রোববার সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ জানান, হত্যাকাণ্ডের পরও অভিযুক্তরা প্রায় ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা ওই বাড়িতে অবস্থান করেন। এ সময় তারা গোসল করেন, বাড়িতে থাকা খেজুর ও শসা খান এবং পরে লুট করা স্বর্ণালংকার নিয়ে বেরিয়ে যান।
আটক দুজন হলেন মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস। তারা পরস্পরের আত্মীয় এবং একই এলাকার বাসিন্দা। তাদের মধ্যে একজন স্থানীয় একটি স্বর্ণের দোকানে কারিগর হিসেবে কাজ করেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, পাশের একটি নির্মাণাধীন বাড়ির ভেতর দিয়ে ওই দুই ব্যক্তি গণপতি চক্রবর্তীদের বাড়ির ছাদে ওঠেন। সেখানে তারা ইয়াবা সেবন করেন। এ সময় শব্দ শুনে গণপতি চক্রবর্তী ছাদে গেলে তাদের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয়।
একপর্যায়ে গলায় থাকা গামছা পেঁচিয়ে গণপতি চক্রবর্তীকে হত্যা করা হয় বলে পুলিশের দাবি। তিনি বাঁচার চেষ্টা করলে শব্দ শুনে তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠার চেষ্টা করেন। তাকেও গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশের দাবি, মায়ের চিৎকার শুনে মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী এগিয়ে এলে তাকেও রশি দিয়ে পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়। পরে পরিবারের ১২ বছর বয়সী ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তীকে গলায় কাপড় পেঁচিয়ে ও বালিশ চাপা দিয়ে হত্যা করা হয়।
রংপুর ডিবির ডিসি সনাতন চক্রবর্তী জানান, আটক দুজনকে পৃথক ও একসঙ্গে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। উভয় ক্ষেত্রে তাদের দেওয়া তথ্যের মধ্যে মিল পাওয়া গেছে বলে দাবি করেন তিনি।
পুলিশ জানায়, হত্যার পর খুনিরা বাড়ির একটি বাথরুমে গোসল করেন। এরপর ডাইনিং টেবিলে থাকা খেজুর এবং ফ্রিজ থেকে শসা বের করে খান। ঘটনাস্থল থেকে ইয়াবা সেবনের আলামতও পাওয়া গেছে।
হত্যাকাণ্ডের পর বাড়ির বিভিন্ন জিনিসপত্র ইচ্ছাকৃতভাবে এলোমেলো করে রাখা হয়েছিল বলেও জানিয়েছে পুলিশ। এমনকি বাড়িতে থাকা দুটি মোবাইল ফোন ডিটারজেন্ট মিশ্রিত পানিতে বালতির মধ্যে ভিজিয়ে রাখা হয়েছিল।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাড়ি থেকে নেওয়া কিছু স্বর্ণালংকার পরে একটি মন্দিরের পেছনের পরিত্যক্ত জায়গায় রেখে যায় সন্দেহভাজনরা। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সেখান থেকে ওই স্বর্ণালংকার উদ্ধার করা হয়েছে।
পুলিশ কমিশনার জানান, ঘটনাস্থলে আগুনে পরীক্ষা করা চুড়ির আলামতও পাওয়া গেছে। এসব আলামত বিশ্লেষণ করে স্বর্ণের বিষয়ে অভিজ্ঞ কেউ হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হয়।
এর আগে শনিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে দাসপাড়া-মাছুয়াপাড়া এলাকার একটি দোতলা বাড়ি থেকে গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা, মেয়ে প্রার্থী ও ছেলে প্রিয়মের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। লাশগুলোতে পচন ধরেছিল এবং বাড়িজুড়ে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ।
গণপতি চক্রবর্তী রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ছিলেন। অবসরের পর তিনি হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা করতেন। পরিবার নিয়ে ওই বাড়ির দ্বিতীয় তলায় বসবাস করতেন তিনি।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বৃহস্পতিবার প্রীতিলতা চক্রবর্তীর সর্বশেষ কথা হয়েছিল বলে জানান তার বোন পূজা চক্রবর্তী। এরপর শনিবার পর্যন্ত তাদের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। পরে স্বজনরা বাড়িতে গিয়ে মূল দরজা বন্ধ দেখতে পেয়ে পুলিশকে খবর দেন। পুলিশ দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে।
এ ঘটনায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেছেন নিহত গণপতি চক্রবর্তীর ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী। তিনি জানান, তার ভাই অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করতেন এবং কারও সঙ্গে তার কোনো শত্রুতা ছিল না। হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ তদন্তের মাধ্যমে বের করার দাবি জানান তিনি।
পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ বলেন, গণপতি চক্রবর্তী একজন সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন এবং কারও সঙ্গে তার বিরোধ ছিল না। ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া বিভিন্ন আলামত, মাদক সেবনের চিহ্ন, খেজুরের বিচি ও শসা খাওয়ার আলামতসহ তদন্তের তথ্য বিশ্লেষণ করে সন্দেহভাজন দুজনকে শনাক্ত ও আটক করা হয়েছে।
এস