১৫ জুলাইয়ের তুরস্কের ইতিহাসের ভয়াবহ সেনা ক্যু ব্যর্থ হবার পর গত ১৮ জুলাই সিএনএন তুর্ক এর সাথে এক এক্সক্লুসিভ ইন্টারভিউ দেন দেশটির রাষ্ট্রপতি এরদোয়ান। ইন্টারভিউতে উঠে এসেছে সে দিনের আদ্যোপান্ত এবং ঘটনা পরবর্তী তার ভবিষ্যত পরিকল্পনা। ইন্টারভিউটি নিয়েছেন সিএনএন এর সিনিয়র সাংবাদিক বেকি এন্ডারসন | কিছুটা শর্টকার্ট করে চুম্বক অংশগুলো নিচে তুলে ধরছি।

১৫ মিনিটি থাকলে হত্যা করা হতো

“১৫ তারিখে আমি ছিলাম পরিবারের সাথে ৫ দিনের ছুটি কাটাতে মারমারিস নামের এক অঞ্চলে। যেখানে আমি অবস্থান করছিলাম সেখানেও হামলা করা হয়েছে এবং আমার ২ জন একান্ত বডিগার্ডকে শহীদ করা হয়েছে। আমি যদি সেখানে আর ১০ বা ১৫ মিনিট থাকতাম তাহলে আমাকেও হয়তো হত্যা বা আটক করা হতো।”

এয়ারপোর্টের কন্ট্রোল সেন্টার টাওয়ার উদ্ধার

“বিদ্রোহীরা ইস্তানবুল এয়ারপোর্টের ফ্লাইট কন্ট্রোল টাওয়ার এর নিয়ন্ত্রণ করেছিল। তখন আমি আমার ফোনের মাধ্যমে ইস্তানবুল পুলিশ এর হেড কে আদেশ দিয়েছিলাম বিদ্রোহীদের কাছ থেকে ফ্লাইট কন্ট্রোল সেন্টার টাওয়ার উদ্ধার করার জন্য। ইস্তানবুল পুলিশ তখন একটি অপারেশন করে টাওয়ারকে মুক্ত করে। অবশ্য আমি তখন আকাশে ছিলাম তাই যোগাযোগ কিছুটা বিচ্ছিন্ন ছিল|”

জনতার সামনে উপস্থিত হলেন যেভাবে

“আমি বিমানের পাইলটদের সাথে জিজ্ঞেস করেছিলাম আমরা আকাশে কতক্ষন থাকতে পারবো? তারা জানাল, ৩ থেকে ৪ ঘন্টা। এয়ারপোর্টে নামার পর থেকেই বিদ্রোহীরা আমাদের উপর এফ-১৬ বিমান উড়াচ্ছিল, সম্ভবত স্পিড অফ সাউন্ড এর চাইতেও দ্রুত গতিতে।

তারা এতো দ্রুতগতিতে উড়াচ্ছিল যে সোনিক বুম এর কারণে বিমানের শব্দ কে বোমার শব্দ মনে হচ্ছিল । সে সময় এয়ারপোর্টে আমাদের প্রায় দশ হাজার সমর্থক উপস্থিত হয়েছিল। এসবের মাঝেই আমি বিমান থেকে বের হয়ে আসলাম আর আমার জনতার সামনে প্রথমবারের মত উপস্থিত হলাম।”

ভয় পেয়েছিলেন কি?

“আপনি যখন ইস্তানবুল এয়ারপোর্টে অবতরণ করবেন তখন আপনি আর তুরস্কের প্রেসিডেন্ট হিসেবে থাকবেন কি না এমন ভয় হয়েছিল কি, এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন, না, এমন কোন ধারণা আমার মনে কখনো উদয় হয়নি। আমরা কেউই এধরণের ভীতিমূলক চিন্তা করিনি। প্রথম ঘোষণা থেকেই আমরা পরিষ্কার বলেছিলাম যে, তুর্কি রাষ্ট্র অক্ষত আছে, সরকার কার্যকর আছে এবং প্রেসিডেন্ট বহাল আছেন; ভয়ের কোন কারণ নেই; বিদ্রোহীদেরকে যথাসম্ভব নির্মূল করা হবে; আর তা করতে মাত্র ১২ ঘন্টা লেগেছে। মাত্র ১২ ঘন্টায় আমরা আমাদের কাঙ্খিত ফলাফল লাভ করতে সক্ষম হয়েছি।”

বিদ্রোহ কি সাজানো ঘটনা?

“এই বিদ্রোহ কি একটি সাজানো ঘটনা- এমন প্রশ্নের উত্তরে বলেন, “দুঃখজনকভাবে তা একটি ভুল ধারণা। কিভাবে এধরণের একটি ঘটনা প্ল্যান করা যায় বা সাজানো যায়? কিভাবে অসংখ্য সাধারণ জনগণকে এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন করা যায়? ২০৮ জনের মতো নিরীহ মানুষ মারা গেছেন, ১৫০০ জনের মতো আহত হয়েছেন, মিলিয়ন জনতা রাস্তায় নেমে এসেছেন, ট্যাঙ্কের সামনে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন- এসব কিভাবে সাজানো যায়? এটা অসম্ভব ব্যাপার।”

ঝুঁকি নিয়েই রাজনীতি করি

“আমরা সবসময় জনগণের স্বার্থে আমাদের জীবনের ঝুঁকি নিয়েছি, এরকম ঝুঁকি নিয়েই আমরা রাজনীতি করে আসছি। যারা এই ক্যু এর উদ্যোগ নিয়েছিল তারা আসলে সবসময় এধরণের ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটাতে সক্ষম। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে এই ক্যু এর উদ্যোক্তারা জনতার দ্বারাই প্রতিহত হচ্ছিল।”

ক্যু আমাদের জন্য আশীর্বাদ স্বরূপ

“এই ক্যু প্রতিহত করে আমরা যা অর্জন করেছি তা হলো- ফেতুল্লাহ গুলেনের এই সন্ত্রাসী গ্রূপটি সবচাইতে বড় আঘাত পেয়েছে। এই গ্রূপটি এতদিন নিরস্র ছিল এখন তারা অস্র হাতে নেমে এসেছে। এখন তারা জনগণের কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে। তারা এই দেশের অস্র দিয়ে দেশের জনগণের বিরুদ্বে নেমেছে।”

গুলেনকে না দিলে আমরাও কাউকে দেবনা

“গুলেনকে ফিরিয়ে আনতে বেশ কয়েকবার প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সাথে কথা বলেছি, আমাদের প্রাইম মিনিস্টারও কথা বলেছেন। এই সপ্তাহে লিখিতভাবে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ করা হবে, কিছু আফ্রিকান এবং ইউরোপিয়ান দেশের কাছেও এরকম আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানানো হবে। গুলেনকে ফিরিয়ে না দিলে আমেরিকা কখনো কাউকে তুরস্ক থেকে ফিরিয়ে নিতে চাইলে আমি প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাতে অনুমোদন দিবো না। কারণ ইতিপূর্বে যখনি তারা কাউকে ফিরিয়ে নিতে চেয়েছিল আমরা তাদেরকে ফিরিয়ে দিয়েছি, আমাদের মাঝে এই বিষয়ে চুক্তি রয়েছে।

আপনি যখন আমার কাছে কাউকে ফিরিয়ে দেয়ার অনুরোধ করেছেন আমি তা রক্ষা করেছি। এখন তার প্রতিক্রিয়া হওয়া দরকার। যদি সেই ব্যক্তি আমেরিকার নাগরিকও হয়- তবুও আমেরিকার উচিত নয় এমন একজন সন্ত্রাসীকে রাখা। আমাদের দলিলে পরিষ্কারভাবে তার সংগঠনের সন্ত্রাসী কার্যকলাপ ধরা পড়েছে। আমরা স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার, তাই আমেরিকাকে অবশ্যই তাকে ফিরিয়ে দিতে হবে।”

আমেরিকার সন্ত্রাসী লিষ্টে না থাকলেও ফিরিয়ে দিতে হবে

“যখন আমেরিকা কোন সন্ত্রাসীকে ফিরিয়ে নিতে চায়- সেই ব্যক্তি যদি আমাদের সন্ত্রাসীদের লিস্টে না থাকে- তাহলে আমরা কি বলবো? কোন ব্যক্তি যদি আমার লিস্টে থাকে তাহলে আপনার উচিত তাকে আমার কাছে ফিরিয়ে দেয়া- সে আপনার লিস্টে না থাকলেও। আমাদের কাছে এধরনে অনেক উদাহরণ রয়েছে। আমরা বিন লাদেনের কথা বলতে পারি। তিনি তো আফগানিস্তানের সন্ত্রাসী লিস্টে ছিলেন না । কিন্তু আমেরিকা তাকে ফিরিয়ে দিতে দাবি করেছিল- আফগানিস্তান তাতে সাড়া না দেয়ায় আমেরিকা তাকে হত্যা করেছিল।”

পার্লামেন্ট অনুমোদন করলে মৃত্যুদন্ড আইন অনুমোদন

“আমেরিকায় মৃত্যুদন্ড আছে । রাশিয়াতে আছে, চায়নাতে ও আছে। ইউরোপিয়ান দেশগুলোতে নেই। আমাদের পূর্ববর্তী সরকার ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এ যোগ দেয়ার আলোচনা সাপেক্ষে মৃত্যুদন্ড বাতিল করেছিল। এখন তা পার্লামেন্টে আলোচনা করা যেতে পারে। আমাদের সরকার তা বাতিল করেছিল, আবার পুনর্স্থাপনও করতে পারে। যদি পার্লামেন্ট সেই সিদ্বান্ত নেয় তাহলে..”

বিশ্বাসঘাতকদের ভরন পোষণ করবো কেন

“আমাদেরকে সেন্সিবলি এবং সেন্সিটিভলি আইন করতে হবে। আমি যা বলতে চাই তা হলো- এখানে একটি পরিষ্কার বিদ্রোহ ও বিশ্বাসঘাতকতার ঘটনা ঘটেছে। তাই জনগণের দাবি আমরা প্রত্যাখ্যান করতে পারি না। অবশ্যই তা পার্লামেন্টে সাংবিধানিক ভাবে আইন অনুযায়ী আলোচনা হবে, যদি সবাই একমত হয়ে তাহলে হবে।সন্ত্রাসীদের সাথে কোন সমঝোতা-বোঝাপড়া করা যাবে না। কিন্তু যারা কখনো সন্ত্রাসের সাথে যুক্ত হয়নি, যারা কেবল তাদের দেশ, জাতি, পতাকার জন্য দাঁড়িয়েছে- আমরা সবসময় তাদের কে কাছে টেনেছি।”

দমন পীড়ন করছি বললেই সত্য হয়ে যায়না

“আমি জানি না এরদোয়ানের দমন পীড়ন কি? তার আকার-ধরণ কি? শুধু বললেই এগুলো সত্য হয়ে যায়না। তায়েপ এরদোয়ান যদি দমন পীড়ন করতেন তাহলে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি ৫২ ভাগ ভোট পেতেন না। আগামী নির্বাচনে আমরা আবার পরিষ্কার দেখতে পাবো বাস্তবতা কি। তুরস্কের জনগণ এসব প্রচারণাতে বিশ্বাস করে না, কারণ তাদের কাছে অন্যান্য সোর্স আছে যা থেকে তারা বাস্তব সত্য কথা জানতে পারে।

যারা বাইরে থেকে এসব কথা ছড়ায় তা আমাকে দুঃখ দেয়, বাইরের লোকেরা ফেতুল্লাহ গুলেনের মত লোকের সাথে সাক্ষাৎকার নিয়ে তার কথা প্রচার করে। এখন আপনি মনে করুন যে, যখন টুইন টাওয়ার এ হামলা হল, বিন লাদেন জীবিত ছিল- তখন এসব মিডিয়া যদি বিন লাদেনের সাক্ষাৎকার নিয়ে তা প্রচার করতো তাহলে তার প্রতিক্রিয়া কি ভালো হতো? কিন্তু দেখুন ফেতুল্লাহ গুলেনের সাক্ষাতকার নিয়ে প্রচার করা হচ্ছে।

এর আগে এসব মিডিয়া কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদী এবং পাহাড়ে লুকিয়ে থাকা সন্ত্রাসীদের সাক্ষাতকার প্রচার করেছে। এমনকি সেসব সাক্ষাৎকার বই হিসেবে ছাপিয়ে প্রচার করছে। এধরণের কর্মকান্ডকে আমি কখনো প্রফেশনাল সাংবাদিকতা হিসেবে মনে করি না। কারণ কেউ যদি সন্ত্রাসী হয় তাহলে আপনার উচিত নয় তাদেরকে প্রমোট করা এবং যুব সমাজের কাছে ভালো মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করা। তাতে যুবসমাজকে কেবল বিভ্রান্ত করা হবে।”

কেবি