সোমবার (১৯ অক্টোবর) ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) সম্মেলনকক্ষে বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জ ও করণীয় নিয়ে আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ইআরএফ ও বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউট (বিএফটিআই) যৌথভাবে সেমিনারটির আয়োজন করে।
উত্তরণ পেছানোর বিষয়ে অগ্রগতি
এলডিসি উত্তরণ পেছানোর প্রক্রিয়ার অগ্রগতি তুলে ধরে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) ধাপ বাংলাদেশ পার করেছে। এরপর জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদে (ইকোসক) উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রী জানান, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোও বাংলাদেশকে বাড়তি সময় দেওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমি খুবই আশাবাদী, সামনের সপ্তাহ বা তার পরের সপ্তাহে আমরা জিনিসটার একটা নিষ্পত্তি দেখব। আগামী ২৪ নভেম্বরের নির্ধারিত সময়সীমার আগেই সিদ্ধান্ত পাওয়া যাবে বলে আশা করি।’
তিন বছর সময় চাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশের পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছিল না। তাঁর মতে, অর্থনৈতিক ও আর্থিক চ্যালেঞ্জের চেয়ে উত্তরণকে রাজনৈতিকভাবে মহিমান্বিত করার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। ফলে উত্তরণের সুবিধা কাজে লাগানো এবং সম্ভাব্য অসুবিধা মোকাবিলার সক্ষমতা তৈরিতে যথেষ্ট মনোযোগ দেওয়া হয়নি।
বাড়তি সময় পাওয়া গেলে তা কীভাবে কাজে লাগানো হবে, সে বিষয়ে সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভাগ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
বাণিজ্য চুক্তি ও রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ
বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পণ্য ও সেবার প্রবেশাধিকার ধরে রাখতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ২০২৬ ও ২০২৭ সালের মধ্যে আট থেকে দশটি দেশের সঙ্গে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সেপা) অথবা মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে।
ইইউর সঙ্গে এফটিএ আলোচনার জন্য প্রধান আলোচক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রথম দফার কারিগরি আলোচনা শুরুর প্রস্তুতি চলছে, তবে দিনক্ষণ এখনো নির্ধারিত হয়নি। বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের আগেই এ আলোচনা শেষ করা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ইইউর বাজারে জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়ার প্রস্তুতিও চলছে। তবে বাণিজ্যমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, তার আগেই এফটিএ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
এ ছাড়া আঞ্চলিক বিস্তৃত অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে (আরসেপ) যোগ দেওয়ার প্রক্রিয়াও এগোচ্ছে বলে জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে নীতিগত অনুমোদন পাওয়া গেছে; এখন প্রক্রিয়াগত কাজ চলছে।
ব্যবসা সহজ করতে অনলাইন সেবা ও লাইসেন্স সংস্কার
বিনিয়োগ বাড়াতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকারের পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, সহজ ব্যবসায়িক প্রক্রিয়া এবং বিরোধ নিষ্পত্তির স্বচ্ছ আইনি ব্যবস্থা প্রয়োজন বলে মনে করেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশের অভ্যন্তরে পণ্য বিক্রির জন্য মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এবং রপ্তানির জন্য বিদেশি বাজারে প্রবেশাধিকার—দুটিই নিশ্চিত করতে হবে।
ব্যবসা শুরুর দীর্ঘসূত্রতার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ট্রেড লাইসেন্স, ব্যাংক হিসাব ও প্রাথমিক ছাড়পত্র নেওয়ার পর আমদানি নিবন্ধন সনদ সংগ্রহ করে যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ঋণপত্র খুলতে গড়ে ৩৫৫ দিন লেগে যায়। এত দীর্ঘ সময় লাগলে উদ্যোক্তাদের আগ্রহ ধরে রাখা কঠিন।
এ পরিস্থিতি বদলাতে একক অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে ট্রেড লাইসেন্স দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানান মন্ত্রী। এ ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা ও ফি পরিশোধ করে দেশ-বিদেশের যেকোনো স্থান থেকে লাইসেন্স নেওয়া যাবে। ফিও স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কাছে পৌঁছে যাবে।
যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরের (আরজেএসসি) সেবা পুরোপুরি অনলাইনে আনা, বিভিন্ন লাইসেন্সের মেয়াদ তিন থেকে পাঁচ বছর করা এবং বিভিন্ন সংস্থার পৃথক পরিদর্শনের পরিবর্তে সমন্বিত পরিদর্শন চালুর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
বাণিজ্যমন্ত্রীর প্রত্যাশা, এসব সংস্কারের মাধ্যমে ২০২৭ সালের মধ্যে লাইসেন্স ও অনুমতির জন্য উদ্যোক্তাদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরিস্থিতি থেকে বের করে আনা সম্ভব হবে।
জ্বালানি সরবরাহ ও সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ
জ্বালানি সংকটকে নতুন বিনিয়োগের বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, সরবরাহ বাড়াতে নতুন ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল স্থাপন ও গ্যাসকূপ খননের কাজ চলছে। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতেও পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার।
এলএনজি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যাপ্ত মজুতব্যবস্থা না থাকায় আন্তর্জাতিক সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে বাংলাদেশ চাপে পড়ে বলে মন্তব্য করেন তিনি। এ জন্য কৌশলগত মজুত ও সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন মন্ত্রী।
দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি, ব্যবসা সহজ করা এবং বিশ্ববাজারে প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণের সমন্বিত লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে বলে জানান তিনি।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন ইআরএফের সভাপতি দৌলত আক্তার মালা। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিএফটিআইয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. মোস্তফা আবিদ খান। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ইআরএফের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য এস এস এম মঈনুল হক।
এস
















