আমার লেখা যেদিন প্রকাশিত হবে সেটি ২০১৪ সালের শেষ দিন। পিছন ফিরে তাকানোর জন্য এই লেখা লিখছি না। আমাদের দেশে একটি প্রবাদের মতো আছে- যায় দিন ভালো। আমাদের পিতা-মাতা, দাদা-দাদিদের কাছে শুনতাম, পুরনো দিনগুলো কত ভালো ছিল। সেই যে ব্রিটিশ আমল, তার প্রশংসা করতেন তারা। কিন্তু সেটা ছিল ঘোর উপনিবেশবাদের কাল। পাকিস্তান আমাদের শোষণ করেছে। কিন্তু পাকিস্তান ঠিক ব্রিটিশদের মতো পূর্ব পাকিস্তানকে দখল করেনি। এ জন্য আমরা পাকিস্তানের শাসনকে প্রায় ঔপনিবেশিক শাসন বলি। অনেকে হয়তো আমার এই টার্মের সঙ্গে একমত হবেন না। কিন্তু সেটা এখানে বিবেচ্য নয়। লক্ষ্য করার বিষয় পাকিস্তানি শাসনকে ভালো বলার লোক আমাদের দেশে তেমন নেই। আইয়ুব খানের শাসনামলকে ভালো বলার কিছু লোক তৈরি হয়েছিল কিন্তু তাদের ধ্বংসাবশেষও এখন নেই। এই এক বছর কেমন ছিল, কিংবা গত ৬ বছর কেমন গেল এ নিয়ে বিতর্ক করলেও এর একটা পাল্লা বেশি ভারী হবে। সে বিতর্ক অনেক করেছি। আমি বিশ্বাস করি, একদিন জনগণই সেই বিতর্কের অবসান ঘটাবে। কিন্তু এ বছরটি এবং তার শেষটি যে ভালো গেল না সে কথা স্বীকার করতে হবে সবাইকে।
২০১৩ এর শেষ দিকের সঙ্গে ২০১৪ এর একটা মিল আছে। দুটি সময়ই রাজনৈতিক সংঘাত-সহিংসতা অথবা এ দুয়ের আশঙ্কা ছিল তীব্র। এক সহিংস রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ১৩ পা দিয়েছিল ১৪-তে। প্রায় একই রকম পরিস্থিতি আমরা ১৪-এর শেষে এসে দেখছি। তখন জামায়াত-বিএনপি একসঙ্গে ছিল। সহিংসতা অগ্নিকাণ্ড এবং তৎজনিত মৃত্যুর পরিসংখ্যান দিয়েছেন অনেকেই। এখন বিএনপি-জামায়াত বিযুক্ত হয়েছে তা নয়, কিন্তু বহু ক্ষেত্রে জামায়াতকে বাদ দিয়ে কর্মসূচি করছে বিএনপি। জেলায় জেলায় জনসভাগুলো উল্লেখ করা যেতে পারে, যার শেষ অঙ্ক ছিল গাজীপুরে। এই শেষ অঙ্কে জামায়াত ছিল না। কিন্তু তারপরও দুটি হরতাল দেখলাম আমরা। এবং সেই হরতালে সহিংসতা দেখলাম। ইটের আঘাতে মারা গেলেন এক স্কুলশিক্ষিকা। সঙ্গে থাকা স্বামী পরিবার তাকে বাঁচাতে পারল না। এই প্রাণসংহারী সহিংসতা কে করেছে তা বোঝাও আবার কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেওয়া যেতে পারত, এটা হরতালকারী বিরোধী দলের কাজ। কিন্তু বিএনপি বলেছে তারা এ কাজ করেনি, সরকারি দল এটা করে তাদের ওপর চাপানোর চেষ্টা করছে। কাকে বিশ্বাস করব। এ দুই দলের কেউই তো সত্যি কথা বলে না। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র অয়নের ব্যাপারে কি বলব। হরতালের আগের দিন মা-বোনসহ ডাক্তারের কাছ থেকে ফেরার পথে তাদের সিএনজিচালিত অটোরিকশায় আগুন লাগিয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা, যার কারণে নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ২২ বছর
বয়সী তানজিমুল হক অয়নের শ্বাসনাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পাঠকবৃন্দ, আপনাদের মনে আছে এ রকম যাত্রীসহ সিএনজি অটোরিকশায় আগুন লাগিয়ে দেওয়ার ঘটনা গত বছরও ঘটেছিল।
গত বছর ধারণা করা হয়েছিল, সরকার সে ধারণা উসকেও দিয়েছিল যে, ওইসব সন্ত্রাস করছে প্রধানত জামায়াতে ইসলামী। কিন্তু এবারের হরতালে জামায়াত ছিল না। অতি সম্প্রতি জামায়াত যে দুই-চারটি হরতাল করেছে সেগুলোতেও কোনো সহিংসতা ছিল না। মনে করার কোনো কারণ নেই যে, আমি জামায়াতকে কোনো ছাড়পত্র দেওয়ার চেষ্টা করছি। কেউ বলুক আর না-ই বলুক, জামায়াত ৭১-এর আগুনে পুড়তে থাকবে যতদিন পর্যন্ত না তারা জনগণের কাছ থেকে ক্ষমা পাবে। আমি বলতে চাইছি সহিংসতা জামায়াত ছাড়া অন্য বড় দুটি দলও করে। ২০০৪ সালে আন্দোলন চলাকালে গান পাউডার দিয়ে পোড়া বাসের আগুনে কয়েকজন মৃত্যুবরণ করেছিল। তখন আন্দোলনের নেত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, মৌলবাদীরাই বাসে আগুন দিয়েছে। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনকাল স্মরণ করুন। ছাত্র-জনতার মিছিলে ট্রাক তুলে দিয়ে হত্যা করা হয়েছিল সেলিম-দেলোয়ারকে। আমাদের দেশের ইতিহাসে এ ধরনের ঘটনা সেটিই প্রথম।
আমি বলতে চাইছি, সহিংসতা কোনো একটি দলের বৈশিষ্ট্য নয়। যারা এই এক বছর আন্দোলন নেই, দেশে শান্তি ফিরে এসেছে বলে প্রচার করেছেন তাদের বোঝা উচিত, এটা সত্যি নয়। সত্যের অপলাপ মাত্র। সত্য হলো এই সমস্যা সমস্যার জায়গায় আছে, হিংসা হিংসার জায়গায় আছে। কেবল ভালোবাসাটাই নেই।
আজকের দিন শেষ হলেই আমরা নতুন বছরে পা দেব। নতুন বছরকে স্বাগত। কিন্তু জানি নতুন বছর শুরু হয় জানুয়ারি মাস দিয়ে। আর জানুযারি মাসের প্রথম চার দিন পর ৫ জানুযারি। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের কলঙ্ক। ক্ষমতাসীনরা যতই একে গণতন্ত্রের বিজয়, গণতন্ত্রের দিবস বলে চালানোর চেষ্টা করুক না কেন, এবার এ দিন উদ্বেগের। শঙ্কার। বিরোধী দল বিএনপি গাজীপুর থেকে সরে এসেছে, কিন্তু তাদের রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরে আসেনি। ৫ তারিখে রাজধানী ঢাকার তিনটি স্থানে সমাবেশের অনুমতি চেয়ে তারা কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেছে। এ তিনটির একটি সৌহরাওয়ার্দী উদ্যোনকে ক্ষমতাসীনরা ইতিমধ্যে গিলে ফেলেছে। আর দুটিতে বিরোধী দলকে জনসভা করতে দেওয়া হবে না এটা ধরেই নেওয়া যেতে পারে। বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান শেখ মুজিব সম্পর্কে তার উক্তি প্রত্যাহার না করলে বাংলাদেশের কোথাও তাদের জনসভা করতে দেওয়া হবে না বলে আওয়ামী লীগের মুখপাত্র এ ধরনের ঘোষণা ইতিমধ্যেই দিয়েছেন। খোদ সভানেত্রী এবং দেশের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বঙ্গবন্ধুর ব্যাপারে কটূক্তিকারীদের যথোপযুক্ত শিক্ষা দেওয়া হবে। এ জন্যই তো তার সাংবিধানিক নেতৃত্বের অধীন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম জিয়ার গাজীপুরের জনসভাস্থল দখল করে নিয়েছিল। এই তাদের প্রথম প্রতিহতকরণ। আহা কি আনন্দ...। অতঃপর ৫ তারিখে বিএনপিকে জনসভার অনুমতি না দিয়ে, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তারা স্লোগান দেবে, গাজীপুরে পারে নাই, ঢাকাতেও পারবে না। ঢাকাতেও পারেনি সারা দেশে পারবে না।
বিএনপি কি করবে জানি না। রীতিমতো এসিড ঢেস্ট দলটির। গাজীপুরে তারা পিছু হটেছে। ঢাকাসহ সারা দেশে একটি ঢিলেঢালা হরতাল পালন করে আন্দোলনে পানি ঢেলে দিয়েছে। এখন কি আবার প্রমিথিউসের মতো জেগে উঠবে? জানি না। কিন্তু এটা জানি যে, ক্ষমতাসীনরা ঠা ঠা করে হাসবে। ৩২ পাটি দাঁত বের করে বলবে কিভাবে আন্দোলন করতে হয় বিএনপিকে তো আমাদের কাছে শিখতে হবে।
পাঠকবৃন্দ, সরকারের এই বিজয় উল্লাসে আমাদের যোগ দেওয়ার সুযোগ নেই। ওরা আন্দোলন করতে যতখানি জানে তার চেয়ে বেশি জানে আন্দোলন দমন করতে। এতে বরং গণতন্ত্র, মানবতা, দেশপ্রেম বলি হয়ে যাক তাতে তাদের কিছু যায় আসে না। এরা সহিংসতার কথা বলে বিরোধী দলকে দমন করে। অথচ সরকারের র্যাব, পুলিশ যে কত সহিংস, হৃদয়হীন, অমানবিক- ঝালকাঠির লিমন, নারায়ণগঞ্জের সাত খুন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছু ছাত্রীর পিঠে স্ববুট লাথিসহ অসংখ্য উদাহরণ এই এক বছরে পাওয়া যাবে।
দুই.
কিন্তু বছর শেষে সবচেয়ে অমানবিক হৃদয়হীন, মিথ্যাচারী এবং নির্যাতক প্রশাসককে আমরা দেখলাম শাহজাহানপুরে। যেহেতু ঘটনা সবাই জানেন সেহেতু আমি আর এর বর্ণনা দিতে যাচ্ছি না। জিহাদের অবস্থান নির্ণয় করতে ব্যর্থ হয়েছে ফায়ার সার্ভিস। একজন মূর্খ প্রতিমন্ত্রী না জেনে মিথ্যাকে সত্যি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জোর চেষ্টা করেছেন। তার মন্ত্রণালয়ের অধীনের পুলিশ যে হৃদয়হীন আচরণ করেছে তার নিন্দা জানানোর ভাষা আমার নেই। সন্তান হারানোর দগদগে দাগ যখন সেই পিতার বুকে আগুনের মতো জ্বলছে তখন তাকে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের নামে মানসিক অত্যাচার, অভিযোগ অনুযায়ী এমনকি শারীরিক নির্যাতন কেবল ফ্যাসিজমের সঙ্গেই তুল্য। জিহাদের পাইপে পড়ে যাওয়ার আগে তার খেলার সাথী কিশোর-কিশোরীদের জিজ্ঞাসাবাদের নামে যে নির্যাতন তাকে কি বলব? হতবাক হয়ে যেতে হয় যে আচরণের জন্য রাষ্ট্রের ওই পরিবারগুলোর কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত সেখানে রাষ্ট্র বলছে সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে আন্তরিকভাবে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। ভাবা যায়? পত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী জিহাদের বাবা যে মামলা করেছেন সেটা পুলিশের পরামর্শে। কাকে কাকে আসামি করা হয়েছে তা জিহাদের বাবা জানেন না পুলিশ জানেন। আন্তরিকতার এত বড় নিদর্শন আর কোথায় পাবেন!
২০১৪ গেছে গণতন্ত্রের হত্যাকাণ্ডে। ২০১৫ হোক তার পুনরুদ্ধারের বছর।
তিন.
লেখাটা এখানে শেষ হলেও শেষ হলো না। গত বুধবার মগবাজার উড়াল সেতুর ওপর লিখেছিলাম। বুধবার সকালেই সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ফোন করেছিলেন। বললেন কোনো লেখার উপরে বা বিরুদ্ধে চাপ সৃষ্টি করা আমার উদ্দেশ্য নয়। কেবল আপনার অবগতির জন্য জানাচ্ছি এক বনানী ছাড়া মহানগরের কোনো উড়াল সেতু তার মন্ত্রণালয়ের অধীনে নয়। যেহেতু ঢাকা মহানগরের রাস্তাঘাট জটমুক্ত রাখা তার দায়িত্ব সে জন্য তিনি মগবাজার উড়াল সেতু পরিদর্শন করেছিলেন। সেখানকার অবস্থা প্রধানমন্ত্রীকে জানানোও হয়েছিল।
আমি ওবায়দুল কাদেরের কথা বিশ্বাস করেছি। এখানে তার মিথ্যা কথা বলার কোনো কারণ নেই। আমি এ কথাও তাকে বলেছি, তার সমালোচনা করার জন্য আমি এ লেখা লিখিনি। এমনি এমনি আমি কাউকে সমালোচনা করতে চাই না। যদি কখনো না বুঝে কোনো ভুল করে ফেলি তা স্বীকার করতে আমি সব সময় প্রস্তুত। ওবায়দুল কাদেরকে তো আমি বন্ধু মনে করি।
লেখক : রাজনীতিক, ই-মেইল : [email protected]
সূত্র:(bd-pratidin)
এমকে





