বছর ঘুরে আবারও এল পবিত্র মাহে রমজান। কিছুদিন পরই আসবে মুসলমানদের সবচেয়ে বড় আনন্দের দিন ঈদুল ফিতর। দিনটি নিয়ে আমাদের উত্‍সাহের শেষ নেই। নিজেকে এই দিনে আকর্ষণীয় করতে সবার প্রচেষ্টা থাকে। নিজেকে আরো সুন্দর আর ফ্যাশনেবেল করতে এই দিনের জন্য আমরা কত কি যে কিনি তার ইয়ত্তা নেই।

সবচেয়ে আগে যে জিনিসটা প্রাধান্য পায় তা হলো জামাকাপড়। ফ্যাশন এমন একটি জিনিস যা সময়ের সাথে বদলায়। এই ঈদ উপলক্ষে বিভিন্ন শপিং কমপ্লেক্সে ইতোমধ্যেই অনেক ভিড় লেগে গেছে। সবাই ঘুরে ঘুরে তার পছন্দের কাপড়টি, জুতা বা অন্যান্য একসেসরিস কিনতে ব্যস্ত। চলুন আজ জেনে নেই ঈদ উপলক্ষে কি ফ্যাশন চলছে। তবে নির্দিষ্ট কোনো ফ্যাশন আবদ্ধ থাকেনা ঈদে। যার যার রুচি ও পছন্দ অনুযায়ী ড্রেসটি সবাই কিনে থাকেন। ঈদের ফ্যাশন নিয়ে সবচেয়ে বেশি কাজ করে থাকে দেশী বুটিক হাউসগুলো।

এছাড়া ঢাকায় বসুন্ধরা সিটি, রাইফেলস স্কয়ার, নিউমার্কেট, চাঁদনীচক, গাউছিয়া, রাপা প্লাজা, নর্থ টাওয়ার, বনানী বাজার, বেইলী রোড, মৌচাক মার্কেট, মাস্কট প্লাজা, গুলশান আরা মার্কেট, ইসলামপুর এসব জায়গায়ও ভালো কাপড় পাওয়া যায় ঈদ উপলক্ষে। এছাড়া নিম্নমধ্যবিত্তদের জন্য আছে বঙ্গ বাজার। ধানমন্ডি হকার্স-এর মতো মার্কেটগুলো।

থ্রি পিস

আমাদের দেশে মেয়েদের পোশাক বলতে মূলত থ্রি পিসকেই বোঝায়। অল্প বয়সী মেয়েরা ছাড়াও এখন একটু বয়স্ক মহিলারাও এটা পরে থাকেন। তাই বিভিন্ন বুটিক হাউসগুলো তাদের শো রুমে নতুন নতুন ফ্যাশন ও রঙের থ্রি পিস নিয়ে এসেছে। যেমন - নগরদোলা, নবরুপা, আড়ং, ক্রে ক্রাফট, শৈল্পিক , সাদাকালো, দেশাল, চৈতি, রাংতা ও দেশী দশের বুটিক হাউসগুলো। যদি একটু আলাদা কাপড় পরতে চান তাহলে এসব ফ্যাশন হাউজে আসতে পারেন। বর্তমানে ঈদ ঈপলক্ষে বাজারে অন্যবারের মত আনারকলি ড্রেসটি চলছে। এছাড়া আরামদায়ক এবং বিশেষ করে এর রঙ্গ, ডিজাইনের জন্য লনের থ্রি পিস খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। সুতির পাশাপাশি জর্জেট কাপড় চলছে। থ্রি পিসের জামার কাট লং ঝুল কামিজের সাথে এবার শর্ট কামিজও চলছে। ফিটেড বা ঢিলেঢালা ২ টিই চলছে। রঙ্গের ক্ষেত্রে নীল, লাল, কালো, সবুজ, বেগুনি, সাদা ছাড়াও অন্যান্য অনেক রঙ প্রাধান্য পেয়েছে। পায়জামার জন্য চুরিদার, সোজা কাট সালোয়ার ও লেগিংস এখন মেয়েদের বেশি পছন্দের তালিকায় আছে। থ্রি কোয়াটার, ফুল হাতা বেশি চলছে এখন। অনেকে চাইলে পছন্দমত কাপড় কিনে কামিজ বানাতে পারেন নিজস্ব ডিজাইনে। এতে এমব্রয়ডারি বা হাতের কাজ করে নিতে পারেন। তবে সেক্ষেত্রে এখনই তা করে নিতে হবে। কেননা এর জন্য বেশ সময় লাগবে।

শাড়ী

শাড়ীতে বাংলার নারীদের সবচেয়ে বেশি মানায়। ঈদ উপলক্ষে অনেকেই একটু দামী শাড়ী কিনে থাকেন। শাড়ীর মধ্যে তাঁতের শাড়ী, সুতির শাড়ীতে ব্লক বা কাজ, কোটা, শিফন চলছে বর্তমানে। এছাড়া কাতান, জুট কাতান, সিল্ক, হাফসিল্ক শাড়ীও পছন্দ করছেন ক্রেতারা। টাঙ্গাইল সিল্ক, রাজশাহী সিল্ক ,জামদানী বরাবরের মত এবারেও চলছে। তবে সুতির শাড়ীর উপর এমব্রয়ডারি বা পাড় লেস বা চুমকি, পুঁতি, হাতের কাজ করা চলছে বেশ গরমের জন্য। শাড়ী কিনতে দেশী বুটিক হাউসগুলোই বেশি পছন্দের সবার। তারপরও যদি চান অন্যান্য মার্কেট ঘুরেও আসতে পারেন বা নিজেই গজ কাপড় যেমন জর্জেট এর কাপড় কিনে লেইস লাগিয়ে পছন্দ অনুযায়ী শাড়ী বানাতে পারেন ঈদ উপলক্ষে। ব্লাউজের কাটে এসেছে বৈচিত্র্য।

ফতুয়া ও টপস

বর্তমানে ফতুয়া ও টপস তরুণ মেয়েদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়। এটি ফেশনেবল ও আরামদায়ক। একথা মাথায় রেখে দেশী বুটিক হাউসগুলো বেশ কিছু ডিজাইনের ফতুয়া রেখেছে তাদের শোরুমে। এছাড়া বিভিন্ন মার্কেট যেমন –আজিজসুপার মার্কেটেও পছন্দ অনুযায়ী ও ফ্যাশনাবেল ফতুয়া ও টপসটি বেঁছে নিন। সাথে জিনসের প্যান্টটিও কিনতে ভুলবেন না। জিনস আর টপস কেনার জন্য ইয়োলো, একসট্যাসি, বা অন্যান্য নামকরা ব্র্যান্ডের দোকানে ঢু মারতে পারেন।

জুতা

জুতা ছাড়া কি কেনাকাটা কমপ্লিট হয়? হয়না। তাই ড্রেস কেনার সাথে সাথে জুতাটিও কিনে নিন। হাইহিল, ওয়েজহিল, স্টিলেট হিল, ফ্ল্যাট, সেমি হিল যেটি আপনার পছন্দ হয়। এজন্য যেতে পারেন এলিফ্যান্ট রোডের বিশাল জুতার মার্কেটে , এপেক্সে, বাটা অথবা বে'র মত সুন্দর সুন্দর ব্র্যান্ডের দোকানে।

ব্যাগ

ব্যাগটি মিলিয়ে কিনুন ড্রেস আর জুতার সাথে। এজন্য যেতে পারেন বসুন্ধরা সিটি, গাউছিয়া, চাঁদনীচকে, আলমাস সুপার শপে ও বাটার বসুন্ধরা ব্রাঞ্চে।

গহনা

রুপার ছোট গহনাগুলো আড়ং থেকে কিনতে পারেন। এছাড়া স্টোন, ইমিটেশনের চুড়ি, কানের দুল, নাকফুল, ব্রেসলেট, আংটি, পায়েল কিনে নিতে পারেন আড়ং, পিরান, যাত্রা, জেনেটিক প্লাজা ও বুটিক হাউসগুলো থেকে বা গাউছিয়া থেকেও কিনতে পারেন।

পাঞ্জাবি

মেয়েদের ঈদের কেনাকাটা ইতোমধ্যেই শেষ। মার্কেটে ভিড় বাড়ছে ছেলেদের। কারণ একটাই, ঈদে ছেলে-বুড়ো সবার চাই নতুন পাঞ্জাবি। পাঞ্জাবি ছাড়া ছেলেদের ঈদ ভাবাই যায় না।

ঈদ মানেই আনন্দ, ঈদ মানেই খুশি। ঈদের এই আনন্দকে আরো বেশি জাঁকজমক করে তুলতে ছেলেদের ঈদ বাজেটের একটা বড় অংশ বরাদ্দ থাকে পাঞ্জাবির জন্য। ঘরে-বাইরের এবারের আয়োজন ছেলেদের এই অন্যতম পোশাক নান্দনিক পাঞ্জাবি নিয়েই।

আমাদের বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম ধারক হল পাঞ্জাবি। ঈদে তো অবশ্যই যেকোনো উৎসব বা পার্বণে পাঞ্জাবির বিকল্প নেই। তাইতো বাঙালির এ আদুরে পোশাকটিকে ঘিরে আগ্রহ আড়ম্বরতা সবসময়ই বেশি। ঈদকে সামনে রেখে আমাদের দেশীয় ফ্যাশন হাউসগুলো বরাবরের মতো সাজিয়েছে পাঞ্জাবির পসরা। পাঞ্জাবি যেন হয়ে উঠেছে ডিজাইনারের সাদা ক্যানভাস। ফ্যাশন হাউসগুলোর পাঞ্জাবির সংগ্রহে থাকছে নতুন নকশা, নতুন রং। কাটিংয়েও এসেছে পরিবর্তন, বাজার দখল করে আছে শর্ট আর সেমি লং পাঞ্জাবি। যেসব পাঞ্জাবির চাহিদা রয়েছে সেগুলো হল; অ্যান্ডি, অ্যান্ডি কটন, অ্যান্ডি সিল্ক, জামদানি, কাতানের কাজ, ডুপিয়ান কাপড়ের পাঞ্জাবিতে ব্লক, স্প্রে, টাই-ডাই, স্কিন প্রিন্ট। এছাড়াও অ্যাপলিক, এম্ব্রয়ডারি, কারচুপি, হাতের ভরাট কাজ ও বিভিন্ন লেস ব্যবহার করে পাঞ্জাবিতে দেয়া হয়েছে উৎসবের ছোঁয়া।

এদিকে দেশীয় ফ্যাশন হাউস যাত্রা পুরনো ফেলে দেয়া কাপড়কে নতুন করে তাঁতীদের দিয়ে রিসাইকেল উপাদান যোগ করে নতুন মোটিফের পাঞ্জাবি এনেছে। ঈদের পাঞ্জাবিতে থাকছে উৎসবের সব রঙ। প্যাঁচ-ওয়ার্কস, হালকা এবং ঘন হাতের কাজ, ব্লক, স্কিন প্রিন্ট এবং বিভিন্ন রঙের টাইডাই সবই রিসাইকেল কাপড়গুলোতে জৌলুস আনতে সহায়ক হয়েছে। কাপড়ের রঙ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে মৃত্তিকা, বায়ু, অগ্নি ও জলের বিভিন্ন শেড।

বাঙালির ফ্যাশনে পাঞ্জাবির অবস্থান বেশ দৃঢ়। তাই পাঞ্জাবিকে নিয়ে ডিজাইনরাদের ঘষামাজা সবসময়ই চলে। ঈদের পাঞ্জাবিতে প্রতি বছরই আসে নতুনত্ব। পাঞ্জাবির ফ্যাশনপাড়া ঘুরে দেখা যায়, পাঞ্জাবিতে থাকছে নানারকম কাট ও নকশার ব্যবহার। গলায় ও হাতায় থাকছে ভিন্নধর্মী কাজ। অ্যান্ডি, খাদি, সুতি, সিল্ক ও কাতান কাপড়ে হাতের কাজ, নকশি কাঁথার কাজ, এম্ব্রয়ডারির কাজ সেই সঙ্গে রয়েছে প্রিন্টের কাজ। পাঞ্জাবিতে ভিন্নতা আনতে ব্যবহার করা হয়েছে তৈজষপত্রের ডিজাইন। কাটিংয়েও ভিন্নতা তো থাকছেই। পাঞ্জাবির ডিজাইন ও রং নিয়ে ডিজাইনারদের কথা আপনারা জেনেছেন। বিভিন্ন ফ্যাশন হাউসে কাপড় ও কাজের মানের ওপর ভিত্তি করে পাঞ্জাবিগুলোর দাম পড়বে ৬৫০ থেকে ৬০০০ টাকা।

পাঞ্জাবিতে ভিন্ন মাত্রা যোগ করছে দেশীয় ফ্যাশন হাউসগুলো। এ ব্যাপারে সন্দেহ নেই। তবে ফ্যাশন হাউসগুলোর পাশাপাশি নগরীতে বেশ কিছু মার্কেট রয়েছে, সেগুলোতে বিভিন্ন রকম নিত্যনতুন ডিজাইনের পাঞ্জাবি পাওয়া যায়। নগরীর রেডিমেড পাঞ্জাবির মার্কেটগুলো গড়ে উঠেছে শাহবাগ, সায়েন্সে ল্যাবরেটরি, মালিবাগ, নিউমার্কেট, আয়েশা শপিং কমপ্লেক্সসংলগ্ন গুলিস্থান পীর ইয়ামেনী শপিং কমপ্লেক্সসহ নগরীর বিভিন্ন স্থানে।

সুতি, সিল্ক, অ্যান্ডি কটন, টাইডাই, বাটিক ও এম্ব্রয়ডারির পাঞ্জাবির পাশাপাশি পাকিস্তানি, মিসর ও কাশ্মেরী পাঞ্জাবি পাওয়া যাচ্ছে। বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এবার শর্ট পাঞ্জাবি ও সেমি লং পাঞ্জাবিগুলো বেশি চলছে। চমৎকার বাহারি ডিজাইনের এসব পাঞ্জাবির দাম পড়বে ৫০০ থেকে ৪৫০ টাকা। পাঞ্জাবির সবকিছুই তো জানলেন, যারা এখনও ঈদের পাঞ্জাবি কেনেননি তারা আর দেরি না করে আজই কিনে ফেলুন চলতি হাওয়ার পাঞ্জাবি।

ঢাকা, ২৫ জুলাই, টাইমনিউজবিডি.কম, কেএইচ