তিনি বলেন, হাতি সংরক্ষণ শুধু একটি প্রাণীর সংখ্যা রক্ষার বিষয় নয়। এর সঙ্গে হাতির আবাসস্থল ও চলাচলের করিডোর, পরিবেশের ভারসাম্য এবং হাতির সঙ্গে বসবাসকারী মানুষের নিরাপত্তা ও জীবিকার বিষয়ও জড়িত।

শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ের পর্যটন ভবনের শৈলপ্রপাত মিলনায়তনে ‘হাতি সংরক্ষণ : বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা), আইইউসিএন বাংলাদেশ, ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্স, অরণ্যক এবং দীপ ইকোলজি অ্যান্ড স্নেক কনজারভেশন ফাউন্ডেশন যৌথভাবে এ সভার আয়োজন করে।

পরিবেশমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের বন্য হাতি দেশের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য ও প্রতিবেশ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে বর্তমানে তাদের অস্তিত্ব গুরুতর সংকটের মুখে। শেরপুর, জামালপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, সিলেট, চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলে বন্য হাতির চলাচল বেশি।

তিনি জানান, ২০১৬ সালে দেশে আনুমানিক ২৬৮টি হাতি ছিল। বন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১৪৬টি হাতির মৃত্যু হয়েছে।

আবাসস্থল ও চলাচলের করিডোর সংকুচিত হওয়া, বন উজাড়, খাদ্যের সংকট, সড়ক ও রেলপথ নির্মাণ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বৈদ্যুতিক ফাঁদের মতো বিভিন্ন কারণে মানব–হাতি সংঘাত বাড়ছে বলে জানান মন্ত্রী।

তিনি বলেন, হাতি লোকালয় বা কৃষিজমিতে ঢুকে পড়লে মানুষ ও হাতি উভয়ই ঝুঁকির মুখে পড়ে। তাই সংঘাতের পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি হাতির আবাসস্থল ও চলাচলের করিডোর রক্ষা, সংঘাতপ্রবণ এলাকা চিহ্নিতকরণ, আগাম সতর্কতা এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা হবে। সংরক্ষণ কার্যক্রমে স্থানীয় জনগণকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবেও বিবেচনা করা হবে।

মন্ত্রী বলেন, এশীয় হাতির চলাচলের জন্য বিস্তৃত এলাকা প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশ অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। ফলে হাতি সংরক্ষণ একটি জটিল কাজ, যা কোনো একক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব নয়। এজন্য বন অধিদপ্তর, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন, অবকাঠামো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, সংরক্ষণ সংস্থা, গবেষক ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন।

পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকায় হাতি শিকার ও পাচার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, এসব এলাকায় নজরদারি জোরদারে বন অধিদপ্তর ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মধ্যে সমন্বয় আরও বাড়াতে হবে। সীমান্ত সড়কসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনার সময়ই হাতির ঐতিহ্যগত চলাচলের পথ বিবেচনায় নিতে হবে। একই সঙ্গে হাতিসহ অন্যান্য বৃহৎ বন্যপ্রাণীর নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থাও রাখতে হবে।

বন্দী হাতির কল্যাণের বিষয়ে পরিবেশমন্ত্রী বলেন, বন্দী হাতির লাইসেন্স, সংখ্যা ও অবস্থার যথাযথ রেকর্ড সংরক্ষণ এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। প্রশিক্ষণের নামে হাতিকে শিকলে রাখা, প্রহার ও নির্যাতনের অভিযোগ এবং সার্কাসসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহারের বিষয়গুলো যথাযথ আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় গুরুত্বের সঙ্গে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

মানুষের তত্ত্বাবধানে থাকা হাতির জন্য উপযুক্ত চিকিৎসা ও দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

মন্ত্রী বলেন, ভবিষ্যতে হাতির আবাসস্থল ও চলাচলের করিডোর সুরক্ষা, স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে মানব-হাতি সংঘাত কমানো, বন্দী হাতির সংখ্যা, অবস্থান, লাইসেন্স ও কল্যাণ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান, সংরক্ষণ সংস্থা, গবেষক, আইন বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ জোরদার করা হবে।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সাবেক উপদেষ্টা ও বেলার প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন- শেরপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ ফাহিম চৌধুরী, পক্ষীবিদ ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ মুহাম্মদ আলী রেজা খান এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) শামিমা বেগম।

সভায় আয়োজক সংস্থাগুলোর প্রতিনিধি, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় ও বন অধিদপ্তরের কর্মকর্তা, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ, গবেষক, পরিবেশবিদ, সংরক্ষণকর্মী, আইন বিশেষজ্ঞ এবং হাতি ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে সম্পৃক্ত বিভিন্ন অংশীজন উপস্থিত ছিলেন।

এমএম