আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন। এ নির্বাচন সামনে রেখে রোববার মিশিগানে রিপাবলিকান প্রার্থীদের পক্ষে প্রচার চালান ট্রাম্প। সেখানে প্রায় দুই ঘণ্টার বক্তব্যের বড় অংশজুড়ে ছিল মিশিগানের সিনেট নির্বাচন। এ আসনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আল-সাইয়েদের প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান মাইক রজার্স।

১০০ সদস্যের মার্কিন সিনেটে বর্তমানে রিপাবলিকানদের ৫৩টি আসন রয়েছে। মিশিগানের বর্তমান ডেমোক্র্যাট সিনেটর গ্যারি পিটার্স অবসরে যাচ্ছেন। রজার্স এ আসনে জিতলে সেটি রিপাবলিকানদের দখলে যাবে। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে দলটির জন্য এ জয় গুরুত্বপূর্ণ।

মুসলিম পরিচয় নিয়ে আক্রমণ

ট্রাম্প সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বারবার আল-সাইয়েদের মুসলিম পরিচয়কে সামনে এনে আক্রমণ করেছেন। কখনো তার নাম বিকৃত করে ‘মোহাম্মদ’ বলেছেন।

রোববারের সমাবেশে ট্রাম্প অভিযোগ করেন, আল-সাইয়েদ যুক্তরাষ্ট্রে শরিয়াহ আইন চালু করতে চান।

তিনি বলেন, আল-সাইয়েদ এমন চেষ্টা করলে তাঁকেই প্রথম বিচারের মুখোমুখি করা উচিত।

ট্রাম্প আরো বলেন, ‘আমি এখানে এসেছি, যাতে একজন জিহাদি মুসলিম ব্রাদারহুডের সদস্য যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর হতে না পারেন।’

আল-সাইয়েদ যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া নাগরিক এবং সাবেক জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা। তিনি দেশটির সংবিধান রক্ষার অঙ্গীকার করেছেন। তিনি মুসলিম ব্রাদারহুড বা কোনো বিদেশি সংগঠনের সদস্য ছিলেন, এমন কোনো প্রমাণ নেই।

সমাবেশে আল-সাইয়েদের নাম উচ্চারিত হলে কয়েকবার উপস্থিত ব্যক্তিদের কেউ কেউ ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলে চিৎকার করেন। ট্রাম্প বলেন, আল-সাইয়েদ ও ডেমোক্র্যাটরা জিতলে যুক্তরাষ্ট্রে ‘জিহাদিদের ঢল’ নামবে। এতে সহিংসতা ও সন্ত্রাসের এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে যে মানুষ বড়দিনও উদ্‌যাপন করতে পারবে না।

ট্রাম্পের মুসলিমবিদ্বেষী বক্তব্যের ইতিহাস রয়েছে। ২০১৫ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারের সময় তিনি মুসলমানদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ পুরোপুরি বন্ধ করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। পরে প্রেসিডেন্ট হিসেবে কয়েকটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলেন। ওই পদক্ষেপ ‘মুসলিম নিষেধাজ্ঞা’ নামে পরিচিতি পায়।

আল-সাইয়েদ তার বিরুদ্ধে মুসলিমবিদ্বেষী বক্তব্যকে মনোযোগ অন্যদিকে সরানোর চেষ্টা বলে অভিহিত করেছেন। তিনি জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বাড়ানোর মতো অভ্যন্তরীণ বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন।

ট্রাম্পের পাশে রজার্স

ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমতে থাকায় প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে লড়ছেন এমন কিছু রিপাবলিকান প্রার্থী তার কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখছেন। মাইক রজার্সও এর আগে ইরান যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছিলেন। কানাডার সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধের বিরোধিতা করে শুল্কনীতি নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছিলেন তিনি।

তবে রোববারের সমাবেশে রজার্স ট্রাম্পের সঙ্গে একই মঞ্চে ওঠেন। তিনিও আল-সাইয়েদের বিরুদ্ধে মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তোলেন। মিসরের এ রাজনৈতিক সংগঠনকে চলতি বছর সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

কংগ্রেস সদস্য থাকাকালে ২০১২ সালে রজার্স অবশ্য মিসরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ও মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতা মোহাম্মদ মুরসির সরকারের অধীনে দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা অব্যাহত রাখার পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন।

রজার্স আল-সাইয়েদকে ‘ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকা’ নামের বামপন্থি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত বলেও তুলে ধরেন। তবে আল-সাইয়েদ ওই সংগঠনের সদস্য নন। রজার্সের অভিযোগ, আল-সাইয়েদ এমন কিছু প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অর্থ নিচ্ছেন, যেগুলো মুসলিম ব্রাদারহুড, হামাস ও হিজবুল্লাহকে সমর্থন করে। যুক্তরাষ্ট্রে এই তিন সংগঠনকেই সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান মার্কেটিং রিসোর্স গ্রুপের চলতি মাসের শুরুর এক জরিপে দেখা গেছে, মিশিগানের মাত্র ৩৫ শতাংশ ভোটার ট্রাম্পকে ইতিবাচকভাবে দেখেন।

ইরান যুদ্ধ নিয়ে অনুতপ্ত নন ট্রাম্প

সমাবেশে ইরান যুদ্ধ নিয়েও কথা বলেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, যুদ্ধ শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়ে তার কোনো অনুশোচনা নেই।

তার দাবি, ইরানের হাতে যাতে পারমাণবিক অস্ত্র না আসে, তা নিশ্চিত করতেই যুক্তরাষ্ট্রকে পদক্ষেপ নিতে হয়েছে। তবে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। তেহরানের বক্তব্য, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি বেসামরিক জ্বালানি উৎপাদনের জন্য।

যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। রোববার মিশিগানে প্রতি গ্যালন পেট্রলের গড় দাম ছিল ৪ দশমিক ৮৩ ডলার। যুদ্ধ শুরুর আগে এ দাম ছিল ২ দশমিক ৯১ ডলার।

তবে ট্রাম্প যুদ্ধের কারণে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোর বিপুল মুনাফা হচ্ছে বলে গর্ব করেন। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কারণে বিভিন্ন দেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে তেল কিনছে। এতে দেশটির শত শত বিলিয়ন ডলার আয় হচ্ছে। পেট্রলের জন্য সাধারণ মানুষকে বেশি অর্থ দিতে হলেও এ মুনাফার কথা বলতে তিনি দ্বিধা করবেন না বলেও মন্তব্য করেন ট্রাম্প।

সমাবেশে সমর্থকদের উচ্ছ্বাস

জনপ্রিয়তা কমে যাওয়া, মূল্যস্ফীতি ও ইরান যুদ্ধ নিয়ে অসন্তোষের মধ্যেও রোববারের সমাবেশে ট্রাম্পের সমর্থকদের ব্যাপক উপস্থিতি দেখা যায়। সমাবেশস্থলের বাইরে কয়েক ব্লকজুড়ে সমর্থকদের সারি ছিল। ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ লেখা পোশাক পরে অনেকে সেখানে জড়ো হন। বক্তব্যের সময় তারা ট্রাম্পের কথায় উল্লাস করেন এবং তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের কটূক্তি করেন।

বক্তব্যের একপর্যায়ে ট্রাম্প ওহাইওর রিপাবলিকান সিনেটর জন হাস্টেডের নিতম্ব নিয়ে অশালীন মন্তব্য করেন। হাস্টেডও আরেকটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সিনেট নির্বাচনে লড়ছেন। সমাবেশে উপস্থিত ট্রাম্পের সমর্থক র‍্যাপার নিকি মিনাজের নিতম্ব নিয়েও মন্তব্য করেন তিনি। এসব মন্তব্যে উপস্থিত জনতা উল্লাস করে। আলজাজিরা

এমএম