একের পর এক ঘটছে ধর্ষণ-নির্যাতন। নতুন উপসর্গ নৃসংসতা। নারীর প্রতি মাত্রা ছাড়া নির্মমতায় হতবাক বিবেকবান মানুষ। সিলেটের খাদিজা আক্তার নার্গিস, চাঁপাইনবাবগঞ্জের স্কুলছাত্রী কনিকা ঘোষ, ঢাকার সুরাইয়া আক্তার রিশা, কুমিল্লার সোহাগী জাহান তনু, মাদারীপুরের নিতু মণ্ডল, চট্টগ্রামের এসপির স্ত্রী মিতু, মিরপুরের আফসানা, দিনাজপুরের পার্বতীপুরের পূজা দাস- এরপর কে? এই প্রশ্ন আজ সবার। অন্যদিকে পুলিশ বলছে গত ১০ মাসে নির্যাতনে মামলা হয়েছে প্রায় ১৬০০০।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিচারে দীর্ঘসূত্রিতা, রাজনৈতিক প্রভাব ও নেতিবাচক সামাজিক মনোভাবের কারণে একের পর এক নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। তবে নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক নৃশংসতার ঘটনাই আলোচিত হচ্ছে বেশি।

সংশ্লিষ্টদের অভিমত, বিচারহীনতায় দিন দিন উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে নারী ও শিশু নির্যাতন। গত ৯ মাসে খুন হয়েছে ৩৪৫ শিশু। ধর্ষণ ও গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৪২৮ জন নারী। এসিডে ঝলসে গেছে ৩৩ নারী-শিশুর মুখ। এছাড়া যৌন হয়রানি এবং অন্যান্য নির্যাতনের শিকারও হয়েছেন অনেকে। বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে বিচার না হওয়া এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে নারী ও শিশুদের প্রতি নৃশংসতা বাড়ছে। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচার করে বখাটেদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে না পারলে এসব ঘটনা আরো বাড়বে বলে মনে করছেন বিজ্ঞজনরা।

সিলেটের কলেজ শিক্ষার্থী খাদিজা আক্তার নার্গিসকে গত ৩ অক্টোবর কুমড়ো কাটার মতো কুপিয়ে ফালা ফালা করে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বদরুল। মেয়েটি এখনো মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। নার্গিসের ওপর বর্বরোচিত হামলার রেশ না কাটতেই দিনাজপুরের পার্বতীপুরে পাঁচ বছরের শিশু পূজা দাসের ওপর পৈশাচিক হামলায় স্তম্ভিত জাতি। নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে এমন নৃসংসতার ঘটনা আগে কখনো শোনা যায়নি। বর্তমানে পূজা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। ভয় আর আতঙ্কে দিন দিন মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছে সে।

এর আগে ১৮ সেপ্টেম্বর মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলায় নিতু মণ্ডল নামে ১৫ বছরের এক কিশোরীকে একই গ্রামের মিলন মণ্ডল নামে এক বখাটে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে। বখাটেদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে গত ১৭ সেপ্টেম্বর মাগুরা সদর উপজেলার সাংদা লক্ষীপুর গ্রামের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী হ্যাপী (১২) গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে। এর আগে ঢাকার উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী সুরাইয়া আক্তার রিশাকে ছুরিকাঘাতে মারাত্মক জখম করে ওবায়দুল খান নামে আরেক বখাটে। পরে হাসপাতালে মৃত্যু হয় রিশার। এরও আগে কুমিল্লায় ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় মেধাবী ছাত্রী সোহাগী জাহান তনুকে।

শুধু তাই নয়, গেল মাসের শেষ দিকে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার নিজড়া গ্রামের বাকাদ্দেস সরদার (৭০) দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া এক শিশুকে ভয়ভীতি দেখিয়ে যৌন নিপীড়ন চালায়। গত ২৭ অক্টোবর এ ঘটনা ঘটলেও মামলা হয় তার দুদিন পর। বাকাদ্দেস সরদারের সন্তানরা বৃদ্ধ বাবার কুকীর্তি ধামাচাপা দিতে মরিয়া হয়ে ওঠে। বিচারের আশায় ভুক্তভোগীর পরিবার থানায় অভিযোগ জানায়। বাকাদ্দেস সরদার পলাতক রয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত শিশুর পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ঘটনার দিন বিকেলে শিশুটি বাকাদ্দেস সরদারের নাতির সঙ্গে খেলতে তার বাড়ি যায়। এ সময় বাকাদ্দেস সরদার নিজের নাতিকে টেলিভিশন দেখতে বলে শিশুটিকে কাচারি ঘরে নিয়ে যৌন নির্যাতন করে।

বাংলাদেশ মানবাধিকার সংস্থার (বিএমবিএস) মিডিয়া এন্ড কমিউনিকেশননের তথ্য মতে, ১০ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই দেশের ৫ দশমিক ১৭ শতাংশ শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। বিবাহিত নারীদের ৮০ দশমিক ২ ভাগ জীবনে কোনো না কোনো সময়ে আর্থিক, শারীরিক কিংবা যৌন নির্যাতনের শিকার হন। ২০১১ সালে এই হার ছিল ৮৭ ভাগ। গত এক মাসে দেশে ধর্ষিত হয়েছে ৪৫ নারী ও শিশু। এর মধ্যে ২০টি শিশু। গণধর্ষণের শিকার হন ১০ নারী। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় একজনকে। পারিবারিক কলহে আপনজনের হাতে খুন হন ২৬ নারী।

যৌতুকের বলি ৩ নারী, নির্যাতন করা হয় ৫ জনকে। এসিড সন্ত্রাসের শিকার হন ৫ জন। এ ছাড়া গত মাসে আত্মহত্যা করেছেন ২৯ নারী। খুন হয় কোমলমতি ১৫টি শিশু। নির্যাতনের শিকার হয় ১০ জন। শুধু রাজধানীতেই গত এক মাসে ধর্ষিত হয় ১৫ নারী-শিশু। হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ৪ জন।

ন্যায্য বিচার না পাওয়ার কারণে নারীর ওপর হামলা ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলছে উল্লেখ করে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক নূর খান লিটন বলেন, বর্তমানে চোখের সামনে নারী নির্যাতন হলেও কেউ এগিয়ে আসছে না। এতে করে এক ধরনের ভয়ার্ত পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে। কোনো নারী যদি তার ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদ করার চেষ্টা করেন, তাহলে সমাজ তাকে নানাভাবে হেয় করে। নারী নির্যাতনে বিচারকার্য বিলম্বিত করতে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে প্রভাব বিস্তার করা হয়। আর ন্যায্য বিচার না হওয়ায় বিভিন্ন কৌশলে নারী নির্যাতনের ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলছে। এ অবস্থা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসার চেষ্টা করতে হবে।

মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়েশা খানম বলেন, গত আট মাসে প্রায় ৩ হাজার নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। সম্প্রতি রিশা ও খাদিজার ঘটনা থেকে মনে হচ্ছে- সামাজিক অবক্ষয়, পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অভাব এর নেপথ্য কারণ। এছাড়া, দ্রুত বিচার না হওয়াকেও দায়ী করা যেতে পারে। তবে নারীদের সাহস করে প্রতিবাদ করতে হবে। আইনের ব্যবস্থা নিতে হবে।

 

পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালে দেশে নারী-শিশু নির্যাতনের ঘটনায় মামলা হয়েছে ২১ হাজার ২২০টি। অন্যদিকে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ১০ মাসে নারী-শিশু নির্যাতনের ঘটনায় মামলার সংখ্যা ১৫ হাজার ৯৮৭টি। এসব মামলার ৮০ শতাংশেই চার্জশিট দেয়া হয়েছে। চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়া ছাড়াও বাকিগুলো তদন্তাধীন। ডিএমপি সূত্র জানায়, জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত রাজধানীতে নারী-শিশু নির্যাতনের ঘটনায় মামলা হয়েছে ১ হাজার ৩৯৫টি। জিডি হয়েছে ৭০০-এর বেশি।

অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৫ সালের তুলনায় চলতি বছর নারী-শিশু নির্যাতন, অপহরণ, ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা প্রায় দ্বিগুন বেড়েছে। বিচারে দীর্ঘসূত্রতা, দুর্বল তদন্ত ও আইনের ফাঁকফোকর গলে অপরাধীরা পার পেয়ে যাওয়ায় এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না। তাদের মতে, স্বল্প সময়ে আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও সমতাভিত্তিক আইনি নীতি বাস্তবায়িত হলেই নারীর প্রতি সহিংসতা কমবে।

এদিকে মানবাধিকার কর্মীদের অভিযোগ, আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে বিচার প্রার্থীরা আইনের আশ্রয় নেয়ার প্রাথমিক পর্যায় থেকেই মানবাধিকার বঞ্চিত হচ্ছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি ভোরের কাগজকে বলেন, নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগের। তবে এ নৃশংসতা বন্ধে সরকার নারী নির্যাতনকারীর বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। নারীকে সাহস করে ঘুরে দাঁড়াতে হবে। এ বিষয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, চাঞ্চল্যকর হত্যা ও ধর্ষণ মামলা যেন দ্রুত নিষ্পত্তি হয় এ জন্য সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। এ ধরনের বিচার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে এবং এর বিচারিক কাজ দ্রুত সময়ে সম্পন্ন করা হবে। এর মাধ্যমে অভিযুক্তদের কম সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা যাবে। হত্যা ও ধর্ষণ মামলায় এমন দৃষ্টান্তমূলক সাজা দেয়া হবে, যেন কেউ আর এ ধরনের অপরাধ করার সাহস না পায়। আইনজীবীদের এ জন্য যথাযথ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক সাদেকা হালিম বলেন, নারীর সুরক্ষায় যেসব আইন আছে, সেসব আইনের যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে না। ফলে নির্যাতনকারীরা নারী নির্যাতন করতে আর ভয় পাচ্ছে না। তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি। নারীর প্রতি সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তাদের ওপর সহিংসতার মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। নারীর স্বাবলম্বী হওয়াটাকে অনেকেই মেনে নিতে পারে না। তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটে তাদের নির্যাতন করার মধ্য দিয়ে।

এ ক্ষেত্রে পরিবারকেই এগিয়ে আসতে হবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, নারী নিজ পরিবারেই নির্যাতিত হচ্ছেন। অনেক নারী চাইলেও আইনের আশ্রয় নিতে পারেন না। আইনের আশ্রয় নিতে গেলে যে পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন তা তাদের কাছে নেই। তাছাড়া ভিকটিমদের জন্য যে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার রয়েছে এ তথ্যও নেই অনেকের কাছে।

বাংলাদেশ শিশু ফাউন্ডেশনের সংগঠক শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, নারী শিশুর প্রতি সংহিসতা যে হারে বাড়ছে তাতে করে নারীদের রাস্তায় বের হওয়াই কষ্টের হয়ে যাবে। তিনি বলেন, এসব ঘটনা বন্ধে প্রতিবাদ করতে হবে। কেবল ফেসবুকে লিখে নয়, মাঠে-ঘাটে যেখানে ধর্ষণ-নির্যাতনের ঘটনা ঘটে, সেখানেই প্রতিরোধ করতে হবে। পরিবার থেকে নির্যাতন বিরোধিতার শিক্ষা দিতে হবে। সেটা করতে না পারলে আমরা মানবিক বাংলাদেশ গড়তে পারব না। হত্যা-ধর্ষণের বিরুদ্ধে অনলাইনে সোচ্চার থাকার পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।

জারিফ