আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শতাধিক গুম-খুনের ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে মামলার সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য ছিল সোমবার (১০ আগস্ট)।

এদিন ট্রাইব্যুনাল-১-এর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে সপ্তম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন রফিকুল ইসলাম।

সাক্ষ্যে রফিকুল ইসলাম বলেন, জিয়াউল আহসান নিজ হাতে একজন ব্যক্তির মাথায় গুলি করে তাকে সেতু থেকে পানিতে ফেলে দেন। একই সঙ্গে অন্য কর্মকর্তাদেরও হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়। যারা সেই নির্দেশ পালন করতে অস্বীকৃতি জানান, তাদের ‘কাওয়ার্ড’ ও ‘স্টুপিড’ বলে গালমন্দ করতেন জিয়াউল আহসান।

যেভাবে শুরু হয়েছিল অভিযান

ঘটনার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে সাক্ষী রফিকুল ইসলাম আদালতকে জানান, ২০১১ সালের ১১ জুলাই তৎকালীন ডাইরেক্টর ইন্টেলিজেন্স লে. কর্নেল জিয়াউল আহসান তাকে ফোন করে একটি ‘সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে’ প্রস্তুত হতে বলেন।

রফিকুল ইসলাম জবানবন্দিতে বলেন, ‘আমি স্যারের কাছে জানতে চেয়েছিলাম কীসের অপারেশন, কোথায় যাব? স্যার আমাকে বললেন, “তোমার কোনো কিছু জানার প্রয়োজন নাই। সময়মতো আমার আদেশ মোতাবেক কাজ করবে।”’

জবানবন্দি অনুযায়ী, ওই রাত ১১টার দিকে রফিকুল ইসলাম তার তিন কর্মকর্তা—মেজর সাজ্জাদুল, মেজর তরিকুল ও মেজর এমারতকে নিয়ে র‍্যাব সদরদফতরে পৌঁছান। সেখান থেকে জিয়াউল আহসানের নেতৃত্বে চারটি গাড়ির একটি বহর টঙ্গীর আহসান উল্লাহ মাস্টার ফ্লাইওভার হয়ে সামনে এগিয়ে যায়।

সেতুতে একজনকে গুলি

একপর্যায়ে একটি সেতুর ওপর গাড়ি থামানোর নির্দেশ দেন জিয়াউল আহসান। রফিকুল ইসলাম আদালতকে বলেন, ‘দেখতে পেলাম একটি গাড়ি থেকে একজন লোককে হাত এবং মুখ বাঁধা অবস্থায় ব্রিজের রেলিংয়ের পাশে দাঁড় করানো হলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখলাম জিয়াউল আহসান স্যার ওই ব্যক্তির মাথায় গুলি করেন এবং তাকে রেলিংয়ের ওপর থেকে পানিতে ফেলে দেন।’

এরপর অন্য একটি সেতুতে গাড়ি থামিয়ে দ্বিতীয় এক ব্যক্তিকে নামানো হয়। রফিকুল ইসলাম জানান, জিয়াউল আহসান মেজর সাজ্জাদুলকে বলেন, ‘এখন আরও একটা সন্ত্রাসবিরোধী অপারেশন হবে, সেটা তুমি করবে।’

মেজর সাজ্জাদুল তখন জানতে চান, ‘কে সন্ত্রাসী, কেন এই অপারেশন করব?’

জবাবে জিয়াউল আহসান তাকে নির্দেশ পালন করার জন্য চাপ দেন। তবে সাজ্জাদুল অপারগতা প্রকাশ করলে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন।

রফিকুল ইসলামের ভাষ্য, ‘জিয়াউল আহসান স্যার সাজ্জাদুলকে কাওয়ার্ড, স্টুপিড বলে গালমন্দ করেন এবং বলেন, “তুমি গিয়ে গাড়িতে বসো। আমি তোমার কেইসটা সেপারেটলি দেখব।”’

এরপর ওই স্থান থেকে রফিকুল ইসলাম গুলির শব্দ শুনতে পান বলে আদালতকে জানান।

আরও দুই ব্যক্তিকে হত্যার অভিযোগ

সাক্ষীর বর্ণনা অনুযায়ী, তৃতীয় একটি স্থানে গাড়ি থামিয়ে আরেক ব্যক্তিকে বাঁশঝাড়ের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকেও গুলির শব্দ শোনা যায়।

পরে মেজর তরিকুল তাকে জানান, তাকেও ওই ব্যক্তিকে হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে তিনি সেই নির্দেশ পালন করেননি।

রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘পরের দিন অফিসে গিয়ে মেজর সাজ্জাদুলের সেনাবাহিনীতে প্রত্যাবর্তনের আদেশ পাই। ৩/৪ দিন পর পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পারি জয়দেবপুর এলাকায় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ২/৩ জনের লাশ উদ্ধার হয়েছে।’

জেরায় সাক্ষীর বক্তব্য

সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে রফিকুল ইসলামকে জেরা করেন জিয়াউল আহসানের আইনজীবী মো. সাহিদুর রহমান। এ সময় তার আইনজীবী নাজনীন নাহারসহ অন্য আইনজীবীরাও উপস্থিত ছিলেন।

জেরার সময় সাক্ষী জানান, ওই রাতে তিনি সহ চারজন কর্মকর্তা সশস্ত্র অবস্থায় থাকলেও জিয়াউল আহসানের নির্দেশেই তারা ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন।

জেরার একপর্যায়ে আসামিপক্ষের আইনজীবী দাবি করেন, শাড়ি ও আলুবোঝাই ট্রাক আটকের পর মালামাল বিক্রির অভিযোগ রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে ছিল এবং সেই ঘটনার তদন্ত জিয়াউল আহসান করায় তার প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি মিথ্যা সাক্ষ্য দিচ্ছেন।

তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেন রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘জিয়াউল আহসান আমার বিরুদ্ধে তদন্ত রিপোর্ট দাখিল করার কারণে আমি তার ওপর ক্ষুব্ধ ছিলাম এবং ক্ষোভের কারণে অসত্য সাক্ষ্য দিলাম- সত্য নহে।’

এ ছাড়া মতিঝিলে ‘হুমায়ুন কবির ওরফে বিপ্লব’ এবং মালিবাগে ‘নাজিম উদ্দিন বাবু’ হত্যার বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করা হয়। জবাবে রফিকুল ইসলাম জানান, একটি ঘটনা নিয়মিত টহলকালে গোলাগুলির ফল এবং অন্য ঘটনাটি ঘটার সময় তিনি ওমরাহ পালনের জন্য সৌদি আরবে ছিলেন।

ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর শাইখ মাহদী। তার সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর তাসমিরুল ইসলাম, আবদুস সাত্তার পালোয়ান, মঈনুল করিমসহ অন্যান্য প্রসিকিউটর।

এনএইচ