শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বিবিসি বাংলাকে বলেন, বিশ্বজুড়ে সাইবার হামলার ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ওয়েবসাইটটি বন্ধ রাখা হয়েছে। বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকও একই ধরনের সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিচ্ছে।

ওয়েবসাইটে প্রবেশের চেষ্টা করলে রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমের কারণে সেবাটি সাময়িকভাবে বন্ধ থাকার একটি বার্তা দেখা যাচ্ছে। কবে নাগাদ ওয়েবসাইটটি চালু হবে, তা নিশ্চিত করে বলতে পারেননি বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র। তিনি জানান, আইটি দল নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই ওয়েবসাইট চালু করা হবে।

লেনদেনে কি কোনো প্রভাব পড়ছে?

বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট বন্ধ থাকলেও ব্যাংকিং লেনদেন ও কোর ব্যাংকিং কার্যক্রমে বড় ধরনের কোনো সমস্যা হয়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

ব্যাংকারদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান এবং মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলেন, তাঁদের লেনদেন বা কোর ব্যাংকিং ব্যবস্থায় কোনো সমস্যা হয়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খানও জানান, লেনদেন চলছে, তবে গতি কিছুটা কম। ওয়েবসাইট বন্ধ থাকার কারণে কোন কোন সেবা ব্যাহত হচ্ছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি তিনি।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সাবেক সভাপতি ফাহিম মাশরুর বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে মূলত বিভিন্ন তথ্য প্রকাশ করা হয়। অর্থ লেনদেনের ব্যবস্থার সঙ্গে ওয়েবসাইটটির সরাসরি সম্পর্ক নেই।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের চিফ ডিজিটাল অফিসার খালিদ হোসেনও একই কথা বলেন। তাঁর মতে, ওয়েবসাইট বন্ধ থাকলেই ব্যাংকের দৈনন্দিন লেনদেন বন্ধ হয়ে যায় না।

তবে ওয়েবসাইটটি বন্ধ থাকায় সাধারণ মানুষ, ব্যাংক, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও গবেষকেরা বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত অর্থনৈতিক তথ্য, নীতিমালা, প্রজ্ঞাপন ও পরিসংখ্যান সংগ্রহে সাময়িক অসুবিধায় পড়ছেন।

পিএইচপির নিরাপত্তা ত্রুটি নিয়ে উদ্বেগ

বিশ্বজুড়ে সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের অন্যতম কারণ ওয়েবসাইট তৈরিতে বহুল ব্যবহৃত পিএইচপি প্রোগ্রামিং ভাষায় শনাক্ত হওয়া দুটি গুরুতর নিরাপত্তা ত্রুটি।

পিএইচপি ব্যবহার করে অসংখ্য ওয়েবসাইট ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম পরিচালিত হয়। এসব ত্রুটির সুযোগ নিয়ে হ্যাকাররা ঝুঁকিপূর্ণ সার্ভারে অননুমোদিতভাবে প্রবেশ, সার্ভারের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ কিংবা তথ্য চুরির চেষ্টা করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশের সরকারি সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা বিজিডি ই-গভ সার্টও এ বিষয়ে সতর্কতা জারি করেছে। সংস্থাটি পিএইচপি ব্যবহারকারী সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে দ্রুত নিরাপত্তা হালনাগাদ করার পরামর্শ দিয়েছে। তাৎক্ষণিকভাবে আপডেট করা সম্ভব না হলে সার্ভারে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণসহ বিকল্প নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের চিফ ডিজিটাল অফিসার খালিদ হোসেন বলেন, পিএইচপির নিরাপত্তা ত্রুটির সুযোগ নিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হলে সেখানে থাকা তথ্য পরিবর্তন, বিকৃত করা কিংবা ভুয়া বার্তা প্রদর্শন করা সম্ভব হতে পারে।

তবে কোনো ব্যাংকের সাধারণ ওয়েবসাইট হ্যাক হওয়া মানেই গ্রাহকদের অর্থ বা লেনদেনের তথ্য হ্যাকারদের হাতে চলে যাওয়া নয়। কারণ, সাধারণ ওয়েবসাইট এবং ব্যাংকের মূল লেনদেন পরিচালনাকারী কোর ব্যাংকিং ব্যবস্থা সাধারণত পৃথক প্রযুক্তিগত অবকাঠামোয় পরিচালিত হয়।

খালিদ হোসেন জানান, সাইবার ঝুঁকির সতর্কতা পাওয়ার পর মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক তাদের কয়েকটি ওয়েব পোর্টালের নিরাপত্তা পরীক্ষা করেছে। কিছু পোর্টাল সাময়িকভাবে বন্ধ রেখে প্রয়োজনীয় হালনাগাদ শেষে আবার চালু করা হয়েছে।

সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ওয়েবসাইট বন্ধ

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো ওয়েবসাইটে গুরুতর নিরাপত্তা ত্রুটি শনাক্ত হলে সেটি সাময়িকভাবে অফলাইনে রেখে পরীক্ষা, নিরাপত্তা হালনাগাদ ও পুনরায় যাচাই করার প্রয়োজন হতে পারে। এতে ত্রুটির সুযোগ নিয়ে সম্ভাব্য হামলার ঝুঁকি কমানো যায়।

খালিদ হোসেন বলেন, নিরাপত্তা ত্রুটি সমাধানে শুধু সফটওয়্যার হালনাগাদ করলেই হয় না; প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও পুনরায় স্থাপনের কাজও করতে হয়। এসব কার্যক্রমে সময় লাগতে পারে।

বেসিসের সাবেক সভাপতি ফাহিম মাশরুরের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট বন্ধ রাখার পদক্ষেপ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে নেওয়া হয়েছে। তবে প্রকৃত ঝুঁকি কতটা, তা নির্ধারণে কারিগরি বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

আগে থেকেই সতর্ক করা হয়েছিল ব্যাংকগুলোকে

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৯ অক্টোবর তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করার নির্দেশনা দেয়। এতে নিয়মিত নিরাপত্তা ঝুঁকি যাচাই, সন্দেহজনক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, বিশেষায়িত দল গঠন, গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের ব্যাকআপ সংরক্ষণ এবং সাইবার হামলার পর দ্রুত কার্যক্রম স্বাভাবিক করার প্রস্তুতি রাখার কথা বলা হয়।

এ ছাড়া বিজিডি ই-গভ সার্টও পিএইচপির নিরাপত্তা ত্রুটি নিয়ে সতর্কতা জারি করে। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের চিফ ডিজিটাল অফিসার খালিদ হোসেন জানান, গত বুধবার দুপুর থেকেই ব্যাংকগুলোকে অভ্যন্তরীণভাবে সাইবার ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করা হচ্ছিল।

বিবিসির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, পিএইচপির নিরাপত্তা ত্রুটি নিয়ে উদ্বেগের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ওয়েবসাইট বা কিছু অনলাইন সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে। এর মধ্যে বিভিন্ন সরকারি সংস্থা, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও উইকিমিডিয়ার কিছু ব্যবস্থাও রয়েছে।

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, নিরাপত্তা ত্রুটির প্রযুক্তিগত বিবরণ প্রকাশ্যে আসার পর সেটি কাজে লাগিয়ে হামলার চেষ্টা বাড়তে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দ্রুত নিরাপত্তা হালনাগাদ, সার্ভার পরীক্ষা এবং কর্মীদের সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

এস