জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব মো. গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, সংবিধানের ৭২(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এই অধিবেশন আহ্বান করেছেন।

সাধারণত বাজেট অধিবেশন দীর্ঘ সময় ধরে চলে। অধিবেশন শুরুর আগে কার্য উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে অধিবেশনের মেয়াদ নির্ধারণ করা হবে বলে সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে।

অর্থনীতির সামনে পাঁচ বড় চ্যালেঞ্জ:

আসন্ন বাজেটের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উঠে এসেছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। প্রায় ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য বাজেট বাস্তবায়ন বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় কঠিন হবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পাঁচটি বড় চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করেছে।

১. মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ

দীর্ঘদিন ধরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্যের কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। চাল, ডালসহ বেশ কয়েকটি পণ্যে নতুন কর আরোপের সম্ভাবনাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

২. রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চলতি অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৯৮ হাজার কোটি টাকা কম রাজস্ব আদায় করেছে। এর মধ্যেই আগামী অর্থবছরে প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণের প্রস্তুতি চলছে।

৩. বৈদেশিক মুদ্রার চাপ

রিজার্ভ কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে না পৌঁছানো এবং ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের ফলে আমদানি ব্যয় বেড়েছে। এতে শিল্প উৎপাদন ও বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

৪. ঋণ পরিশোধের বাড়তি চাপ

মেগা প্রকল্পগুলোর ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধের চাপ ক্রমেই বাড়ছে। নতুন বাজেটের প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা শুধু ঋণের সুদ পরিশোধেই ব্যয় হতে পারে।

৫. বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সংকট

ব্যাংক খাতের তারল্য সংকট এবং ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তার কারণে বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমে যাওয়ায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

সংসদ এলাকা ঘিরে বিশেষ নিরাপত্তা:

বাজেট অধিবেশনকে কেন্দ্র করে রাজধানীর জাতীয় সংসদ ভবন ও আশপাশের এলাকায় সমাবেশ, মিছিল, শোভাযাত্রা ও বিক্ষোভ প্রদর্শন নিষিদ্ধ করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)।

ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদের স্বাক্ষরিত গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ৬ জুন রাত ১২টা থেকে সংসদের অধিবেশন শেষ না হওয়া পর্যন্ত নির্ধারিত এলাকায় অস্ত্র, বিস্ফোরক, ক্ষতিকর দ্রব্য বহনসহ সব ধরনের রাজনৈতিক ও জনসমাবেশ নিষিদ্ধ থাকবে।

মহাখালী, বাংলামোটর, ফার্মগেট, শ্যামলী, ধানমন্ডি, বিজয় সরণি, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ এবং জাতীয় সংসদ ভবন সংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকা এ নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকবে।

‘অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণই বাজেটের মূল দর্শন’:

আসন্ন বাজেটের দর্শন তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণ এবং দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে মূলধারায় যুক্ত করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের বাজেটে সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত হয়েছে নিম্ন আয়ের মানুষ। তাই দরিদ্র, নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠী এবং গৃহিণীদের সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।’

অর্থমন্ত্রী জানান, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আওতায় সরাসরি উপকারভোগীদের অ্যাকাউন্টে অর্থ স্থানান্তর করা হবে, যাতে মধ্যস্বত্বভোগী বা রাজনৈতিক প্রভাবের সুযোগ না থাকে।

কৃষকদের জন্য ‘ফার্মার্স কার্ড’ চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। এর মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি কৃষকদের জীবনমান উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি ও সৃজনশীল অর্থনীতিতে গুরুত্ব:

স্বাস্থ্যসেবায় মানুষের ব্যক্তিগত ব্যয় কমাতে ইউনিভার্সাল ও প্রাইমারি হেলথ কেয়ার সম্প্রসারণে জোর দেওয়া হবে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। এ ক্ষেত্রে সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি খাত ও এনজিওগুলোকে সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

এছাড়া কামার, কুমার, তাঁতি, ক্ষুদ্র কারুশিল্পী, থিয়েটারকর্মী ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের জন্য ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ কর্মসূচি গ্রহণ করা হচ্ছে। তাদের দক্ষতা উন্নয়ন, ঋণ সুবিধা, ডিজাইন সহায়তা, ব্র্যান্ডিং ও বাজারজাতকরণে সহযোগিতা দেওয়া হবে।

তার ভাষায়, ‘জিডিপি শুধু শিল্প-কারখানা থেকে আসে না; সংস্কৃতি, ক্রীড়া ও সৃজনশীল খাতও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।’

বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ার উদ্যোগ:

অর্থমন্ত্রী বলেন, বিনিয়োগ ও ব্যবসা পরিচালনায় অপ্রয়োজনীয় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে একটি নিয়ন্ত্রণমুক্ত অর্থনৈতিক পরিবেশ গড়ে তোলা হবে। বিভিন্ন অনুমোদন নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

তিনি জানান, উন্নয়ন প্রকল্প পর্যবেক্ষণে ড্যাশবোর্ডভিত্তিক মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা হবে, যাতে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব ও দায়ী ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করা যায়।

পুঁজিবাজারে আস্থা ফেরাতে নতুন কমিশন:

পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) পুনর্গঠন করা হচ্ছে বলেও জানান অর্থমন্ত্রী।

তিনি বলেন, শিগগিরই পেশাদার ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়ে নতুন কমিশন গঠন করা হবে। এর ফলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে এবং কোম্পানিগুলো সহজে পুঁজিবাজার থেকে তহবিল সংগ্রহ করতে পারবে।

অর্থমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, সরকারের চলমান সংস্কার কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে।

এস