প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিগত সরকারের আমলে আইসিটি খাতে দরপত্র জালিয়াতি, অপ্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ক্রয় এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়মের যে চক্র গড়ে উঠেছিল, সিমেক সিস্টেম ছিল তার অন্যতম সুবিধাভোগী। এসব অভিযোগের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত করছে বলেও জানা গেছে।
তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও বিএনপি সরকার গঠনের পরও প্রতিষ্ঠানটির তৎপরতা থামেনি বলে অভিযোগ উঠেছে। বরং খোলস পাল্টে বিএনপি ও ছাত্রদলের কিছু নেতাকর্মীর নাম ব্যবহার করে বর্তমান প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে প্রভাব বিস্তার এবং নতুন প্রকল্প নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শ্বেতপত্রে ২৮ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ
সম্প্রতি প্রকাশিত আইসিটি বিভাগের শ্বেতপত্রে প্রযুক্তি খাতে বিগত সরকারের আমলের বিভিন্ন অনিয়মের তথ্য তুলে ধরা হয়। সেখানে সিমেক সিস্টেম ও এর কর্ণধার আবু মুসার বিরুদ্ধে ২৮ কোটি টাকা দুর্নীতি ও লুটপাটের অভিযোগের কথাও উল্লেখ রয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সিমেক সিস্টেমের নিয়ন্ত্রণ বা সম্পৃক্ততায় থাকা প্রকল্পগুলোর আর্থিক পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৮৮ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে হাওর, বাঁওড় ও দুর্গম এলাকায় ব্রডব্যান্ড ওয়াই-ফাই স্থাপন প্রকল্পের পরিমাণ ২ হাজার ২৬ কোটি টাকা।
অভিযোগ রয়েছে, ওই প্রকল্পের ‘লট-১’-এর জন্য ৩৬ কোটি টাকার নোটিফিকেশন অব অ্যাকসেপ্টেন্স (NOA) ও চুক্তিপত্র প্রতিষ্ঠানটি হাতিয়ে নেয়। তবে মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধানে প্রকল্পটির বাস্তব কার্যক্রমের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
নেত্রকোনার পূর্বধলাসহ প্রকল্পের আওতাভুক্ত একাধিক এলাকায় অনুসন্ধান করেও কোনো কার্যক্রমের সন্ধান পাওয়া যায়নি। স্থানীয় বিটিসিএলের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারাও এ ধরনের প্রকল্প সম্পর্কে অবগত নন বলে জানান। এমনকি সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছেও প্রকল্পটির বিষয়ে কোনো তথ্য ছিল না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আরও কয়েকটি প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ
প্রকাশিত শ্বেতপত্রে সিমেক সিস্টেমের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ লেবার ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (LIMS) প্রকল্পে ২১ কোটি ৫৬ লাখ টাকা এবং বিটিসিএলের GPON ONT সরবরাহের ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তিতে ১৩ কোটি ৪০ লাখ টাকার অনিয়মের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
এ ছাড়া রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থায়নে পরিচালিত আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পেও প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের (বিসিসি) অধীন ‘এডজ বাংলাদেশ’ (EDGE Bangladesh) প্রকল্পে ব্লকচেইন প্রশিক্ষণ সেবা, আইসিটি বিভাগের ‘হার পাওয়ার’ প্রকল্পে খুলনা বিভাগের ১ হাজার ৬৮০ জন নারীকে আইটি প্রশিক্ষণ, এসএমই ফাউন্ডেশনের অনলাইন পোর্টাল (SMEF Portal) এবং প্রতিরক্ষা ক্রয় মহাপরিদপ্তরের (DGDP) জন্য e-DP ইলেকট্রনিক প্রকিউরমেন্ট সফটওয়্যার তৈরি।
তদন্ত নথিতে ২০২৩ সালের ১৪ জুন অনুষ্ঠিত বিসিসি ও এডজ প্রকল্পের ‘হায়ার অ্যান্ড ট্রেইন’ কর্মসূচিতেও সিমেক সিস্টেমের সরাসরি সম্পৃক্ততার সচিত্র প্রমাণ থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
খোলস পাল্টে নতুন লবিংয়ের অভিযোগ
তদন্ত প্রতিবেদনের সবচেয়ে উদ্বেগজনক অংশ হিসেবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সিমেক সিস্টেমের নতুন কৌশলে তৎপর হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে বিএনপি ও ছাত্রদলের কিছু নেতাকর্মীর নাম ভাঙিয়ে বর্তমান আইসিটি সচিব, হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এবং সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পরিচালকের (পিডি) ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে।
এর মাধ্যমে হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ‘ডিড প্রজেক্ট’ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে সিমেক সিস্টেমের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। অভিযোগের সত্যতা যাচাই ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনে তা যুক্ত করা হবে।
এনএইচ