ড্যানিয়েল পেরেইরা বাড়িতে টেলিভিশনের সামনে বসে থাকতে পারলেন না। ছুটলেন কাজে। নিজ দেশের এমন লজ্জাজনক ভরাডুবি সহ্য করার মতো ছিল না। একটি হোটেলের কেরানি পদে কর্মরত ৩৩ বছর বয়সী ড্যানিয়েল বলছিলেন, আমরা নার্ভাস, তবে আমাদের আবেগটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। পরাজয়টা কি ব্রাজিল ক্ষমার চোখে দেখবে, এমন প্রশ্নে পেরেইরা বলেন, এটা বোঝা যাবে না। তাদের জিততে হবে।

আমরা আমাদের নিজ দেশে খেলছি এবং ব্রাজিল ফুটবল আমাদের দেশের হয়ে লড়াই করছে। সবাই জানতেন, ব্রাজিলের ক্ষুরধার আক্রমণ শানানোর নায়ক নেইমারের ইনজুরি ও দুটি হলুদ কার্ড খেয়ে রক্ষণভাগের নেতৃত্ব দেয়া খেলোয়াড় থিয়াগো সিলভার অনুপস্থিতিতে কাজটা সহজ হবে না ব্রাজিলের জন্য।

তাই বলে জার্মানির কাছে ৭-১ গোলের লজ্জাজনক ব্যবধানে এমন অসহায় আত্মসমর্পন। অবিশ্বাস্য! অচিন্তনীয়! অকল্পনীয়! সেটডিয়ামে ৬০ হাজার দর্শক এই দৃশ্য দেখলেন আর চোখ মুছলেন। এর বাইরে দুনিয়ার কোটি কোটি ব্রাজিলিয়ান সমর্থক হতাশার অন্ধকারে নিমজ্জিত হলের টেলিভিশন সেটের সামনে। দুনিয়ার তামাম মিডিয়ায় নানা বিশ্লেষণ।

এই লজ্জাজনক হারকে কিভাবে বর্ণনা করবে ব্রাজিলের মিডিয়া? ব্রাজিলের অন্যতম প্রভাবশালী দৈনিক ফোলহা ডি সাও পাওলোর অনলাইন সংস্করণে শিরোনাম হয়েছে, ‘ঐতিহাসিক লজ্জা’। বিশ্বকাপের ৮৪ বছরের ইতিহাসে এত বড় বিপর্যয় দেখা যায়নি। সেমিফাইনালের মতো জেতা-মরার ম্যাচে ৬ মিনিটেই ব্রাজিলের জালে ৪ বার বল পাঠালো জার্মানি।

এরপর আরও তিন তিনবার। চরম অবমাননার সম্মুখীন ফুটবলের দেশ ব্রাজিলকে। কোচ লুইজ ফেলিপে স্কলারি ব্যর্থ চেষ্টা করলেন নিজেকে আড়াল করার। গ্যালারির গ্র্যান্ডস্ট্যান্ডে এক কিশোর ও এক নারী কেঁদে বুক ভাসালেন। অবিশ্বাস আর হতাশায় মুষড়ে পড়া কান্না। পুরো স্টেডিয়াম থমথমে। বিশ্বের কোন দেশই ফুটবলের সঙ্গে ব্রাজিলের মতো এতোটা নিবিড়ভাবে যুক্ত নয়। ব্রাজিলে ফুটবল যেন ঈশ্বর! কোন দেশই ব্রাজিলের চেয়ে বেশি বিশ্বকাপ জেতেনি।

তাদের চেয়ে এ হারের লজ্জা অন্য কোন জাতির কাছে বড় নয়। স্কলারি বলেছেন, জাতির কাছে আমরা ক্ষমাপ্রার্থী। এই ম্যাচে সব হারিয়েছে ব্রাজিল। তাদের বিরুদ্ধে তাদেরই মাঠে তাদেরই দেশের গর্ব রোনাল্ডোর রেকর্ড ভেঙে বিশ্বকাপ আসরে ১৬টি গোল করে নতুন রেকর্ড গড়েছেন জার্মানির মিরোস্লাভ কোসা।

অ্যামাজন জঙ্গলের ধার ঘেঁষে থাকা নোভা বেলো হরিজন্তের দূরবর্তী গ্রামগুলো যেখানে আজও বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি, তারাও ডিজেলের জেনারেটর দিয়ে টেলিভিশনে খেলা দেখেছেন। বহু ব্রাজিলিয়ান প্রথমার্ধের পর যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গেছেন। টেলিভিশন বন্ধ করে দিয়েছেন।

জার্মানিও ব্রাজিলের এহেন পরাজয়ে স্তম্ভিত। কোচ জোয়াচিম লো ব্রাজিলের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। প্রতীকী শেষকৃত্য বলা যায় এটাকে। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট দিলমা রুসেফও দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে একটি টুইট করেছেন। লিখেছেন, আমাদের সবার জন্য ভীষণ ব্যথিত আমি।

ঢাকা, ৯ জুলাই, (টাইমনিউজবিডি.কম)//এসএইচ