মতিঝিলের ৮১ নম্বর বাংলার বাণী ভবনটি দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থাপনা হিসেবে পরিচিত। ভবনটির একাংশে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। অন্যদিকে ভবনের কয়েকটি তলায় শেখ ফজলে নূর তাপসের রাজনৈতিক ও আইন পেশাসংশ্লিষ্ট কার্যক্রমও ছিল।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের সুযোগে ভবনটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কয়েক দফা টানাপোড়েন শুরু হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ভবনের ওপরের তলাগুলোর নিয়ন্ত্রণ এখন গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মীদের হাতে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তবে নিচের কয়েকটি তলায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো আগের মতোই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

ব্যাংকের সঙ্গে ভাড়ার বিরোধ

ভবনের প্রথম ও দ্বিতীয় তলায় দীর্ঘদিন ধরে একটি ব্যাংকের কার্যক্রম চলছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, ২০০২ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি ভবনের ওই অংশ ইজারা নিয়ে ব্যবহার করছে। রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের পর নতুন করে যারা ভবনের নিয়ন্ত্রণ দাবি করছেন, তাদের ভাড়া দেওয়ার বিষয়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আপত্তি জানায়।

এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে চাপ ও বিরোধ তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, বৈধ চুক্তি ও মালিকানার ভিত্তিতেই তারা ভবনের নির্ধারিত অংশ ব্যবহার করছে। ফলে অন্য কোনো পক্ষকে ভাড়া দেওয়ার প্রশ্ন আসে না।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ভাড়া আদায় ও ভবনের নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে ব্যাংক কর্মকর্তাদের ওপর বিভিন্ন সময় চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

গণঅধিকারের নেতাদের উপস্থিতি

ভবনের আশপাশের কয়েকজন বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীর ভাষ্য, সাম্প্রতিক সময়ে গণঅধিকার পরিষদের কয়েকজন নেতাকর্মীর নিয়মিত যাতায়াত বেড়েছে। তাদের মধ্যে সারোয়ার হোসেন সানি ও সুমন নামে দুজনের নাম স্থানীয়ভাবে বেশি আলোচিত হচ্ছে।

স্থানীয়দের কেউ কেউ সারোয়ার হোসেন সানিকে নুরুল হক নুরের ঘনিষ্ঠ বা আত্মীয় হিসেবে পরিচয় দিলেও এ সম্পর্কের বিষয়টি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ভবনটির নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা নিয়েও বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে।

ভবনের নিচতলায় ‘পানসি’ নামে একটি রেস্টুরেন্ট এবং ‘ওহ চট্টগ্রাম’ নামে একটি দোকান রয়েছে। এসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ঘিরেও স্থানীয় পর্যায়ে ভবনটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নানা আলোচনা রয়েছে।

তাপসের রাজনৈতিক ও আইনজীবী কার্যালয়

বাংলার বাণী ভবনের তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় দীর্ঘদিন ধরে শেখ ফজলে নূর তাপসের আইনজীবী চেম্বার ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কার্যালয় ছিল বলে জানা যায়। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ওই অংশও আর আগের নিয়ন্ত্রণে নেই বলে অভিযোগ।

ভবনটির মালিকানা শেখ ফজলে নূর তাপসের পরিবারের হলেও রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের পর পরিবারের সদস্যদের সেখানে নিয়মিত উপস্থিতি দেখা যায়নি। এ সুযোগেই বিভিন্ন পক্ষ ভবনটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেছে বলে স্থানীয়দের দাবি।

ভবনটির পুরোনো ইতিহাস

বাংলার বাণী ভবনের সঙ্গে দেশের রাজনৈতিক ও সংবাদপত্রের ইতিহাসও জড়িয়ে আছে। একসময় এখান থেকে ‘পায়গাম’ ও পরে ‘বাংলার বাণী’ পত্রিকার কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাগনে শেখ ফজলুল হক মনি ‘বাংলার বাণী’র সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

ভবনটিতে ‘মধুমতি মুদ্রণালয়’-এর কার্যক্রমও ছিল। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ভবনটির নিয়ন্ত্রণে পরিবর্তন আসে। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন পর্যায়ে মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়েছে।

২০০৯ সালের পর শেখ ফজলে নূর তাপসের পরিবারের নিয়ন্ত্রণে ভবনটির কার্যক্রম ফিরে আসে বলে সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য। এর পরও বিভিন্ন সময়ে ভবনটি ঘিরে হামলা ও বিরোধের ঘটনা ঘটেছে।

৫ আগস্টের পর নতুন করে দখলচেষ্টা

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের বিভিন্ন স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যে অস্থিরতা তৈরি হয়, তার প্রভাব পড়ে বাংলার বাণী ভবনেও। ওই সময় থেকে ভবনটি দখলের জন্য একাধিক পক্ষ তৎপর হয় বলে স্থানীয়দের দাবি।

পরবর্তীতে গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মীদের একটি অংশ ভবনের ওপরের তলাগুলোতে অবস্থান নেয়। ধীরে ধীরে তাদের নিয়ন্ত্রণ বিস্তৃত হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

তবে ভবনটির মালিকানা, দখল এবং ভাড়া নিয়ে বিরোধের বিষয়টি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিষ্পত্তি হয়েছে কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।

ভবনটি দখল ও সেখানে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের অবস্থানের বিষয়ে জানতে মতিঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ কামরুজ্জামান তালুকদারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন বলে জানান।

তিনি বলেন, এ বিষয়ে থানায় কোনো অভিযোগও করা হয়নি।

এদিকে ভবনটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে নুরুল হক নুর বা গণঅধিকার পরিষদের সংশ্লিষ্ট নেতাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

সূত্র: মানবজমিন

এনএইচ