অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ হয়। ১০৬ মিনিটে নিকো উইলিয়ামসের বাড়ানো বল থেকে গোল করেন ফেরান তোরেস। তার এই গোলেই বিশ্বকাপ ফাইনালের নাটকীয় সমাপ্তি ঘটে।
এর আগে ম্যাচের শুরুতেই এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিল স্পেন। পঞ্চম মিনিটে লামিন ইয়ামাল প্রায় গোল করে ফেলেছিলেন। বক্সে তার দেওয়া ক্রস ডিফ্লেক্ট হয়ে দানি ওলমোর কাছে যায়। ওলমো আবার বল ফিরিয়ে দেন ইয়ামালের দিকে। তবে লিসান্দ্রো মার্টিনেজ ও গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গোলবঞ্চিত হয় স্পেন।
শুরু থেকেই দুই দলের আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণে জমে ওঠে ফাইনাল। মিকেল ওইয়ারসাবাল দারুণ ফ্লিকে পেদ্রো পোরোর দিকে বল বাড়িয়েছিলেন। তাকে ফাউল করেন অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার। তবে রেফারি স্লাভকো ভিনসিক সেই আবেদনে সাড়া দেননি।
স্পেন শুরুটা ভালো করলেও আর্জেন্টিনাও কয়েকবার আক্রমণে ভয় তৈরি করে। সপ্তম মিনিটে মেসির নিশ্চিত গোলের সুযোগ নষ্ট করেন স্পেনের গোলরক্ষক উনাই সিমন। দ্রুত এগিয়ে এসে তিনি মেসির শটের পথ বন্ধ করেন।
ম্যাচের প্রথম ২৩ মিনিটে বল দখলে বড় ব্যবধানে এগিয়ে ছিল স্পেন। এ সময় আর্জেন্টিনা বল নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে মাত্র ৩২ শতাংশ। তাদের তিন ফরোয়ার্ড লিওনেল মেসি, নিকো গঞ্জালেজ ও হুলিয়ান আলভারেজ মিলে বল স্পর্শ করেন মাত্র ১৭ বার।
স্পেন অধিনায়ক রদ্রি পুরো মাঠজুড়ে প্রভাব বিস্তার করেন। মাঝমাঠের পাশাপাশি প্রয়োজনে রক্ষণেও তৃতীয় সেন্টার ব্যাকের ভূমিকা পালন করেন তিনি। তার নিয়ন্ত্রণে আর্জেন্টিনার জন্য মাঝমাঠে জায়গা তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ে।
৩৯ মিনিটে দারুণ সমন্বিত আক্রমণ গড়ে স্পেন। লাপোর্তে, রদ্রি ও বায়েনার পরস্পরের মধ্যে বল আদান-প্রদানের পর ফাবিয়ান বল বাড়িয়ে দেন ওইয়ারসাবালের দিকে। বক্সের পাশ থেকে তার শক্তিশালী বাম পায়ের শট নিচে ঝাঁপিয়ে ঠেকান মার্টিনেজ।
৪১ মিনিটে ওইয়ারসাবালকে ফাউল করে ফাইনালের প্রথম হলুদ কার্ড দেখেন লিসান্দ্রো মার্টিনেজ। এর দুই মিনিট পর চোটের কারণে তাকে মাঠ ছাড়তে হয়। তার জায়গায় নামেন নিকোলাস ওতামেন্দি। একই সময়ে কুকুরেয়ার একটি শট অল্পের জন্য পোস্টের পাশ দিয়ে চলে যায়।
প্রথমার্ধে বল দখল ও আক্রমণে এগিয়ে ছিল স্পেন। বিরতির আগে তারা ৬৫ শতাংশ সময় বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখে, যেখানে আর্জেন্টিনার দখলে ছিল ৩৫ শতাংশ। লক্ষ্যে শট নেয় স্পেন দুটি। সফল পাসেও বড় ব্যবধানে এগিয়ে ছিল তারা—স্পেনের ৩১৩টি পাসের বিপরীতে আর্জেন্টিনার ছিল ১৫৫টি। ফাইনাল থার্ডে স্পেন প্রবেশ করে ৩৫ বার, আর্জেন্টিনা মাত্র ১৮ বার।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই পরিবর্তন আনেন আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি। প্রথমবার শুরুর একাদশে থাকা নিকো গঞ্জালেজকে তুলে লিয়ান্দ্রো পারেদেসকে মাঠে নামান তিনি।
দ্বিতীয়ার্ধের দ্বিতীয় মিনিটেই সুযোগ তৈরি করে স্পেন। ওইয়ারসাবালের পাস থেকে বায়েনার শট অবশ্য দুর্বল হওয়ায় সহজেই ধরে ফেলেন মার্টিনেজ।
মাঠে নামার পর পারেদেসের শুরুটা ভালো হয়নি। রদ্রিকে পেছন থেকে ধাক্কা দেওয়ায় হলুদ কার্ড দেখেন তিনি। সিদ্ধান্ত নিয়ে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা রেফারির সঙ্গে কথা বলেন। পরে ওলমো মাঠে পড়ে যান।
৫৫ মিনিটে গুরুত্বপূর্ণ ট্যাকেলে আর্জেন্টিনাকে রক্ষা করেন ওতামেন্দি। ফাবিয়ানের নেতৃত্বে পাল্টা আক্রমণে উঠে স্পেন। ওইয়ারসাবালের পাস থেকে ফাবিয়ান শট নেওয়ার চেষ্টা করলেও ওতামেন্দি সামনে এসে বল ক্লিয়ার করেন।
এরপর আবার আক্রমণে ওঠে স্পেন। ওলমোর ব্যাকপাস থেকে কুকুরেয়া শট নেওয়ার আগেই গঞ্জালো মন্তিয়েল বল সরিয়ে দেন। কিছুক্ষণ পর মন্তিয়েলের জায়গায় নাহুয়েল মোলিনাকে নামান স্কালোনি।
৬২ মিনিটে স্পেনও দুটি পরিবর্তন আনে। ফাবিয়ানের জায়গায় পেদ্রি এবং ওইয়ারসাবালের জায়গায় ফেরান তোরেস মাঠে নামেন।
৬৪ মিনিটে ওলমোর দূরপাল্লার শট ঠেকান মার্টিনেজ। পরে ইয়ামালের দুর্দান্ত ক্রস থেকে তোরেস হেড করলেও বল চলে যায় গোলরক্ষকের হাতে।
১৯৬৬ সাল থেকে রেকর্ড সংরক্ষণের পর প্রথমবার বিশ্বকাপ ফাইনালের প্রথম ৭০ মিনিটে লক্ষ্যে কোনো শট নিতে পারেনি আর্জেন্টিনা। এর আগে দীর্ঘ অপেক্ষার রেকর্ড ছিল ২০২২ ফাইনালে ফ্রান্সের, যেখানে ৬৮ মিনিট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিল।
৭০ মিনিটে আর্জেন্টিনা দুটি পরিবর্তন আনে। রদ্রিগো দে পলের বদলে জিউলিয়ানো সিমিওনে এবং ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর জায়গায় ফাকুন্দো মেদিনা মাঠে নামেন।
৭৫ মিনিটে স্পেন ওলমো ও বায়েনাকে তুলে মিকেল মেরিনো এবং নিকো উইলিয়ামসকে মাঠে নামায়।
৭৭ মিনিটে গোলের কাছাকাছি যায় স্পেন। পেদ্রির শট ঠেকিয়ে দেন মার্টিনেজ। এরপর ইয়ামালের চেষ্টা ব্লক করেন মেদিনা। কুবারসির দূরপাল্লার শটও মার্টিনেজের গায়ে লেগে বাইরে চলে যায়। ৮০ মিনিটে লাপোর্তের হেড এবং ৮৭ মিনিটে তোরেসের শটও রুখে দেন আর্জেন্টিনা গোলরক্ষক।
ইনজুরি সময়ে উইলিয়ামসের শক্তিশালী শট ঠেকান মার্টিনেজ। এরপর দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন এনজো ফার্নান্দেজ। শেষ মুহূর্তে ইয়ামালের ফ্রি কিকও দুর্দান্তভাবে রুখে দেন মার্টিনেজ।
অতিরিক্ত সময়ে প্রথমে গোল পেয়েছিল স্পেন। ৯৬ মিনিটে নিকো উইলিয়ামস বল জালে পাঠালেও গোল বাতিল হয়। ভিএআরে পর্যালোচনার পরও মেরিনোর ফাউলের কারণে সিদ্ধান্ত বহাল থাকে।
তবে কিছুক্ষণ পর আর সুযোগ হাতছাড়া করেনি স্পেন। অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধের ২৭ সেকেন্ডে পেদ্রো পোরোর ক্রস থেকে নিকো উইলিয়ামসের সহায়তায় গোল করেন ফেরান তোরেস।
বিশ্বকাপ ফাইনালে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে গোল করা পঞ্চম ফুটবলার হলেন তোরেস। এর আগে ২০১৪ সালের ফাইনালে মারিও গোৎসের গোলে আর্জেন্টিনাকে হারিয়েছিল জার্মানি।
এনএইচ