অভিযোগে জানা যায়, থানায় মামলা করতে কোনো টাকা লাগে না—এমন বক্তব্য দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ সর্বত্র প্রচার চালালেও বাস্তবে ভিন্ন চিত্র রংপুরের মিঠাপুকুর থানায়। এই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নুরুজ্জামানের ছত্রছায়ায় উপজেলায় মাদক, জুয়া আর ঘুষের মহোৎসব চলছে। নিজেকে ‘ফেরেস্তা’ দাবি করে প্রচারণা চালালেও পর্দার আড়ালে এসআইদের মাধ্যমে তিনি গড়ে তুলেছেন এক শক্তিশালী ঘুষের সিন্ডিকেট।
অনুসন্ধানে জানা গেছে , গত বছরের ১১ ডিসেম্বর যোগদানের পর থেকেই মিঠাপুকুর থানায় মামলা রেকর্ড করা সাধারণ মানুষের জন্য দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। প্রতিটি মামলা রেকর্ড করতে ভুক্তভোগীদের গড়ে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হচ্ছে। ওসি সরাসরি টাকা হাতে না নিলেও তার আস্থভাজন এসআইদের মাধ্যমে এই অর্থ আদায় করা হয় বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। টাকা না দিলে অভিযোগ পড়ে থাকে দিনের পর দিন, আর টাকা দিলে রাতের আঁধারেও মামলা নথিভুক্ত হয়।
মিঠাপুকুর থানা সূত্রে জানা যায়, ওসি নূরুজ্জামান থানায় যোগদানের পূর্বে প্রতিমাসে ৬৫ থেকে ৭০ টি মামলা রেকর্ড করা হতো। নুরুজ্জামান ওসি হিসেবে যোগদানের পরে গত বছরের ডিসেম্বর ২৩ টি মামলা রেকর্ডভুক্ত করা হয়, জানুয়ারিতে করা হয় ৩০ টি মামলা, ফেব্রুয়ারিতে করা হয় ২৯ টি মামলা। অভিযোগ রয়েছে, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ঘটনার সত্যটা নিশ্চিত করার পরেও মামলা রেকর্ডের পূর্বে যাচাই বাছাইয়ের নামে ভুক্তভোগীদের দফায় দফায় জিজ্ঞেসাবাদের নামে করা হয় হয়রানি। এসআইদের মাধ্যমে নির্দিষ্ট অংকের টাকা ঘুষ পেলেই রাতারাতি করা হয় মামলা রেকর্ড। যাচাই বাছাইয়ের নামে মামলা রেকর্ড না করার কারণে অসংখ্য ভুক্তভোগী গত তিনমাসে আইনি সেবা থেকে বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
মিঠাপুকুর থানায় হঠাৎ মামলা কমে যাওয়া ও ঘুষ ছাড়া মামলা রেকর্ড হয় না এমন অভিযোগের বিষয়ে ওসি নুরুজ্জামান প্রতিবেদককে বলেন, পূর্বে থানায় মাসে ৬৫/৭০ টি মামলা রেকর্ড হতো। যার অধিকাংশ মিথ্যা মামলা ছিলো। আমি আসার পরে সত্যটার ভিত্তিতে মামলা রেকর্ড করায়,মামলার সংখ্যা কমেছে। এসআইদের মাধ্যমে প্রত্যেক মামলায় ঘুষ নেয়ার বিষয়ে বলেন, কোন এসআইকে ভুক্তভোগীরা টাকা দিছে। তাদের কাছে নাম শুনুন। সবাই জানে আমি কেমন মানুষ।
এদিকে যোগদানের পর মাদক ও জুয়ার বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা করেছিলেন ওসি নুরুজ্জামান। অথচ বর্তমানে উপজেলার বিভিন্ন প্রান্তে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে মাদক কারবারি ও জুয়ারুরা। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি জুয়ার বোর্ড থেকে ওসি গড়ে প্রতিদিন ২০ হাজার টাকা করে মাসোহারা নিচ্ছেন। এমন অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা যায়, উপজেলার বলদিপুকুর নয়াটাড়ি হিন্দুপাড়ায় সামিয়ানা টাঙ্গিয়ে গত দেড়মাস থেকে প্রকাশ্যে জুয়ার আসর চলছিলো। অভিযোগ রয়েছে এই জুয়ার আসর থেকে প্রতিদিন ২০ হাজার টাকা মাসোহারা নিতেন ওসি নূরজ্জামান। এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে ওসিকে কয়েকদফা অভিযোগ দেয়ার পরেও ব্যবস্থা না নেয়ায় গত বৃহস্পতিবার স্থানীয়রা জুয়ার সরঞ্জামসহ হাতেনাতে আটকের চেষ্টা করে জুয়াড়ুদের। এসময় দুইটি মোটরসাইকেল,নগদ অর্থ ও জুয়ার সরঞ্জামসহ একজনকে আটক করে পুলিশে দিলেও মামলা না করে মুচলেকা নিয়ে ঘটনাস্থলেই ছেড়ে দেয় পুলিশ। স্থানীয় সাংবাদিক শাহ আলম বলেন, জুয়ার বোর্ডের সরঞ্জামসহ এলাকাবাসী আটক করার পরে ওসিকে আমি ঘটনাস্থলের ভিডিও ডকুমেন্টস পাঠাই। ওসি সেটা আবার জুয়ার বোর্ডের স্বাত্বাধিকারীকে নাম ধরে বলে দেয় যে, অমুক আমাকে আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ দিছে, ভিডিও দিছে। এরপরেই আবার অপরাধী আমাকে কল দিয়ে বলে আপনি নাকি ওসিকে ভিডিও দিছেন, কল দিছলেন। ওসি এই জুয়ার পয়েন্ট থেকে পুটু চেয়ারম্যান,রাসেল মেম্বার ও বাবু মেম্বারের মধ্যস্থতায় বিট অফিসারের মাধ্যমে নিয়মিত মাসোহারা পেতো জন্যই জুয়ার সরঞ্জাম ও নদগ অর্থসহ আটকের পরেও মামলা না নিয়ে ছেড়ে দিয়েছে। এই অভিযোগের বিষয়ে ওসি নুরুজ্জামান প্রতিবেদককে বলেন, আমি যদি জুয়ার বোর্ড থেকে টাকা নিতাম তাহলে তো ওই স্পট থেকে দুইটি মোটরসাইকেল জব্দ করে থানায় আনতাম নাহ। এছাড়া রাতে উপজেলার ফুলবাড়ি রোডে অবৈধ বালু বহনকারী ড্রাম ট্রাকগুলো থেকে নিয়মিত একটি বড় অংকের টাকা ওসির পকেটে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এবিষয়ে ওসি নুরুজ্জামান বলেন, বালু সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো ইউএনও এসিল্যান্ডের বিষয়। এটা আমার এখতিয়ারের বাহিরে। এটি ভিত্তিহীন অভিযোগ।
ওসির অপকর্মের বিরুদ্ধে কথা বললেই সাংবাদিকদের সাথে বিরূপ আচরণ করার অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার যথাযথ সত্যটা থাকার পরেও মামলা কেনো রেকর্ড হচ্ছে না ভুক্তভোগীদের এমন অভিযোগের বিষয়ে স্থানীয় সংবাদকর্মীরা থানায় গেলে একাধিক গণমাধ্যমকর্মীর সাথে অসদাচরণ করা হয় এবং থানায় আসতে নিষেধ করা হয়। এমনকি সাধারণ মানুষের হয়রানি নিয়ে গণমাধ্যম কর্মীরা ফোন করলেও তিনি তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে মন্তব্য করেন। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ওসি নুরুজ্জামান বলেছেন, আমি কোন গণমাধ্যমকর্মীকেই তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করিনি। যারা মামলা মোকদ্দমা রেকর্ড করার জন্য দালালি করে মানুষের কাছে টাকা পয়সা নেয়। তাদেরকে এই কথা বলতে পারি। আমাকেতো আপনি প্রশ্ন করেছেন। আমিতো আপনাকে থানায় আসতে নিষেধ করছি নাহ। অভিযোগ রয়েছে, রংপুর জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মারুফাত হুসাইনের বিশেষ আনুকূল্য পাওয়ার কারণে তিনি কাউকে তোয়াক্কা করছেন না। এর পূর্বে এসপি মারুফাত হুসাইন দিনাজপুর জেলার পুলিশ সুপার থাকাকালীন ওসি নুরুজ্জামান ছিলেন ওই জেলার সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।
অনুসন্ধানে জানা যায়,চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ থানার মহদীপুর গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা মৃত ভুলু মিয়ার সন্তান ওসি নূরুজ্জামান। আওয়ামী ঘরানার পরিবারের সন্তান হওয়ার সুবাদে ওসি নূরুজ্জামান ও তার ছোট ভাই ।
চাপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা ঢাকা রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি সৈয়দ নুরুল ইসলামের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলে তার সহযোগিতায় পুলিশ বাহিনীতে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় যোগদান করেন। সরাসরি ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িত ও জুলাই আন্দোলনে দমন পীড়নের অভিযোগে ইতিমধ্যেই তার ছোট ভাই সাসপেন্ড হয়েছে। অপরদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় এসপি লীগের প্রতিষ্ঠা ও একসময়ের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগের নিয়ন্ত্রক ডিআইজি সৈয়দ নূরুল ইসলাম ৫ ই আগস্ট পরবর্তী সময়ে একাধিক মামলার আসামি হয়ে চাকরি খুইয়েছেন। এদিকে ছোট ভাইয়ের সাসপেন্ড ও সাবেক ডিআইজি নূরুল ইসলাম সরকার পটপরিবর্তনের পরে চাকুরি খুইয়ে ক্ষমতাহীন হয়ে পড়লে সুযোগ সন্ধানী ওসি নূরুজ্জামান বিএনপি ও জামায়াত নেতাদের সুপারিশে রাতারাতি বনে যান থানার ওসি। এদিকে ওসি হয়েই নিজেকে দূর্নীতির বিরুদ্ধে লোক দেখানো জিরো টলারেন্স ঘোষণা দিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন বেপরোয়া। এসব অভিযোগের বিষয়ে ওসি নূরুজ্জামান প্রতিবেদককে বলেন, আমি মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান, এটা সত্য। ভাই চাকরি থেকে সাসপেন্ড কেনো হলো প্রতিবেদকের এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এসব অযৌক্তিক প্রশ্ন। আপনি দেখতেছি আমার বিরুদ্ধে ভালোই খোঁজ খবর নিতেছেন। এসব খোঁজ নিয়ে লাভ নেই। আমি সৎ অফিসার। আমার ভাই সাসপেন্ড হয়নি। সে নিজে থেকেই চাকরি ছেড়ে দিয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চাঁপাইনবাবগঞ্জ শিবগঞ্জ এলাকার কয়েকজন স্থানীয় জানান, ওসি নুরুজ্জামান ছুটিতে তার নিজ জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে গেলে সেখানে ঘুষের টাকায় রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের নিয়ে ঘনঘন রাজকীয় ‘পিকনিক পার্টি’র আয়োজন করেন। এছাড়াও নিজের আওয়ামী ট্যাগ মুছতে বিএনপির রাজশাহী বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শাহিন সৈকতের ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টায় তার লোকজনের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে তিনি যে গোপনে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জন করছেন, তা নিয়ে এলাকায় ব্যাপক কানাঘুষা চলছে।
মিঠাপুকুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি মোঃ নুরুজ্জামান তার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোর বিষয়ে বলেন, আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। তবে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা যদি কোন ভুক্তভোগীর কাছে টাকা নিয়ে থাকেন। সেটাতো আমি জানবো নাহ। তারপরেও মামলা হওয়ার পরে আমি বাদীকে কল দিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করি তারা মামলা করার জন্য কাউকে কোন টাকা পয়সা দিয়েছেন কিনা। যাতে পুলিশের নাম করে কেউ টাকা নিতে না পারে।
এস