“আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি” আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী রচিত আলতাফ মাহমুদের কন্ঠে গাওয়া এই গানটিই আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় ১৯৫২ সালের সেই দিনের কথা।
যেদিন মায়ের মুখের ভাষা রাক্ষার জন্য জীবনের মায়া ত্যাগ করে রাজপথে নেমেছিল মায়ের শ্রেষ্ঠ সন্তানরা। রফিক, জব্বার, সালাম, বরকত, শফিক আরো না জানা কত ভাষা প্রেমিক। তারাই ছিল জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। কি স্বার্থ ছিল তাদের? সুন্দর পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে মায়ের সম্মান রক্ষার্থে তারা রাজপথে নেমে আসল কেন? কত মানুষ ছিল সেদিন আমাদের চারপাশে। কেউ কেউ রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে দেখ ছিল রফিক জব্বারদের কর্মকান্ড।
এতো ত্যাগ আর ভালোবাসা দিয়ে যে ভাষা আমরা পেলাম আজ আমরা কতটুক মুল্যায়ন করি সেই ভাষাকে? প্রশ্নটা থেকেই যায়। আজ যদি কথার মধ্যে কোথাও একটি ইংরেজি বা অন্য কোন ভাষার শব্দ ব্যবহার করে কথা বলতে পারি, তাহলে নিজেকে যেন কিছু একটা ভাবতে ইচ্ছে করে।
অনেক গুরুজনের মুখে শুনেছি “কথার মধ্যে দুই-চারটা ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করবে তাহলে তোমার কথার গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে অবশ্যই তোমাকে ইংরেজিতে ভালো করতে হবে।
যে শিক্ষার্থীটা ইংরেজি ভালো বলতে বা লিখতে পারে শিক্ষক তাকে কতটা ভালোবাসে? আর যে শিক্ষার্থীটা বাংলায় ভালো করে শিক্ষক তাকে কতটা ভালোবাসে? প্রশ্ন দুটির উত্তর অনুসন্ধানের জন্য আপনাকে বেশি কিছু করতে হবে না। অতি অল্পতেই বুঝতে পারবেন যে, কোন ছেলেটা বাংলায় ভালো এমন কোন চিন্তাই কারো মাঝে নেই।
আমি তখন নবম শ্রেণীতে। মাত্র ছয় বছর আগের কথা। হঠাৎ শুনলাম আজ দুপুরে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা বিদ্যালয় পরিদর্শন করতে আসবে। সবাই বলাবলি শুরু করল, আজ খবর আছে, শিক্ষা কর্মকর্তা এসে ইংরেজিতে কথা বলতে বলবে। আমাদের শ্রেণী কক্ষে ইংরেজি শিক্ষক আসলেন এবং দৈনন্দিন জীবনের সাথে জড়িত বেশ কিছু বাক্য ইংরেজিতে অনুবাদ করে দিলেন। যেমন: আমি প্রতিদিন সকাল ৫ টায় ঘুম থেকে উঠি। সকাল ৭টায় সকালের নাস্তা খায়। এরপর ৯টায় বিদ্যালয়ে আসি। এমন বেশ কিছু বাক্য। ১১ টা ৩০ মিনিটে শিক্ষা কর্মকর্তা আসল। যেরকম চিন্তা করেছিলাম ঠিক তেমনটিই ঘটল। বলল, “ক্লাসে ফার্স্ট বয় কে ?” তারপর শিক্ষা কর্মকর্তা ছেলেটিকে সকাল থেকে এখন পর্যন্ত কি কি করেছে সেগুলো ইংরেজিতে বলতে। মোটামুটিভাবে বলার চেষ্টা করল ছেলেটি।
মজার ব্যাপার হলো তিন ক্লাসে প্রবেশ করে যতটুক সময় ছিলেন আর যতগুলো কথা তিনি বলেছিলেন তার বেশির ভাগই ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করেছিলেন। আমি সেদিন সেখানে কিছুই বুঝতে পারি নাই। আমার কাছেও খুব ভালো লেগেছিল। কারণ সেই “ফার্স্ট বয়টা ছিলাম” আমি। আজ বুঝি যে মায়ের সন্তান ভাষার জন্য জীবন বিসর্জন দিতে দ্বিধাবোধ করে না। সেই মায়ের সন্তানই বাংলায় কথা বলতে লজ্জা পায়।
দেশের বিত্তবান ভদ্র শ্রেণীর মানুষেরা তাদের সন্তানদের “ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে” (তাদের ভাষায়) লেখাপড়া করাতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করে। আবার মাতৃভাষা দিবসে আয়োজিত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তারাই বড় বড় বক্তব্য দেয়। দেশে অনেক বড় বড় বাজার আছে, যেখানে দোকানের ভিতরে দিকনির্দেশনা মূলক বাক্যগুলো ইংরেজি ভাষায় লেখা। কেন বাংলায় লেখলে কি এ দেশের মানুষ বুঝতে পারতো না? দেশের হাজারো পরিবহন আছে ইংরেজি নামে।
দেশের অনেক প্রতিষ্ঠান আছে যার প্রধান ফটকে ইংরেজি বড় বড় অক্ষরে লেখা নাম। দেশে নির্মিত অনেক কিছু ইংরেজি নামেই সকলে জানে। যেমন: “ফ্লাইওভার, সিটি কর্পোরেশন ইত্যাদি” কেন ? এগুলোর কি বাংলা কোন প্রতি শব্দ নেই? নাকি আমরা মাতৃভাষা দিবসে সেই কালে আর এই কালে রচিত কিছু গান বাজিয়েই নিজের আত্মাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করি। আসলে আমাদের আত্মাটা মাতৃভাষার জন্য আর কাঁদে না। তাই সান্ত্বনা দেবারও আর প্রয়োজন হয় না।
গ্রামের ছেলেরা এই দিনে বিভিন্ন চড়–ইভাতির আয়োজন করে। তাদের আয়োজনের মধ্যে অন্যতম একটি অংশ গান বাজানো আর নাচানাচি করা। কিন্তু মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে ছুটির দিনে তারা কি গান গুলো বাজায় তা লক্ষ করেছেন কখনো? এছড়া সারা বছর তাদের আয়োজিত অনুষ্ঠান গুলোতে কোন ভাষার গান বাজে। এদেশের রিক্সা চালকেও বাংলা গান শুনতে চায় না। এজন্য কিন্তু রিক্সা চালক দায়ী নয়? তাহলে কে দায়ী?
মাতৃভাষা দিবস পালনের নামে বছরে একদিন গান বাজনা করে দুই-চারটা সেমিনার করেই কি আমাদের দায়িত্ব শেষ? নাকি মায়ের সম্মান সর্বত্রে প্রতিষ্ঠিত করার গুরুভার আমাদের উপর আছে?
সাইফুল্লাহ হিমেল, সাংবাদিক, শিক্ষার্থী ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ।
ওএফ





