মার্কিন নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিজয়ের পর মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ সমাপ্তির আশা দেখেছিলেন শান্তিকামী মানুষ। নির্বাচনের পর ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছিলেন তিনি নিশ্চিত যে ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর রাশিয়ার সাথে তার দেশের যুদ্ধ ‘দ্রুত শেষ’ হবে।
তবে এখন পর্যন্ত যুদ্ধ বন্ধের কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি, বরং নির্বাচনে হেরে জো বাইডেন রাশিয়ার ভূখণ্ডে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জন্য ইউক্রেনকে সবুজ সংকেত দেন। যাকে আগুনে ঘি ঢালার সঙ্গে তুলনা করেন বিশ্লেষকরা। কারণ এসব ক্ষেপণাস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রই ইউক্রেনকে সরবরাহ করেছিলো। যার প্রতিক্রিয়ায় রাশিয়ার ভেতরে আমেরিকার ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত করলে পাল্টা জবাব দেয়ার ঘোষণা দেয় মস্কো।
মূলত মার্কিন নির্বাচনের আগে কয়েকমাস ধরে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র (এটিএসিএমএস নামে পরিচিত) ব্যবহারের ওপর বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে অনুরোধ করে আসছিলো, যাতে করে কিয়েভ নিজ দেশের সীমানার বাইরে এ ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করে হামলা চালাতে পারে। এসব অস্ত্র বছরের শুরুতেই ইউক্রেনকে দিয়েছিল মার্কিন প্রশাসন। দেশের বাইরে ব্যবহারের সবুজ সংকেত পেয়ে জেলেনস্কি বলেন, ‘এসব বিষয় ঘোষণা করা হয়নি, ক্ষেপণাস্ত্রই তাদের জন্য কথা বলবে’।
বিবিসি ইন্সটিটিউট ফর দি স্টাডি অফ ওয়ার বা আইএসডব্লিউ- এর তথ্যের বরাতে বলছে, ২০২৩ সালে ইউক্রেনের যে পরিমাণ ভূমি রাশিয়া দখল করেছিল, তার চেয়ে অন্তত ছয় গুণ বেশি ভূমি চলতি বছরে নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। দেশটি এখন ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় দনবাস এলাকায় দেশটির লজিস্টিক বা রসদ সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
অন্যদিকে রাশিয়ার কুরস্ক অঞ্চলে ইউক্রেন যে বিস্ময়কর অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছিল তা এখন নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছে। রাশিয়ান বাহিনী তাদের পেছনের দিকে যেতে বাধ্য করছে। বিশ্লেষকরা কিয়েভের ওই আক্রমণকে কৌশলগত বিপর্যয় উল্লেখ করে বলেছেন, এর ফলে ইউক্রেন এখন লোকবল সংকটের মুখে পড়েছে।
এর মধ্যেই ইউক্রেন যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহকৃত দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে রাশিয়ায় হামলা চালিয়েছে বলে জানিয়েছে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। আবার ইউক্রেন যদি যুক্তরাষ্ট্রের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে রাশিয়ার ভূখণ্ডে আঘাত হানে, তবে তার জবাবে তারা "যথাযথ ও কার্যকর" পদক্ষেপ নেবার হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছে রাশিয়া। তবে সেই প্রতিক্রিয়া এখনো দেখায়নি পুতিনের দেশ।
বছরের শুরুতেই গত ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ শহর আভডিভকা দখলের পর আরও পশ্চিমে অগ্রসর হয়ে বেশকিছু গ্রাম দখল করে নেয় রাশিয়া। তখন ইউক্রেন বলেছিল তাদের সেনারা অবস্থান ধরে রেখেছে, কিন্তু রাশিয়ার সেনারা এখন রণাঙ্গনের প্রায় এক হাজার ১০০ কিলোমিটার জুড়ে পাঁচটি এলাকায় আক্রমণ করছে। এছাড়া দোনেৎস্ক অঞ্চলের পূর্বাঞ্চলে ইউক্রেনের যোদ্ধাদের ব্যাপক পরীক্ষার মুখে পড়তে হয় ইউক্রেন বাহিনীর। এই যুদ্ধের প্রভাব পড়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের ওপর।
মার্চে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) রাশিয়ার কয়েকজন শীর্ষ কমান্ডারের বিরুদ্ধে ইউক্রেনে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ তুলে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। এদের মধ্যে সের্গেই কবিলাশ এবং ভিক্টর সোকলভের নাম প্রকাশ করা হয়। এদের একজন সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট জেনারেল এবং অন্যজন নৌবাহিনীর এডমিরাল।
যুদ্ধের মধ্যেই মাসে রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত হয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। পঞ্চমবারের মতো দায়িত্ব নেয়ার পর প্রথম দেশ হিসেবে চীন সফর করেন পুতিন। কূটনৈতিক সম্পর্কের ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে সেখানে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেন দুই রাষ্ট্রপ্রধান। এই সফরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা করেন দুই বিশ্বনেতা। বিশেষ করে রাশিয়ার অর্থনীতি সমৃদ্ধ করতে আলোচনায় জোর দেন পুতিন।
যুদ্ধ শুরুর পর পশ্চিমা খড়গ নেমে আসে রাশিয়ার ওপর। পরে অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রাখতে চীনের ওপর নির্ভরতা বাড়ায় পুতিনের দেশ। যদিও রাশিয়ায় চীনের সামরিক-বেসামরিক উভয় কাজে ব্যবহার করা যায় এমন দ্রব্য এবং অস্ত্র রপ্তানির সমালোচনা করে আসছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ। চীনের কাস্টমস্-এর তথ্য অনুযায়ী গত বছর ২৪০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বাণিজ্য হয়েছে দুই দেশের মধ্যে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য যুদ্ধের সময় রাশিয়ায় চীনের গাড়ি রপ্তানি ব্যাপকভাবে বেড়েছে। গেল বছর তারা সাড়ে নয় লাখ গাড়ি রপ্তানি করেছে। আগের বছরের তুলনায় ৪৮১ শতাংশ বেড়েছে এই খাতের বাণিজ্য। চীনের গণমাধ্যম সিনহুয়াকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তখন পুতিন বলেন, গত পাঁচ বছরে দুই দেশের বাণিজ্যের আকার দ্বিগুণ হয়েছে।
পরের মাসেই যুক্তরাষ্ট্র পার্লামেন্টের প্রতিনিধি পরিষদে রাশিয়ার আগ্রাসন ঠেকাতে লড়াইরত ইউক্রেনকে নতুন করে সামরিক সহায়তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিল পাস হয়। ৬১ বিলিয়ন ডলারের এই প্যাকেজটি পেতে একটি ভঙ্গুর দ্বিদলীয় সমঝোতা হয়। এই সামরিক সহায়তার মধ্যে ইউক্রেনের জন্য কমপক্ষে ৮ বিলিয়ন ইউএস ডলার মূল্যের অস্ত্র ছিল। এগুলোর মধ্যে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, মাঝারি থেকে দূর-পাল্লার মিসাইল এবং কামানের গোলা ছিল। বিলটি পাসের পর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তিনি বলেন, “গণতন্ত্র এবং স্বাধীনতার বৈশ্বিক গুরুত্ব সবসময়ই থাকবে, আমেরিকা যতদিন এর সুরক্ষায় সহায়তা করবে ততদিন এটি ব্যর্থ হবে না।
তবে ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ পাল্টা প্রতিক্রিয়াতে বলেন, এই প্যাকেজ ‘যুক্তরাষ্ট্রকে আরও ধনী বানাবে, ইউক্রেনকে আরও ধ্বংস করবে এবং ফলাফলস্বরুপ এমনকি আরও বেশী ইউক্রেনিয়ানের মৃত্যু দেখা যাবে’।
এরপর সামনে আসে নতুন তথ্য। জানা যায়, ইউক্রেন গোপনে দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এ অস্ত্র চলতি মার্চে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের অনুমোদন করা তিনশো মিলিয়ন ডলারের প্যাকেজ সহায়তার অংশ ছিল। এগুলো এপ্রিল মাসেই কিয়েভের হাতে পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী রাশিয়ার দখলীকৃত ক্রাইমিয়াতে রুশ বাহিনীর অবস্থান লক্ষ্য করে এর মধ্যে অন্তত একবার হলেও এ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। তখন স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র ভেদান্ত পাটেল বলেন, “আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি যে যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে প্রেসিডেন্টের সরাসরি নির্দেশনাতেই দূরপাল্লার এটিএসিএমএস সরবরাহ করেছে।” পরে নভেম্বর মাসে এসে এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো রাশিয়ার ভেতরে ব্যবহারের অনুমতি দেন বাইডেন।
জুন মাসে জব্দ করা রাশিয়ার সম্পদ থেকে ইউক্রেনকে ৫০ বিলিয়ন ডলার ব্যবহার করতে দিতে সম্মত হয় শিল্পোন্নত দেশগুলোর জোট জি-৭। ইউক্রেনকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে সহায়তার জন্য এই অর্থ দেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়। এসময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেন, এটা রাশিয়াকে আরেকবার মনে করিয়ে দেয়া যে, ‘আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি না’। তবে এর পাল্টা হিসেবে ‘সর্বোচ্চ বেদনাদায়ক’ পদক্ষেপ নেয়ার হুমকি দেয় মস্কো। ইটালিতে জি-৭ সামিটে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এবং বাইডেন দশ বছর মেয়াদী একটি দ্বিপাক্ষিক নিরাপত্তা চুক্তিতেও স্বাক্ষর করেন। যাকে ‘ঐতিহাসিক’ হিসেবে আখ্যায়িত করে কিয়েভ।
একই মাসে সুইজারল্যান্ডে একটি শান্তি সম্মেলনে অংশ নিয়ে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেন, মস্কো সেনা প্রত্যাহার করলে কিয়েভ আগামীকালই রাশিয়ার সাথে শান্তি আলোচনায় বসতে প্রস্তুত। তবে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যুদ্ধ থামাবেন না। তাই, সামরিক হোক আর কূটনৈতিক উপায়ে হোক যেকোনো মূল্যে যুদ্ধ থামাতে হবে। তিনি বলেন, যুদ্ধে জয়ী হতে পশ্চিমা সহায়তা যথেষ্ট নয়, কিন্তু সম্মেলন থেকে বোঝা গেছে ইউক্রেনের প্রতি আন্তর্জাতিক সমর্থন দুর্বল হয়নি।
এই সম্মেলন থেকে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে যুদ্ধবিরতির জন্য দেয়া রুশ প্রেসিডেন্টের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন ইটালি ও জার্মানির নেতারা। ইটালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি রুশ প্রেসিডেন্টের পরিকল্পনাকে ‘প্রোপাগান্ডা’ অর্থাৎ অপপ্রচার হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, যার অর্থ হলো রাশিয়াকে অবশ্যই ইউক্রেন থেকে সরে আসতে হবে। জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎজ পুতিনের প্রস্তাবকে ‘স্বৈরতান্ত্রিক শান্তি’ আখ্যা দিয়ে তা নাকচ করেন। শান্তি সম্মেলনে একটি খসড়া ঘোষণাপত্র প্রকাশ করা হয়েছে, যেখানে ইউক্রেনের ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা এবং দেশটির বিরুদ্ধে যে কোন পারমাণবিক হুমকিকে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।
সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসজুড়ে ইউক্রেনে হামলায় ভিন্নতা আনে রাশিয়া। এ সময় দেশটির বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে রুশ বাহিনী। এসব হামলায় হতাহত কম হলেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয় ইউক্রেন। পরে নভেম্বর মাসে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন বৃদ্ধির কথা ফাঁস হয়। ইউরোপীয় এক গবেষক দাবি করেন, স্যাটেলাইটে ধারণকৃত ছবিতে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন বৃদ্ধির পরিকল্পনার বিষয়টি দেখা গেছে। পাঁচটি কমপ্লেক্সে এমন বড় সম্প্রসারণ লক্ষ করা যাচ্ছে, যেখানে রাশিয়া কঠিন-জ্বালানি ক্ষেপণাস্ত্র ইঞ্জিন তৈরি করেছে। এই সম্প্রসারণ ইঙ্গিত দিচ্ছে ইউক্রেনে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধির পরিকল্পনা করেছে দেশটি।
রয়টার্স গ্লোবাল সিকিউরিটি থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (আইআইএসএস) এর বার্লিন-ভিত্তিক গবেষক ফ্যাবিয়ান হিনজ, রাশিয়ার মিডিয়া রিপোর্ট ব্যবহার করে এই কমপ্লেক্স শনাক্ত করেন। তিনি কোল্ড ওয়ার-যুগের সিআইএ নথিগুলোকে বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, সেখানে সোভিয়েত ইউনিয়নের শক্ত- জ্বালানী মিসাইল ইঞ্জিন রয়েছে। সাইটগুলো সাইবেরিয়ার আলতাই প্রজাতন্ত্র, দক্ষিণ রাশিয়ার রোস্তভ, মস্কো এবং সেন্ট পিটার্সবার্গের বাইরে এবং পশ্চিম রাশিয়ার পার্মে রয়েছে।
আইআইএসএস ব্লগ মিলিটারি ব্যালেন্স প্লাসে প্রকাশিত প্রতিবেদনে গবেষক হিনজ লিখেছেন, "স্যাটেলাইট ছবিগুলো ইঙ্গিত দেয় যে কঠিন-চালিত রকেট মোটর-উৎপাদন ক্ষমতাই মূলত এই প্রচেষ্টার প্রধান লক্ষ্য। এ বিষয়ে রয়টার্সের পক্ষ থেকে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য জানতে চাইলে, তারা কোনো জবাব দেয়নি। তবে পুতিন সরকার আগামী বছর জাতীয় প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়িয়ে মোট দেশজ উৎপাদনের ৬ দশমিক ৩ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা করেছে, যা যুদ্ধ শুরুর পর সর্বোচ্চ।
২১ নভেম্বর ইউক্রেনের দিনিপ্রো শহরে হামলা চালায় একটি রুশ বিমান। এতে নতুন একটি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছে যা ভীষণ শক্তিশালী। হামলাটি এমন এক বিস্ফোরণ ঘটায় যা তিন ঘণ্টা ধরে চলতে থাকে। ক্ষেপণাস্ত্রটি এতোটাই শক্তিশালী ছিল, যে ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা একে আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম)-এর বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন বলে জানান।
এই হামলার পর রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেন, দেশটির হাতে ‘ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত’ শক্তিশালী নতুন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র মজুদ আছে। এর নাম দেয়া হয়েছে ‘ওরেশনিক ক্ষেপণাস্ত্র’। তিনি বলেন, একে বাধা দেয়া যায় না। ওরেশনিক হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র শব্দের চেয়ে ১০ গুণ বেশি গতিতে উড়ে যেতে পারে উল্লেখ করে পুতিন বলেন, তিনি এর উৎপাদনের নির্দেশ দিয়েছেন।
হামলার পর ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি পুতিনকে ‘সমুচিত জবাব’ দেয়ার জন্য বিশ্ব নেতাদের প্রতি আহবান জানান। তবে তার আহ্বানে কেউ সাড়া দেননি।
রুশ সামরিক বিশেষজ্ঞ ইলিয়া ক্রামনিক বলেন, ওরেশনিক সম্ভবত মধ্যম-পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের নতুন প্রজন্ম। এই ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ২,৫০০ থেকে ৩,০০০ কিলোমিটার (১,৫৫০-১,৮৬০ মাইল) এবং সম্ভবত ৫,০০০ কিলোমিটার (৩,১০০ মাইল) পর্যন্ত প্রসারিত হতে পারে অর্থাৎ সর্বোচ্চ ৫,০০০ কিলোমিটারের দূরের লক্ষ্যবস্তুতে এটি আঘাত হানতে সক্ষম। তবে এটি কোন আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র নয়।
তিনি বলেন, "এতে নিশ্চিতভাবে এমন একটি ওয়ারহেড রয়েছে যা আলাদা হয়ে যেতে পারে যার প্রতিটির নিজস্ব গাইডেন্স ইউনিট বা গতিবিধি নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা রয়েছে"। তিনি ধারণা দিয়েছেন, এটি ইয়ারস-এম ক্ষেপণাস্ত্রের একটি ছোট সংস্করণ হতে পারে, যা কিনা একটি আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম)।
অপর এক বিশেষজ্ঞ দিমিত্রি করনেভের মতে, ওরেশনিক সম্ভবত ছোট পাল্লার ইস্কান্দার ক্ষেপণাস্ত্রের উপর ভিত্তি করে তৈরি, যা ইউক্রেনে প্রায়ই ব্যবহার করা হয়, কিন্তু এবারে এতে নতুন প্রজন্মের ইঞ্জিন যোগ করা হয়েছে। গত বসন্তে রাশিয়ার কাপুস্তিন ইয়ার টেস্টিং সাইটে একটি বড় ইঞ্জিনযুক্ত ইস্কান্দার পরীক্ষামূলক ব্যবহার করা হয়, যা সম্ভবত ওরেশনিক হতে পারে।
নতুন করে পুতিনের এমন অস্ত্রের ব্যবহার পশ্চিমাদের প্রতি কড়া বার্তা দিচ্ছে। যাতে যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের আগে ইউক্রেন আরও চিন্তা ভাবনা করে।
ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে রাশিয়ার জয়জয়কর : যুদ্ধ শুরুর কয়েক মাসে রাশিয়া খুব দ্রুতই এগিয়ে গেলেও ইউক্রেনের পাল্টা অভিযান শুরুর পর সেই গতি মন্থর হয়ে যায়। নতুন তথ্য উপাত্ত থেকে দেখা যাচ্ছে ২০২৪ সালে যুদ্ধে সুবিধাজনক অবস্থান ধরে রেখেছে রাশিয়া। আইএসডব্লিউর তথ্য অনুযায়ী চলতি বছর রাশিয়া ইউক্রেনের দুই হাজার ৭০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা দখলে নিয়েছে। গত বছর এই পরিমাণ ছিল ৪৬৫ বর্গকিলোমিটার।
লন্ডনের কিংস কলেজের প্রতিরক্ষা বিষয়ক গবেষক ড. মারিনা মিরন বিবিসিকে বলছেন যে রাশিয়া এখনকার গতিতে অগ্রসর হতে থাকলে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় ফ্রন্ট ধ্বসে পড়তে পারে। রাশিয়া চলতি বছরের ১ সেপ্টেম্বর থেকে ৩ নভেম্বরের মধ্যেই দখল করে নিয়েছে এক হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা। এর মধ্যে রয়েছে খারকিভের কুপিয়ানস্ক এবং কুরাখভ অঞ্চল, যা দোনেৎস্ক অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ হাব। এর মধ্যে কুপিয়ানস্ক ও ওসকিল নদীর পূর্ব অঞ্চল ২০২২ সালে ইউক্রেন একবার মুক্ত করে নিলেও পরে রাশিয়া ফের তা দখলে নেয়। সাম্প্রতিক গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী রাশিয়ানরা শহরের উত্তর পূর্বাঞ্চলে প্রবেশের চেষ্টা করছে।
আইএসডব্লিউ বলছে মস্কো এখন ইউক্রেনের মোট এক লাখ ১০ হাজার ৬৪৯ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। অন্যদিকে কুরস্কে রাশিয়ার এক হাজার ১৭১ বর্গকিলোমিটার এলাকায় এখন ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে। যদিও এর মধ্যে এর অর্ধেক রাশিয়ান বাহিনী পুনর্দখল করেছে। তবে এই অগ্রগতির জন্য রাশিয়াকে অনেক মূল্য দিতে হয়েছে।
বিবিসি রাশিয়ান নিশ্চিত করেছে, ২০২২ সালে যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়ার কমপক্ষে ৭৮ হাজার ৩২৯ সৈন্য মারা গেছে। ওদিকে রাশিয়ার অগ্রগতি সত্ত্বেও কিছু বিশ্লেষক মনে করেন অভিযানের গতি খুবই ধীর। সামরিক বিশ্লেষক ডেভিড হান্ডেলম্যান বলছেন পূর্বাঞ্চল থেকে সংরক্ষিত লোকবল ও রসদ ধীরে ধীরে সরিয়ে নিচ্ছে ইউক্রেনীয় সেনারা।
এসএম





