প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত শনিবার ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। তাঁদের অধিকাংশের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ থাকলেও একপর্যায়ে প্যারিস, মার্সেইসহ বিভিন্ন শহরে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। কালো পোশাক পরা ও মুখোশধারী কয়েকটি দল রাস্তায় থাকা গাড়ি এবং বিভিন্ন ভবনে আগুন ধরিয়ে দেয়।
বার্তা সংস্থা এএফপির তথ্য অনুযায়ী, প্যারিসে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ও স্টান গ্রেনেড ব্যবহার করে পুলিশ। বিক্ষোভকারীদের একাংশ পুলিশকে লক্ষ্য করে বোতল ও পাথর ছোড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জলকামানও ব্যবহার করা হয়। কয়েকটি স্থানে দাঙ্গা দমনকারী পুলিশের লাঠিপেটার ঘটনাও দেখা গেছে।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শনিবারের সহিংসতায় প্রায় এক হাজার পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে সাতজন গুরুতর আহত। দেশটির বিভিন্ন শহরে সংঘটিত সহিংসতা ও ধ্বংসযজ্ঞকে সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুতর দাঙ্গার ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছে মন্ত্রণালয়।
ঐতিহাসিক সিটি হলে আগুন, ধসে পড়েছে ছাদ
সহিংসতার মধ্যে লিমোজ শহরে উনিশ শতকে নির্মিত একটি ঐতিহ্যবাহী সিটি হলের ভেতরের অংশ আগুনে পুড়ে গেছে। দাঙ্গাকারীদের লাগানো আগুন ভবনটিতে ছড়িয়ে পড়লে একপর্যায়ে ঘড়ির টাওয়ার ও ছাদ ধসে পড়ে।
ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের কাছে দাঁড়িয়ে অ্যানেইস নামের এক নারী বলেন, সরকারের ওপর ক্ষোভ থেকে ঐতিহ্যবাহী স্থাপনায় হামলা চালানো স্বার্থপরতার পরিচয়। এতে শেষ পর্যন্ত সবারই ক্ষতি হচ্ছে।
জেরার্ড নামের আরেক ব্যক্তি ঘটনাটিকে ভয়াবহ ও অবিশ্বাস্য উল্লেখ করে বলেন, ভবনটিকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে।
এদিকে রোববারও প্যারিসের কয়েকটি এলাকা ও লিয়োঁ শহরে লুটপাট এবং পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ অব্যাহত ছিল। রাজধানীর বিভিন্ন দোকানের মালিকদের ভাঙা কাচ সরাতে দেখা যায়। পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা প্রধান সড়কগুলো থেকে আবর্জনা ও ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজ করেন। প্যারিস, মার্সেই ও লিলসহ বিভিন্ন শহরে ব্যাপক লুটপাটের খবর পাওয়া গেছে।
শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বান ম্যাক্রোঁর
সহিংসতা ও লুটপাট বন্ধ করে দেশে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। রোববার এলিসি প্রাসাদ থেকে দেওয়া ভাষণে তিনি বিক্ষোভকারীদের পরিস্থিতির আরও অবনতি না ঘটানোর আহ্বান জানান।
ম্যাক্রোঁ বলেন, বিক্ষোভকারীদের ন্যায্য দাবি এবং যারা ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালিয়েছে, তাদের আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে। তাঁর ভাষায়, বিক্ষোভের সময় দেখা দেওয়া নিয়ন্ত্রণহীন সহিংসতার কোনো যৌক্তিকতা নেই। এসব ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের মুখোমুখি হতে হবে।
তিনি আরও জানান, দোকানপাট ও সরকারি স্থাপনা সুরক্ষায় স্থানীয় প্রশাসন ও মেয়ররা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা করবেন। একই সঙ্গে বিক্ষোভ মোকাবিলায় পুলিশের ভূমিকার বিষয়ে পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার আশ্বাস দেন তিনি।
রাজনৈতিক বিভাজন আরও স্পষ্ট
বিক্ষোভ ও সহিংসতার ঘটনায় ফ্রান্সের রাজনৈতিক অঙ্গনেও মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। আগামী এপ্রিলে অনুষ্ঠেয় নির্বাচন সামনে রেখে দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।
বামপন্থী দল লা ফ্রঁস ইনসুমিজের নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ বিক্ষোভ মোকাবিলায় পুলিশের ভূমিকার সমালোচনা করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে তিনি পুলিশ ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অযোগ্যতার অভিযোগ তোলেন।
অন্যদিকে ডানপন্থী ন্যাশনাল র্যালি দলের নেত্রী মেরিন লে পেন সহিংসতাকে উৎসাহিত করে—এমন রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মাধ্যমে জনগণের ক্ষোভকে কাজে লাগানোর সমালোচনা করেছেন।
বিক্ষোভের ন্যায্য দাবি, পুলিশের ভূমিকা এবং সহিংসতার দায় নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যেই ফ্রান্সে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চলছে।
সূত্র: বিবিসি
এস














