ঘড়ির কাটা ঘুরছে উল্টো। কমছে সময়। এখন আর দিনের হিসেব নেই, মাত্র কয়েক ঘন্টা বাকি। তারপরই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ উৎসবে মেতে উঠবে সিলেটবাসী। নতুন করে বিশ্বের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে যাবে সিলেটের নাম। আর সেই মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায় প্রহর গুণছে সিলেটের আপামর ক্রিকেট ভক্ত-অনুরাগীরা, সাধারণ জনতা।
ক্রিকেটের এ আয়োজন আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে সুন্দর ক্রিকেট ভেন্যু সিলেটের চাবাগান আর টিলা বেষ্ঠিত লাক্কাতুরাস্থ বিভাগীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে ছেলে ও মেয়েদের বেশ ক’টি ম্যাচ। চলবে ১৭ মার্চ থেকে ৩ এপ্রিল পর্যন্ত। এর মধ্যে ১৭, ১৯ ও ২১ মার্চ প্রতিদিন দু’টি করে ছেলেদের মোট ৬টি ম্যাচ এই মাঠে অনুষ্ঠিত হবে।
বিশ্বকাপ টি-টোয়েন্টি উপলক্ষে সকল প্রস্তুতি ইতিমধ্যে সম্পন্ন করেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি), সিলেট বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থা, সিলেট সিটি করপোরেশন, সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশসহ সংশ্লিষ্টরা। ইতিমধ্যে সিলেট বিভাগীয় স্টেডিয়ামের দায়িত্ব নিয়েছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি)। সিলেট নগরীকে সাজানো হয়েছে বর্ণিল রঙে। রাস্তায় রাস্তায় অঙ্কিত হয়েছে আঁলপনা। প্রস্তুত করা হয়েছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য শোভিত সিলেটের বিনোদন কেন্দ্রগুলোও।
এদিকে, বিশ্বকাপ টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের সিলেটের পর্ব সফলভাবে সম্পন্ন করতে সেনা, র্যা ব ও পুলিশের সমন্বয়ে নিশ্চিদ্র নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে। খেলোয়াড়দের নিরাপত্তায় বৃহস্পতিবার নগরীতে বিশেষ মহড়া করেছে আইনশৃংখলাবাহিনী।
মহড়া শেষে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মো. মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, গুরুত্বপূর্ণ এই খেলায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের খেলোয়াড়, কর্মকর্তা ও দর্শকরা সিলেটে আসবেন। এ উপলক্ষে নিরাপত্তা বাহিনীর সর্বোচ্চ সংখ্যক মোতায়েন করা হয়েছে। এতে রয়েছে পুলিশ, সেনা ও র্যাববের একাধিক টিম। তবে তিনি এর নির্দিষ্ট সংখ্যা বলতে রাজি হননি।
নতুন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ভেন্যু সিলেট বিভাগীয় স্টেডিয়ামে প্রথম খেলতে প্রথমবারের মতো সিলেটে আন্তর্জাতিক দল হিসেবে শুক্রবার সিলেটে এসেছে জিম্বাবুয়ে টিম। এ দিনই থেকেই সিলেটে আসবে আরো ৩টি দল। সোমবারের প্রথম ম্যাচে জিম্বাবুয়ের মুখোমুখি হবে আইসিসি’র সহযোগি সদস্য আয়ারল্যান্ড।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, হোটেল রোজভিউ, নির্ভানা ইন আর হোটেল স্টার প্যাসিফিকে অবস্থান করবে দলগুলো। বিশ্বকাপ ক্রিকেটের প্র্যাকটিস গ্রাউন্ড সিলেট জেলা স্টেডিয়াম ও ক্যাডেট কলেজ মাঠে প্র্যাকটিস করবে দলগুলো। এরই মধ্যে জেলা স্টেডিয়ামে অনুশীলনের ৮টি প্র্যাকটিস উইকেট প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রস্তুত আছে ক্যাডেট কলেজের ৪টি প্র্যাকটিস উইকেটও।
বিশ্বকাপ উপলক্ষে সিলেট নগরীকে সাজানো হচ্ছে বর্ণিল সাজে। এজন্য রাতদিন কাজ করে যাচ্ছে সিটি করপোরেশন, বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থা ও বিসিবি। চা বাগান আর টিলাঘেরা এই স্টেডিয়ামটির উন্নয়ন, সংস্কার ও সৌন্দর্য্য বর্ধনের কাজও শেষ হয়েছে ইতোমধ্যে।
বিশ্বকাপ উপলক্ষে সিলেট নগরীকে জঞ্জালমুক্ত করতে সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে সকল অবৈধ বিলবোর্ড, সাইনবোর্ড, ব্যানার ও ফেস্টুন উচ্ছেদ করা হয়েছে। উচ্ছেদ করা হয়েছে ফুটপাত থেকে হকার। যানজট নিরসনে ব্যস্ততম সড়কে রিকশার জন্য আলাদা লেন করা হয়েছে।
বিশ্বকাপ খেলতে আসা খেলোয়াড় ও ক্রীড়ানুরাগীদের কাছে সিলেটকে অনান্যভাবে তুলে ধরতে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে সার্কিট হাউসের সামনে থেকে ক্রিকেট স্টেডিয়াম পর্যন্ত রাস্তায় আল্পনার রঙে রাঙিয়ে তোলা হয়েছে। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষার্থীরা স্বেচ্ছাশ্রমে এই আলপনা আঁকেন।
এছাড়া বিসিবি ও সিলেট বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার উদ্যোগে নগরীর বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে বিশাল বিলবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে। বিলবোর্ডগুলোতে বাংলাদেশ ক্রিকেটের স্মরণীয় মূহুর্তগুলোকে বন্দি করা হয়েছে।
সিলেটে বিশ্বকাপের উত্তাপ ছড়িয়ে দিতে দুই সপ্তাহ ধরে বিশ্বকাপের থিম সং পরিবেশন করছে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাথীরা। তারা নগরীর ব্যস্ততম রাস্তায় থিম সং ‘চার ছক্কা হই হই...’ এর সাথে নৃত্য পরিবেশন করে ক্রিকেটপ্রেমীদের উজ্জীবিত করে রেখেছে।
বিশ্বকাপের প্রস্তুতি প্রসঙ্গে সিলেট বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক ও বিসিবির পরিচালক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল বাসস’কে বলেন, বিশ্বকাপ খেলার জন্য সিলেট ভেন্যু সম্পূর্ণ প্রস্তুত। স্টেডিয়ামের প্রধান ফটক থেকে মূল সড়ক পর্যন্ত রাস্তার উভয় পাশ বর্ণিল সাজে সাজানো হয়েছে। নগরীতে বিলবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে। সিলেটের ইতিহাস ঐতিহ্য তুলে ধরে আরো বিলবোর্ড স্থাপন করা হবে।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপকে সামনে রেখে গত বুধবার সিলেট বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার উদ্যোগে সিলেট ক্রিকেট স্টেডিয়ামের মিডিয়া রুমে এক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সংবাদ সম্মেলন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে স্থানীয় ও জাতীয় দৈনিক এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় কর্মরত সাংবাদিকরা কিভাবে সংবাদ কাভার করবেন সেই সম্পর্কে সিলেট বিভাগীয় বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক ও বিসিবির পরিচালক শফিউল ইসলাম চোধুরী নাদেল বর্ণনা করেন। তার সঙ্গে এ সময় উপস্থিত ছিলেন সিলেট ভেন্যু সিকিউরিটির দায়িত্বে থাকা নাজমুল হাসান, সিলেট জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হালিম, সিলেট বিভাগীয় বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার সহ-সাধারণ সম্পাদক জুম্মান আব্বাস রাজু প্রমুখ।
বিশ্বকাপের প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চাইলে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী বাসসকে বলেন, এটি প্রথম আয়োজন যার জন্য দীর্ঘদিন যাবত অপেক্ষায় ছিলো সিলেটবাসী। আমরা সিলেটকে এমনভাবে উপস্থাপন করতে চাই, বিশ্ববাসী যা দেখে অভিভূত হবে। সিলেটকে জানবে এবং যার ফলে বিশ্বের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সিলেটীরা তাদের কাছে সম্মানের পাত্র হবে।
তিনি বলেন, বিশ্বকাপকে সামনে রেখে সিলেট নগরীর সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক গুলোতে আল্পনা আঁকা হয়েছে। এছাড়া নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক হুমায়ুন রশিদ চত্তর, কিন ব্রিজ, নাইওরপুল, সুবহানিঘাট, চৌহাট্টা, আম্বরখানা, মজুমদারি, সিলেট আন্তর্জাতিক স্টেডিয়াম, সিলেট জেলা স্টেডিয়াম, রিকাবি বাজারসহ বিভিন্ন জায়গায় রাস্তার পাশে বসানো হয়েছে একাধিক কাউন্টডাউন ঘড়ি, দৃষ্টিনন্দন বিলবোর্ড। স্থানে স্থানে লাগানো হচ্ছে ফেস্টুন।
চলছে নগরীতে ব্যাপক পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা অভিযান। প্রায় চারশত শ্রমিকের সমন্বয়ে শুরু হয়েছে এই পরিচ্ছন্নতা অভিযান। সিলেট নগরীকে দেশী-বিদেশী অতিথিদের সামনে সুন্দর করে তুলে ধরতে চলছে এই কর্মযজ্ঞ।
জমকালো এই আসরকে ঘিরে পুরো নগরী জুড়েই উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। গুরুত্বপূর্ণ সড়কের পাশে অতিথিদের স্বাগত জানিয়ে বসানো হয়েছে ‘ওয়েলকাম টু সিলেট’ লেখা সম্বলিত বিলবোর্ড। যেখানে রয়েছে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর জাতীয় পতাকা।
২০০৯ সালে সাউথ এশিয়ান গেমসের উশু ইভেন্ট সিলেটে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সিলেট বিকেএসপিতে অনুষ্ঠিত ইভেন্টটি ছিল সিলেটের ক্রীড়া ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ক্রীড়া ইভেন্ট। এবার সাউথ এশিয়ান গেমসকে ছাপিয়ে বিশ্বকাপ টি-টোয়েন্টি ২০১৪ সিলেটের ক্রীড়া ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আয়োজন হিসেবে জায়গা করে নিতে যাচ্ছে।
আর সেই মাহেন্দ্রক্ষণ যত ঘনিয়ে আসছে ক্রিকেট ভক্তদের মাঝে তত উত্তেজনা বিরাজ করছে। সবাই কেবল অপেক্ষার প্রহর গুণছেন। সিলেটে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বকাপ প্রসঙ্গে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ এমসি কলেজের অনার্স ১ম বর্ষের (পুরাতন) শিক্ষার্থী সাহের আহমদ বলেন, ভাষায় বুঝিয়ে বলার সুযোগ নেই। কি যে ভাল লাগছে। নিজেদের বাসার পাশে আন্তর্জাতিক এতো বড় একটি আয়োজন হবে কিছুদিন আগেও তা কল্পনা করতে পারিনি।
একই কলেজের ইংরেজী শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী কেয়া দেশাই বাসস’কে বলেন, আমি মেয়েদের ক্রিকেট ম্যাচ দেখবো। টিকিটও সংগ্রহ করেছি। টিকিট হাতে পাওয়ার পর আমার এতো ভাল লেগেছিলো যে জন্য আমি ভাই-বোনদের মাঝে মিষ্টি বিতরণ করেছি।
নিজেদের মাটিতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ব্যাট-বলের লড়াই উপভোগ থেকে বঞ্চিত হতে চান না কেউই। তাইতো বিশ্বকাপের ‘সোনার হরিণ’ টিকিট হাতে পেতে তাই মরিয়া সবাই। গতকাল বৃহস্পতিবার সিলেট আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামের মূল ফটকে গিয়ে দেখা যায় দেয়া হচ্ছে মেয়েদের ম্যাচের টিকিট। লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন হাজার হাজার ক্রিকেটভক্ত। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় লিডিং ইউনিভার্সিটির ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী ইয়ামিন বাসস’কে বলেন, ন্যাশনাল আইডি কার্ড দেখিয়ে চারটি টিকিট সংগ্রহ করা যায়। আমি টিকিট পেয়েছি। এখন পরিবারের সবাইকে নিয়ে খেলা উপভোগ করতে পারবো।
সিলেট ক্রিকেট স্টেডিয়ামের শ্রেষ্টত্ব আর সিলেটের ইতিহাস ঐতিহ্য প্রমাণ দিতেও প্রস্তুত সিলেটের জনসাধারণ। আর তাই প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ভেন্যু নিয়ে বেশ সতর্ক এই অঞ্চলের সর্বস্তরের ক্রীড়ামোদি সচেতন মহল। ক্রীড়াবিদ মান্না চৌধুরী বাসস’কে বলেন, সবাই এক বাক্যে স্বীকার করবেন সিলেট আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামটি বিশ্বের অত্যন্ত সুন্দর ১০টির একটি। এই স্টেডিয়ামে একটি গ্রীণ গ্যালারি রয়েছে যা অন্য কোথাও নেই। এর স্বীকৃতি দিয়েছেন স্বয়ং আইসিসিও।
সিলেট ক্রিকেটার্স এ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি রেজাউল করিম নাচন বাসসকে বলেন, আমরা সবর্দা সতর্ক এবং আমাদের দর্শকরাও বেশ সচেতন। আশা করি বিশ্বের অতিথিরা আমাদের কাছ থেকে সিলেটোচিত সম্মান আর আতিথেয়তা পাবেন। এর ব্যাত্যয় হবে না।
সবমিলে এক ক্রিকেট মহাযজ্ঞের অপেক্ষায় এখন সিলেটবাসী। আর অপেক্ষা ‘চার-ছক্কা হই হই, বল গড়াই গেলো কই’ এই শ্লোগানে মেতে উঠার।