যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় গত এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির পর এটিকে সবচেয়ে ভয়াবহ বোমাবর্ষণের রাত হিসেবে আখ্যা দেওয়া হচ্ছে। হামলার তীব্রতায় রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং হাজারো মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে বেরিয়ে পড়েন।

যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন ও নেতানিয়াহুর হুঁশিয়ারি

যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও উভয় পক্ষই বারবার তা লঙ্ঘন করেছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান শান্তি আলোচনা চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে।

গত সোমবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু হিজবুল্লাহর ওপর হামলার গতি ‘আরও বাড়ানোর’ নির্দেশ দেন। মঙ্গলবার নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার বৈঠকে তিনি লেবাননের ভেতরে ইসরায়েলি অভিযান আরও গভীরে নেওয়ার কথা জানান।

নেতানিয়াহু বলেন, "আইডিএফ স্থলভাগে বড় শক্তি নিয়ে অভিযান চালাচ্ছে এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা দখল করছে। উত্তর ইসরায়েলের জনগণকে হিজবুল্লাহর হামলা থেকে রক্ষা করতে আমরা নিরাপত্তা বলয় আরও শক্তিশালী করছি। আমরা তাদেরকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেব।"

মাশগারায় ধ্বংসযজ্ঞ এবং বেঁচে ফেরা ছোট্ট মোহাম্মদ

বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, পুরো লেবাননজুড়ে প্রায় ৫০টি স্থানে ডজনখানেক হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বেকা উপত্যকার মাশগারা গ্রাম।

ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়া শৈশব: মাশগারায় বেশ কয়েকটি বাড়ি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। ধ্বংসস্তূপ থেকে একজন নারী ও দুই শিশুসহ ১১ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং আহত হয়েছেন আরও ১৫ জন।

মোহাম্মদের বয়ান: ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে ৭ বছরের শিশু মোহাম্মদকে গভীর রাতে জীবিত উদ্ধার করা হয়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটি জানায়, "ঘুম ভাঙার পর আমি নড়াচড়া করতে পারছিলাম না। চারদিকে শুধু অন্ধকার ছিল। পরে উদ্ধারকর্মীদের শব্দ শুনতে পাই।" মর্মান্তিক এই হামলায় মোহাম্মদের বাবা ও দুই বোন নিহত হয়েছেন।

বর্তমানে মাশগারা গ্রামটি প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়েছে এবং জীবনযাত্রা কার্যত স্থবির। এছাড়া কিছু হামলা ইউনেস্কো স্বীকৃত প্রায় ৯০০ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক বিউফোর্ট দুর্গের কাছাকাছি এলাকায়ও আঘাত হেনেছে।

পাল্টাপাল্টি দাবি ও হতাহতের পরিসংখ্যান

ইসরায়েলের দাবি: ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর দাবি, তারা দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর ব্যবহৃত ১০০টির বেশি অবকাঠামো, অস্ত্রাগার, কমান্ড সেন্টার ও নজরদারি পোস্টে হামলা চালিয়েছে এবং ‘সন্ত্রাসীদের নির্মূল’ করেছে।

হিজবুল্লাহর জবাব: ইসরায়েলের যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের জবাবে হিজবুল্লাহ উত্তর ইসরায়েলের তিনটি ব্যারাক ও একটি সামরিক পোস্টে রকেট ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।

মোট প্রাণহানি: লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, চলমান সংঘাতে ইসরায়েলি হামলায় লেবাননে এ পর্যন্ত অন্তত ৩,১৮৫ জন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে, ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া সংঘাতে হিজবুল্লাহর হামলায় ২৩ জন ইসরায়েলি সেনা ও একজন বেসামরিক ঠিকাদার নিহত হয়েছেন।

নতুন করে বিভিন্ন এলাকা খালি করার ইসরায়েলি নির্দেশের পর লেবাননের সাধারণ মানুষের মাঝে মানবিক সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে।

এমএম