সফর শেষে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন জানিয়েছেন, সফরে ১১টি দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকসহ মোট ৩০টি কর্মসূচিতে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। এসব আলোচনায় বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, জনশক্তি রপ্তানি, জ্বালানি নিরাপত্তা, রোহিঙ্গা সংকট, স্বাস্থ্য, জলবায়ু ও আন্তর্জাতিক শান্তির বিষয় গুরুত্ব পায়।

জাতিসংঘে প্রথম ভাষণ

২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে প্রথমবারের মতো ভাষণ দেন তারেক রহমান। সেখানে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পরিবর্তন, অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার, সামাজিক সুরক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন, রোহিঙ্গা সংকট, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন তিনি।

রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলাদা উচ্চপর্যায়ের বৈঠকেও অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন, মানবিক সহায়তা, জবাবদিহি ও সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরা হয়।

জলবায়ু পরিবর্তন নিয়েও একাধিক কর্মসূচিতে বক্তব্য দেন তিনি। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর জন্য অর্থায়ন ও প্রযুক্তি সহায়তার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

১১ দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক

সফরে বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান ও মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক করেন তারেক রহমান। এসব আলোচনায় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানো, দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি, জ্বালানি নিরাপত্তা, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও আঞ্চলিক সহযোগিতার বিষয় উঠে আসে।

এ ছাড়া জাতিসংঘ মহাসচিব, বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট, জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার হাইকমিশনার এবং মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গেও বৈঠক করেন তিনি।

স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতের সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। গেটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহীর সঙ্গে বৈঠকে জনস্বাস্থ্য, শিশুস্বাস্থ্য, টিকাদান, সাশ্রয়ী টিকা এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থা আধুনিকায়নের বিষয় উঠে আসে।

১১ বোয়িং বিমান কেনার চুক্তি

সফরের অন্যতম আলোচিত ঘটনা ছিল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সঙ্গে বোয়িংয়ের ১১টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ অধিবেশনের সাইডলাইনে এ চুক্তি সই হয়।

চুক্তির আওতায় পাঁচটি বোয়িং ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার এবং ছয়টি ৭৩৭-৮ উড়োজাহাজ রয়েছে। বিমান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক রুট সম্প্রসারণ ও বহর আধুনিকায়নের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই চুক্তি করা হয়েছে।

চুক্তি স্বাক্ষরের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী নিজে উপস্থিত ছিলেন না। তবে পরে বোয়িংয়ের একটি প্রতিনিধিদল তার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারমাণবিক সহযোগিতা

সফরের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক সহযোগিতা নিয়ে একটি সমঝোতা স্মারক সইয়ের খবরও আসে। এর মাধ্যমে বেসামরিক ও শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারে দুই দেশের সহযোগিতার ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ চলমান থাকা অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এ ধরনের সহযোগিতা নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

শেখ হাসিনা প্রসঙ্গ

তারেক রহমানের সফর চলাকালে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক ব্রিফিংয়ে শেখ হাসিনার বিষয়টিও উঠে আসে। সেখানে এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখনো কোনো নির্দিষ্ট আনুষ্ঠানিক অবস্থান নেয়নি এবং বাংলাদেশ ও ভারত নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে বিষয়টির সমাধান করবে বলে তারা আশা করছে।

তবে ওই ব্রিফিংটি ‘অন ব্যাকগ্রাউন্ড’ হওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।

সফর নিয়ে বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন

সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবিরের মতে, জাতিসংঘের মূল অধিবেশন ও বিভিন্ন সাইডলাইন কর্মসূচিতে তারেক রহমান বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয় তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো তার বক্তব্যে গুরুত্ব পেয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

আরেক সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ মনে করেন, সরকার গঠনের পর প্রথম বড় আন্তর্জাতিক সফর হিসেবে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে এ সফর গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

সফর শেষে ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে নিউইয়র্ক থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

এস