চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হবে ২ মার্চ। এছাড়া নির্বাচন কমিশন অল্প সময়ের মধ্যেই নিজেদের অভ্যন্তরীণ সব প্রস্তুতি শেষ করে রাখতে চায়, যাতে করে সরকার চাইলে যেকোনো সময় নির্বাচন আয়োজনে কোনো বিলম্ব না হয়। তবে পুলিশসহ সরকারের অন্য সংস্থাগুলোর প্রস্তুতিও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
দশম, একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে রয়েছে নানা বিতর্ক। ওই তিন নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকজন রিটার্নিং ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা জানান, পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা নির্বাচনের সময় তাদের নির্দেশনা মানেননি। মনে হয়েছে, পুলিশকে যেন অন্য কোনো জায়গা থেকে পরিচালনা করা হয় তখন।
পুলিশের ওপর ভর করে কারচুপির মাধ্যমে শেখ হাসিনার সরকারের ক্ষমতা ধরে রাখার অভিযোগও রয়েছে। গত দেড় দশকে পুলিশে ৮০-৯০ হাজার সদস্যকে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ দেয়া হয়েছে সম্প্রতি দাবি করেছেন ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী। তবে গণ-আন্দোলনের মুখে গত ৫ আগস্ট দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের প্রায় দুই মাস পর ৩ অক্টোবর নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সরকারের কাছে প্রতিবেদন ও প্রস্তাব জমা দেবে কমিশন। এরপর সেগুলো নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করবে অন্তর্বর্তী সরকার।
এ বিষয়ে জাতীয় নাগরিক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদিব বলেন, ‘নির্বাচন সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন জমা দেয়ার জন্য ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় আছে। কমিশনের প্রস্তাব যখন আসবে তখন আমরা নির্বাচনের দিনক্ষণ কবে কী হবে না হবে সে বিষয়ে কথা বলতে পারব। এছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার না হওয়া পর্যন্ত তাদের নির্বাচনে আনা যাবে না। ফলে জাতীয় ইস্যুগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করেই নির্বাচনের পথে এগিয়ে যেতে হবে।’
নির্বাচনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, কমিশন প্রস্তুত হওয়া যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সমান গুরুত্বপূর্ণ পুলিশসহ নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করবে এমন বাহিনীগুলোর মধ্যে শৃঙ্খলা ফেরানো। তার আগে নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব হবে না।
অন্যদিকে সংবিধানের ১১৯ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব হলো রাষ্ট্রপতি ও সংসদ নির্বাচন, ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদ নির্বাচন সম্পন্ন করা। নির্বাচনের জন্য ভোটার তালিকা প্রস্তুত, নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ এবং আনুষঙ্গিক কার্যাদির সুষ্ঠু সম্পাদন। দায়িত্ব পালনে নির্বাচন কমিশন স্বাধীন থাকবে এবং সংবিধান ও আইনের অধীন হবে। নির্বাচন কমিশনকে দায়িত্ব পালনে সহায়তা করা সব কর্তৃপক্ষের কর্তব্য। তারই ধারাবাহিকতায় আগামী ২ জানুয়ারি খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে ২ মার্চ। এবার স্থানীয় সরকার বা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিষয় নেই। দায়িত্ব নেয়া নতুন কমিশন সরাসরি সংসদ নির্বাচন আয়োজন করবে। ফলে ভোটার তালিকা প্রকাশের পর কমিশনের হাতে মোটাদাগে তফসিল ঘোষণার আগে আর কোনো কাজ নেই।
এ প্রসঙ্গে ইসির অতিরিক্ত সচিব কেএম আলী নেওয়াজ বলেন, ‘আমাদের সবার লক্ষ্য এক। আমরা একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করতে চাই। আমরা আমাদের যা যা দায়িত্ব তা দ্রুত সময়ের মধ্যে শেষ করে রাখব। ভোটার তালিকা হালনাগাদ হয়ে গেলে মোটামুটি কাজ গুছিয়ে নেয়া যাবে। বাকি কাজ এ সময়ের মধ্যেই শেষ করা হবে। এখন কমিশন প্রস্তুতের সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সরকারের অন্য বিভাগগুলোকে প্রস্তুত হতে হবে। সেসব কাজ সরকারের। সব পক্ষ মিলেই সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। আমরা সরকারের নির্দেশনার অপেক্ষায় থাকব। সরকার থেকে যখন নির্বাচন আয়োজনের জন্য বলা হবে, তখন যাতে করতে পারি, কমিশনকে সেভাবে প্রস্তুত করা হচ্ছে।’
নির্বাচন কমিশনের একটি সূত্র জানিয়েছে, বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও চার কমিশনার নিয়োগ পেয়েছেন গত ২১ নভেম্বর। অন্যদিকে ৫ ডিসেম্বর ইসির সিনিয়র সচিব হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন আখতার আহমেদ। তারা তাদের দায়িত্ব বুঝে নিচ্ছেন। সেই সঙ্গে চলছে রুটিন কাজও।
নির্বাচন বিষয়ে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার তিন মাসের মধ্যে ভোটার তালিকা করে, সব ঠিকঠাক করে নির্বাচন করে চলে যায়। সেদিক থেকে একটা ধারণা সবার রয়েছে। নির্বাচন কমিশন সংস্কার করা খুব সহজ, এখানে দ্বিমতের কিছু নেই। পুলিশ বাহিনীর সংস্কার করে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করবে সরকার। বাকি সংশ্লিষ্ট যে বিভাগগুলো রয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার যেভাবে নির্বাচন করে, নিরপেক্ষভাবে সেভাবে কাজ করবে। নির্বাচন করার জন্য খুব বেশি সময়ের যে প্রয়োজন সেটা নয়। তবে সরকারকে আমরা সময় বেঁধে দিয়ে চাপ দিতে চাচ্ছি না। আমরা সব জায়গায় কাজেকর্মে সরকারকে সহযোগিতা করছি। কিন্তু নির্বাচন হওয়া জরুরি। দেশে-বিদেশে সবাই অপেক্ষা করছে। অংশীজনরা সবাই অপেক্ষা করছে। অনেকগুলো সমস্যা হচ্ছে, এগুলো রাজনৈতিক সরকার ছাড়া সমাধান সম্ভব নয়।’
এফএইচ





