প্রতি সপ্তাহে একাধিক অবৈধ স্বর্ণের চালান দেশে আসার সংবাদ উদ্বেগজনক। মূলত অধিক মুনাফার লোভের কারণেই অবৈধ পথে দেশে স্বর্ণের চালান আসছে। দেখা গেছে, বৈধভাবে স্বর্ণ আনা হলে প্রতি বারে খরচ হয় কমপক্ষে ৪৭ হাজার টাকা। অন্যদিকে অবৈধ পথে আসা একই পরিমাণ স্বর্ণের জন্য খরচ হয় মাত্র ২০ হাজার।
স্বর্ণ আমদানির সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা না থাকার কারণেই চোরাচালান বন্ধ হচ্ছে না, এতে কোনো সন্দেহ নেই। ব্যবসায়ীরা স্বর্ণ চোরাচালান রোধে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের দাবি করে আসছেন দীর্ঘদিন ধরে।
এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ জুয়েলারি সমিতি বেশকিছু সুপারিশও দিয়েছিল, যা বাস্তবায়িত হলে অবৈধ পথে স্বর্ণ আনা তেমন লাভজনক হবে না। লাভজনক মনে না হলে চোরাকারবারিরা ঝুঁকি নিয়ে অবৈধ স্বর্ণের চালান দেশে আনবে না, এটা খুবই সহজ হিসাব। কাজেই সুপারিশগুলো আমলে নেয়া উচিত।
গত কয়েক বছরে শুল্ক গোয়েন্দারা অবৈধ পথে আসা অন্তত ২ হাজার কেজি স্বর্ণ জব্দ করেছেন। এছাড়া পুলিশ, র্যাব ও অন্যান্য বাহিনীও বিভিন্ন সময় স্বর্ণ জব্দ করেছে। যুগান্তরের প্রতিবেদনে জানা গেছে, অবৈধ পথে আসা স্বর্ণের চালান আটক ও গ্রেফতার এড়াতে সম্প্রতি স্বর্ণ চোরাচালান সিন্ডিকেট নতুন ফন্দি বের করেছে।
আটটি চালানের একটি ধরা পড়বে- এমন শর্তে তারা দেশে স্বর্ণ আনছে। এ প্রক্রিয়ায় আটক একটি চালানে ক্ষতি হলেও বাকি সাতটিতে প্রচুর লাভ থাকায় অবৈধ স্বর্ণের রমরমা বাণিজ্য রোধ করা যাচ্ছে না। জানা গেছে, চোরাচালানকৃত সোনার বেশিরভাগ বাংলাদেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ভারতের সোনা ব্যবসায়ীদের হাতে তুলে দেয়া হয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে দেশি-বিদেশি সিন্ডিকেট।
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হচ্ছে স্বর্ণ পাচারের ট্রানজিট রুট। দীর্ঘদিন ধরেই এ বিমানবন্দরে একটি শক্তিশালী চক্র লাগেজ ব্যবসার আড়ালে স্বর্ণ, রূপা, মাদক ও মুদ্রাসহ নানারকম মালামাল পাচার করছে। অভিযোগ রয়েছে, অবৈধ এ লাগেজ ব্যবসার বেনিফিশিয়ারি হচ্ছে বিমানের টপ টু বটম। ফলে খোদ প্রধানমন্ত্রীর হুশিয়ারি সত্ত্বেও অশুভ এ প্রক্রিয়া বন্ধ হয়নি।
সন্দেহ নেই, বিমানবন্দরে স্বর্ণ চোরাচালানের ঘটনায় সময়ে সময়ে যাদের আটক করা হয়, তারা কেবল বাহক মাত্র। মূলত এর পেছনে সক্রিয় রয়েছে দেশি-বিদেশি পাচারকারী মাফিয়া চক্র। বিমানবন্দরে স্বর্ণ চোরাচালানসহ অন্যান্য অপরাধ দমনে জিরো টলারেন্স নিয়ে এগিয়ে আসার কথা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে মাঝেমধ্যেই বলা হয়ে থাকে।
কিন্তু বাস্তবে যে তার প্রয়োগ নেই, সমঝোতার মাধ্যমে অবৈধভাবে দেশে স্বর্ণের চালান আনার ঘটনা তার বড় প্রমাণ। সরকার স্বর্ণ চোরাচালানসহ সব ধরনের অপরাধ দমনে শতভাগ আন্তরিক, এটা প্রমাণ করতে হলে অবশ্যই কথার সঙ্গে কাজের মিল থাকতে হবে।
বিমানবন্দরে স্বর্ণসহ অন্যান্য বস্তু চোরাচালানের নেপথ্যে সক্রিয় রয়েছে দেশি-বিদেশি সিন্ডিকেট ও প্রভাবশালী চক্র। এদের সঙ্গে খোদ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের সমঝোতা বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকা স্বর্ণ চোরাচালানের মাত্রা আরও বাড়াবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।
একজন অপরাধীর অবস্থান যাই হোক না কেন- তার দ্বারা সমাজ কলুষিত হয়, রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কাজেই অপরাধীর যথাযথ শাস্তি হওয়া উচিত। বিমানবন্দরে চোরাচালানসহ বিরাজমান অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড দমনে সরকার আন্তরিকতার পরিচয় দেবে, এটাই প্রত্যাশা।
এএস





