বিনিয়োগ ও বাণিজ্য প্রক্রিয়া সহজ করতে বিভিন্ন দফতরের মধ্যে সমন্বয় জোরদার এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি বাড়ানোর ফলে বাস্তব অগ্রগতি হয়েছে বলে জানিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। এসব উদ্যোগ দেশের অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানিয়েছে, এ অগ্রগতির বিষয়গুলো তুলে ধরা হয় বিনিয়োগ সমন্বয় কমিটির সপ্তম বৈঠকে। বৃহস্পতিবার তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বিনিয়োগ বাস্তবায়নের প্রতিবন্ধকতা কমানো, সেবা ডিজিটাল করা এবং সিদ্ধান্ত দ্রুত কার্যকর করার নানা সংস্কার উদ্যোগ পর্যালোচনা করা হয়।
বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ দূত ও কমিটির চেয়ারম্যান লুৎফে সিদ্দিকী। তিনি বলেন, প্রক্রিয়াগত উন্নয়ন দেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে এবং এর সরাসরি প্রভাব পড়ে মানুষের জীবিকা ও কর্মসংস্থানে। শুল্কহার বা বৈদেশিক বাজারে প্রবেশাধিকার মতো বিষয়গুলো আমাদের নিয়ন্ত্রণে না থাকলেও নীতিমালা ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া আমাদের হাতেই রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে দক্ষতা বাড়ালে দ্রুত ও দৃশ্যমান সুফল পাওয়া সম্ভব।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বিডা, বেজা ও পিপিপি কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামানসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সচিব ও প্রধানরা।
বৈঠকে আলোচিত গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবগুলোর মধ্যে ছিল– আগাম কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সের সক্ষমতা দশ গুণ বাড়ানো, অনলাইনে সমন্বিত ব্যবসা শুরুর প্যাকেজ চালু, চট্টগ্রাম বন্দরে ২৪ ঘণ্টার ডিজিটাল পেমেন্ট সুবিধা এবং সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় বন্ড ব্যবস্থাপনা চালু করা।
এছাড়া অনুমোদিত বিনিয়োগ প্রস্তাব যেন বাস্তব বিনিয়োগে রূপ নেয়, সে জন্য একাধিক সংস্থার সমন্বয়ে একটি কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়ে একমত হন কর্মকর্তারা।
বৈঠকে সাম্প্রতিক কয়েকটি সফল সমন্বয় উদ্যোগের কথাও তুলে ধরা হয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অধীনে চালু হওয়া ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো (এনএসডব্লিউ) কয়েক মাসের মধ্যেই সরকারি দফতরে প্রায় ১২ লাখ সরাসরি যাতায়াতের প্রয়োজন কমিয়েছে বলে জানানো হয়। দীর্ঘদিনের আন্তঃমন্ত্রণালয় জটিলতা কাটিয়ে এ সিস্টেমটি চালু করা সম্ভব হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরে চালু হওয়া স্বয়ংক্রিয় ট্রাক প্রবেশ ব্যবস্থায় প্রবেশের সময় অন্তত ৯০ শতাংশ কমেছে। একইসাথে ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও নগদবিহীন লেনদেন স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বাড়িয়েছে।
বর্তমানে বিডা, বেজা, বেপজা ও হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে বিনিয়োগের পাইপলাইন নজরদারি করছে। কর্মকর্তারা জানান, জমি ইজারার চুক্তির সংখ্যাও রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। চীন, তুরস্ক ও দক্ষিণ কোরিয়ায় সাম্প্রতিক বিনিয়োগ প্রচার কার্যক্রমের ফলেও বেশ কয়েকটি বিনিয়োগ বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা মিলেছে।
তবে বৈঠকে কিছু স্থায়ী সমস্যার কথাও উঠে আসে। ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু থাকা সত্ত্বেও কিছু দফতরে এখনো সমান্তরালভাবে অফলাইন প্রক্রিয়া চালু রয়েছে।
লুৎফে সিদ্দিকী জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোকে (বিএমইটি) একটি ভালো উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, সেখানে কেবল ডিজিটাল আবেদন ও পেমেন্ট ব্যবস্থা চালু রয়েছে এবং ব্যবহারকারীদের সহায়তায় অন-সাইট হেল্পডেস্ক রাখা হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষও অনলাইন ব্যবস্থায় অভ্যস্ত হতে ব্যবহারকারীদের সহায়তায় একই ধরনের ‘অ্যাজেন্ট ডেস্ক’ চালু করেছে বলে জানান বন্দর চেয়ারম্যান।
বৈঠকে জানানো হয়, শিগগিরই বিডার উদ্যোগে বাংলাদেশ বিজনেস পোর্টালের প্রথম সংস্করণ চালু করা হবে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সিটি করপোরেশনের সমন্বয়ে এটি তৈরি করা হয়েছে। পাশাপাশি চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসে স্বয়ংক্রিয় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা (এআরএমএস) পরীক্ষামূলকভাবে চালুর প্রস্তুতি চলছে, যার মাধ্যমে পণ্যের শারীরিক পরীক্ষা কমানো হবে।
চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসে সাম্প্রতিক অংশীজন বৈঠকের প্রসঙ্গ টেনে লুৎফে সিদ্দিকী আগাম কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স বাড়ানোর ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, নিয়ম ইতোমধ্যেই রয়েছে, ঘাটতি রয়েছে শৃঙ্খলাপূর্ণ বাস্তবায়নে। বর্তমানে পাঁচ শতাংশেরও কম পণ্য আগাম ছাড় পাচ্ছে, যেখানে এ হার ৫০ শতাংশের বেশি হওয়া উচিত।
বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা বিনিয়োগ সমন্বয় কমিটির তথ্যভিত্তিক ও কাজমুখী কার্যপদ্ধতির প্রশংসা করেন। তারা বলেন, এটি সরকারি কাজের ধরনে এক ধরনের ‘শৈলগত সংস্কার’, যেখানে বাস্তবায়ন ও পরিমাপযোগ্য ফলাফলের ওপর জোর দেয়া হচ্ছে।
বৈঠক এখন পর্যন্ত অর্জিত অগ্রগতি ও পারস্পরিক সহযোগিতার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাই সন্তোষ প্রকাশ করেন।
এনএইচ