদন্তি অভিধাটা খাটো করতে পারত না তার কোনো আজন্ম নিন্দুকও।
তারপরও কোথায় যেন আক্ষেপ ছিল সর্বশ্রেষ্ঠ অলিম্পিয়ানের। বছর দুয়েক আগে মাদকাসক্ত অবস্থায় গ্রেফতার হয়েছিলেন বাল্টিমোরের রাস্তায়। এরপর পুনর্বাসন কেন্দ্রে পর্যন্ত যেতে হয়েছে। হয়তোবা চাঁদের কলঙ্কের মতো সেই দাগটুকু মুছতেই আবার ফিরে এসেছিলেন পুলে। বিদায় বেলায় ফেলপসের কণ্ঠে তাই গর্বের হাসি, ‘গত দুই বছরের কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে গিয়েছি আমি। সেটাকে পিছনে ফেলতে পেরে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ। ফিরে আসতে চেয়েছিলাম সেথায়, যেটা আমার জায়গা।’
হ্যাঁ, ফেলপসের জায়গাটা শুধু ফেলপসেরই। সেখানে অদ্বিতীয় কিংবদন্তি। শুধু সাঁতার নয়, অলিম্পিককে বদলে দিয়েছেন যিনি। নিজের অর্জনগুলোকে যিনি নিয়ে গেছেন অতিমানবীয় পর্যায়ে। যার উজ্জ্বল আলোর দ্যুতি ঠিকরে পড়বে আগামী দিনের অ্যাথলেদের স্বপ্নালু চোখে। অথচ সে আলো আলেয়ার মতো হয়তো অধরাই থেকে যাবে চিরকাল।
এসএ/টাইম





