পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাজ্যেই সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশির বসবাস। এখানকার বাংলাদেশিদের নিজস্ব শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চার ব্যাপকতা এতটাই যে লন্ডনকে বলা হয় ‘তৃতীয় বাংলা’। অথচ এই তৃতীয় বাংলায় বাংলাদেশি ফ্যাশন তুলে ধরার কোনো আয়োজন এত দিন হয়নি। অবশেষে গত শনিবার প্রথমবারের মতো ‘বাংলাদেশ ফ্যাশন উইক’ আয়োজনের মধ্য দিয়ে কাটল সেই বন্ধ্যাত্ব। এক দিনে হলেও এ ধরনের অয়োজনকে ‘উইক’ হিসেবেই অভিহিত করা হয়।
পূর্ব লন্ডনের অভিজাত এলাকা ক্যানারি ওয়ার্ফের ‘ইস্ট উইন্টার গার্ডেন’ মিলনায়তনে বসে বাংলাদেশি ফ্যাশনের নান্দনিক এই আয়োজন। আয়োজক সদ্যগঠিত ‘বাংলাদেশ ফ্যাশন কাউন্সিল ইউকে’। এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক ফ্যাশনের তীর্থস্থান লন্ডনের ফ্যাশন দিনপঞ্জিতে যুক্ত হলো বাঙালির শৌখিন পরিচ্ছদের প্রদর্শনী।
সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা বাজতেই পুরো মিলনায়তনের আলো কমে গেল। উজ্জ্বল হয়ে উঠল টি-আকৃতির মঞ্চের বাতি। উপস্থাপক মমতাজ বেগম ও আবদুর রহমান সংক্ষেপে তুলে ধরলেন আয়োজনের বিস্তারিত। এরপরই মঞ্চের পেছন থেকে বেজে উঠল ‘জন্ম আমার ধন্য হলো মা গো’। এর সঙ্গে মঞ্চে হাজির হলেন র্যা ম্প মডেলরা। হেড লাইন ডিজাইনার হিসেবে শুরুতেই ছিল বাংলাদেশের খ্যাতিমান পোশাক নকশাকার বিবি রাসেলের নান্দনিক কাজের প্রদর্শনী। একে একে ২১ জন নারী মডেলের গায়ে শোভা পেল মেয়েদের সালোয়ার-কামিজসহ নানা ঢঙের পোশাকের বাহারি সব কারুকাজ।
প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ ফ্যাশন উইকে’ মোট নয়জন নকশাকারের পরিচ্ছদ প্রদর্শিত হয়। বাংলাদেশ থেকে বিবি রাসেল ছাড়াও এসেছিলেন ডিজাইনার রিনা লতিফ ও পোশাকের প্রতিষ্ঠান প্রীতি বুটিক। ছিল যুক্তরাজ্যে বেড়ে ওঠা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তরুণ ডিজাইনার নাদিয়া-আয়শা, আফসানা ফেরদৌসী, রোকিয়া উল্লাহসহ লন্ডনের ইসলামিক ডিজাইন হাউস, বিবি লন্ডন ও জারকা অব লন্ডনের পোশাক প্রদর্শনী।
এই ফ্যাশন শো আয়োজনের মূল লক্ষ্য আন্তর্জাতিক ফ্যাশনের সামঞ্জস্যপূর্ণ বাংলাদেশি পোশাক ও বাংলাদেশি ঐতিহ্যে প্রভাবিত ডিজাইনারদের কাজ তুলে ধরা। হয়েছেও তাই। স্বাভাবিকের চেয়ে একটু ঢিলেঢালা সালোয়ার আর চাপানো কামিজের সঙ্গে গলায় ওড়নার গিঁট কিংবা মাথায় পাগড়ির মতো করে গামছা বেঁধে চোখে চশমা লাগিয়ে নিলেই ফুটে উঠছে পাশ্চাত্য আভিজাত্য। আবার শাড়ি কিংবা লেহেঙ্গার মতো পরিচ্ছদেও নকশায় সামান্য ভিন্নতা আর পরিধানের বৈচিত্র্য এনে দিচ্ছে পশ্চিমা নান্দনিকতা। অথবা মেয়েদের বোরকার কথাই ধরুন। গতানুগতিক ধারণার বাইরে গিয়ে ভিন্ন কাপড়ে বানানো বোরকায় হুডি যোগ করা হয়েছে। লাগানো হয়েছে পকেট। কাঁধে ব্যাগ আর কানে হেডফোন লাগিয়ে এসব বোরকা পরা মডেলের চোখেমুখে তারুণ্য আর আধুনিকতার কোনো কমতি নেই।
ব্রিটিশ বাংলাদেশ ফ্যাশন কাউন্সিলের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী ফখরুল হক বললেন, তিনি লন্ডনে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কাসহ বিভিন্ন দেশের ‘ফ্যাশন উইক’ হতে দেখেছেন। অথচ তৈরি পোশাকের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিকারক বাংলাদেশের সে রকম কোনো আয়োজন নেই। সেই অভাব পূর্ণ করতেই এবং বাংলাদেশি ঐতিহ্যে প্রভাবিত ফ্যাশন ডিজাইনারদের পৃষ্ঠপোষকতা দিতেই ‘ব্রিটিশ বাংলাদেশ ফ্যাশন কাউন্সিল’ গড়ার উদ্যোগ নেন তিনি। এটি একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। এই শোর প্রতি আগ্রহ আর টিকিটের অভাবনীয় চাহিদার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে এই আয়োজন করতে হবে।
প্রখ্যাত ডিজাইনার বিবি রাসেল বলেন, তিনি সব সময় চেয়েছেন লন্ডনে এমন একটি আয়োজন হোক। যে কারণে খবর পাওয়ামাত্রই তিনি উপস্থিত থাকবেন বলে কথা দেন। বলেন, ‘এটা প্রথম আয়োজন। এর ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হবে। সে কারণে তরুণদের উৎসাহিত করতে আমার ছুটে আসা।’
বাংলাদেশি পোশাকের বৈচিত্র্যময় রূপ দেখে যুক্তরাজ্যে বেড়ে ওঠা তরুণীরাও বেশ অভিভূত। কথা হলো আমল, রোকিয়া, রুকসানাসহ কয়েকজনের সঙ্গে। তাঁরা বললেন, বেশ কিছু পোশাক তাঁদের মনে ধরেছে। ওই সব পোশাক কিনতে আগ্রহী তাঁরা।
এমবিএইচ





