বুধবার (১২ আগস্ট) ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা মেহের নিউজের এক প্রতিবেদনে এ দাবি করা হয়। পরে ইরানের আরেক সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজও একই ধরনের তথ্য প্রকাশ করে।

তবে রণতরীতে সাতজন মার্কিন নৌসদস্য নিহত হওয়ার এই দাবির স্বাধীন কোনো নিশ্চিতকরণ তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। মার্কিন নৌবাহিনী বা সেন্ট্রাল কমান্ডের পক্ষ থেকেও এ ঘটনার বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ফলে ঘটনাটি আপাতত ইরানি সংবাদমাধ্যমের দাবি হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।

দীর্ঘ মোতায়েনে চাপে নাবিকরা

ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন দীর্ঘ সময় ধরে মধ্যপ্রাচ্য ও আশপাশের জলসীমায় মোতায়েন রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের কারণে রণতরীটির স্বাভাবিক মোতায়েনের সময়ও দীর্ঘ হয়েছে। জুলাইয়ের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, রণতরীটি টানা ২০০ দিনের বেশি সমুদ্রে অবস্থান করে নতুন রেকর্ড তৈরি করেছিল।

দীর্ঘ সময় সমুদ্রে অবস্থান এবং যুদ্ধকালীন দায়িত্ব পালনের কারণে রণতরীটির নাবিকদের ওপর মানসিক ও শারীরিক চাপ বাড়ছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। নাবিকদের পরিবারের সদস্যরাও দীর্ঘ মোতায়েন, খাদ্য ও জীবনযাপনের বিভিন্ন সমস্যা এবং মানসিক চাপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

ইরানি সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি, এই দীর্ঘ মোতায়েনকে কেন্দ্র করে রণতরীর নাবিকদের মধ্যে অসন্তোষ আরও তীব্র হয়। একপর্যায়ে পরিস্থিতি সহিংস সংঘর্ষে রূপ নেয়।

সেন্টকম কর্মকর্তার উপদেষ্টাকে ঘিরে উত্তেজনা

তাসনিম নিউজের প্রতিবেদনে একটি সামরিক সূত্রের বরাতে বলা হয়, দীর্ঘদিন রণতরীতে অবস্থান করায় নাবিকদের পরিবারের পক্ষ থেকেও অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়। এ নিয়ে তৈরি হওয়া অভিযোগ ও পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান ব্র্যাড কুপারের একজন উপদেষ্টা রণতরীতে যান।

প্রতিবেদনটির দাবি, ওই কর্মকর্তা রণতরীতে পৌঁছে নাবিকদের উদ্দেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। নাবিকদের একটি অংশ তার বক্তব্যের বিরোধিতা করে স্লোগান দেন। এমনকি তাকে লক্ষ্য করে পানির বোতল ছোড়ার ঘটনাও ঘটে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

এরপর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয় এবং নাবিকদের মধ্যে হাতাহাতি শুরু হয় বলে তাসনিমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। পরে সংঘর্ষে ছুরি ও অন্যান্য ধারালো অস্ত্র ব্যবহারের দাবি করা হয়েছে। এতে সাতজন মার্কিন নৌসদস্য নিহত এবং আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে ইরানি সংবাদমাধ্যমটি।

ঘটনার সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন

তবে এত বড় একটি প্রাণঘাতী সংঘর্ষের বিষয়ে মার্কিন সামরিক কর্তৃপক্ষের কোনো নিশ্চিত বক্তব্য পাওয়া না যাওয়ায় দাবিটির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে একটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরীতে সাতজন নাবিকের নিহত হওয়ার মতো ঘটনা ঘটলে তা সাধারণত মার্কিন নৌবাহিনী বা প্রতিরক্ষা বিভাগের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে আসার কথা।

এর আগে মার্চে ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কনে দায়িত্ব পালনরত এক নাবিক ফ্লাইট অপারেশনের সময় আহত হয়েছিলেন। মার্কিন নৌবাহিনী জানিয়েছিল, ওই ঘটনা যুদ্ধ-সম্পর্কিত ছিল না এবং নাবিককে চিকিৎসার জন্য তীরে নেওয়া হয়েছিল।

অন্যদিকে, ইরান আগেও ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কনকে লক্ষ্য করে হামলা চালানোর দাবি করেছে। মার্চে তাসনিম নিউজের এক প্রতিবেদনে ইরানের পক্ষ থেকে রণতরীটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি করা হয়েছিল। তবে এ ধরনের দাবির ক্ষেত্রেও দুই পক্ষের বক্তব্যে পার্থক্য ছিল।

দীর্ঘতম মোতায়েনের চাপে ‘লিঙ্কন’

ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন একটি নিমিটজ শ্রেণির পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরী। এতে কয়েক হাজার নাবিক ও মেরিন সদস্য দায়িত্ব পালন করেন। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে রণতরীটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

জুলাইয়ে প্রকাশিত Stars and Stripes-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, রণতরীটি টানা ২০৭ দিন সমুদ্রে অবস্থান করে আগের রেকর্ড ভেঙেছিল। দীর্ঘ এই সময় সমুদ্রে থাকা ক্রুদের সহনশীলতা ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর চাপ তৈরি করছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে রণতরীটির নাবিকদের পরিবারের পক্ষ থেকেও দীর্ঘ মোতায়েন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশের খবর এসেছে। এসব ঘটনায় ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কনের দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েন এবং এর ফলে ক্রুদের ওপর তৈরি হওয়া চাপ নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

তবে রণতরীতে সংঘর্ষে সাতজন নিহত হওয়ার দাবি এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত নয়। ফলে ঘটনার বিষয়ে মার্কিন সামরিক কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া গেলে এর প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।

সূত্র: মেহের নিউজ

এমএম