তাকওয়া অর্জনই রমজানের প্রধান উদ্দেশ্য: মানুষের প্রতিটি কাজের উদ্দেশ্য থাকে। যেমন ভাত খাওয়ার উদ্দেশ্য বেঁচে থাকা ও শক্তি সঞ্চয় করা। তেমনি রোজার উদ্দেশ্য মুত্তাকী হওয়া।

আল্লাহ বলেন “হে ঈমানদারগন তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমনি ফরজ হয়েছিল পূর্ববর্তীদের উপর। সম্ভবত তোমরা মুত্তাকী হতে পারবে।” আমরা সুবহে সাদিক হতে সুর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও স্ত্রী সঙ্গম হতে বিরত থাকাকেই রোজা মনে করি।

রাসূল (সাঃ) বলেছেন “যে ব্যক্তি রোজা অবস্থায় মিথ্যা কথা ও খারাপ কাজ হতে বিরত থাকতে পারল না, তার খানা পরিত্যাগে আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।”

আমরা যদি খেতে গিয়ে বালি মাটির মত অখাদ্য খাওয়ার চেষ্টা করি তবে যেমনি বমি করতে করতে উগলে ফেলতে হয়। তেমনি রোজা অবস্থায় যদি গালি গালাজ, অশ্লিলতা, অন্যের হক নষ্ট করা,

হারাম ভক্ষণ, সুদ, ঘুষ এরকম পাপ কাজ হতে দুরে থাকনে না পারি তবে তার রোজা অখাদ্য ভক্ষণের মতই অবস্থা হবে।

এজন্য এভাবে বালি মাটির মত অখাদ্য খেয়ে বেঁচে থাকা ও শক্তি সঞ্চয় করার চেষ্টা যেমন ব্যর্থ, তেমনি সকল পাপ হতে

দুরে থেকে তাকওয়া অর্জন করতে না পারলে সারাদিন উপোস থাকা ছাড়া কোন ফল হবে না।

রমজানের মর্যাদা আল কুরআনের কারনেই: রমজান মাস সকল আসমানী কিতাব নাজিলের মাস। ৬ রমজান তাওরাত, ১৩ রমজান ইনজিল, ১৮ রমজান যাবুর এবং রমজানের শেষ দশদিনের বিজোর রাত্রিতে পৃথিবীর সর্বকালের শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ আল কুরআন নাজিল হয়েছে।

আবার এ মাসের এক রাত্রির মর্যাদা হাজার মাস (৮৪ বছর ৪মাস) অপেক্ষা উত্তম শুধু কুরআন নাজিলের কারনেই। কুরআন এর সংস্পর্শে যেই আসবে তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেবে।

যেমন সামান্য কাঠের তৈরী রেহাল, অত্যন্ত কমদামী কুরআন জড়ানো কাপড়, কমদামী কাগজে এমন লিখা যাতে কুরআনের আয়াত লিখা থাকে, এসবের মর্যাদা বেড়ে যায় শুধু কুরআনের কারনেই।

অথচ অনেক দামী কাঠের তৈরী খাট, কাপড় ও দামী কাগজ আমাদের পদপৃষ্ট হয় কিন্তু রেহাল, সামন্য কাপড় ও আয়াত লিখা কাগজের নূন্যতম অবহেলা হলে আমরা চুমু খাই, বুকে জড়ায়ে ধরি। এভাবে রাসূল (সাঃ) এর উপর কুরআন নাজিলের কারনেই তিনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মহামানব।

কুরআনের আইন যে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়, সে সমাজ সুন্দর পরিচ্ছন্ন হয়ে যায়। এভাবে কোরআনের সংস্পর্শে যে মানুষটিই যায় তার মর্যাদাও কোরআন সর্বত্তম মানুষে পরিনত করে। মহান আল্লাহ বলেন, “রমজান মাস, এ মাসে কুরআন নাজিল করা হয়েছে।

আর এই কুরআন সমগ্র দুনিয়ার মানুষের জন্য পথ প্রদর্শক ও সত্য মিথ্যার পার্থক্যকারী”। তাই রমজান মাসে কুরআন নাজিলের কারনেই কেবল এ মাসের মর্যাদা এত বেশী। এভাবে যারাই কুরআনের নিকটে আসবে তারাই সঠিক পথ

প্রাপ্তির মাধ্যমে মর্যাদার অধিকারী হবে।

মাহে রমজানের ফজিলত: রমজান মাস সিয়াম সাধনা, তাক্বওয়া অর্জন, রহমত, মাগফিরাত ও জাহান্নাম হতে মুক্তি লাভের মাস।

এমাসের একটি ফরজ এবাদত অন্য মাসের ৭০ টি ফরজ এবাদতের সমতূল্য। এমাসের নফল এবাদত অন্য মাসের ফরজের সমতুল্য।

রাসুল (সাঃ) বলেছেন “রোজাদারের নিদ্রা এবাদততুল্য, চুপ থাকা তাসবিহ পাঠতুল্য। আর যারা রমজানের প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত রোজা রাখবে সে ঐ দিনের মত নিস্পাপ যখন মাতা তাকে শিশু হিসেবে প্রসব করেছিল”।

রোযাদারের পুরস্কার দানকারী আল্লাহ নিজেই: আল্লাহ বলেন “রোজা আমার জন্য, আমি নিজেই এর পুরস্কার দিব” -আল বুখারী। দুনিয়ার কোন সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সামান্য প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি বা সম্মানী ব্যাক্তির নিকট হতে পুরস্কার নেয়ার জন্য প্রতি বিশেষ হৃদয়াবেগ তৈরী হয়।

কিয়ামতের দিন এই পৃথিবীর সকল রাজাধিরাজের শ্রেষ্ঠ রাজাধিরাজ, সর্বশ্রেষ্ঠ ক্ষমতাধর মহান আল্লাহ আলামিন সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে রোজাদারদের পুরস্কার দিবেন। অবশ্য এই পুরস্কারের তুলনা দুনিয়ার কোন পুরস্কারের সাথে হয় না।

রোজা জান্নাত লাভের পথ: রাসূল (সাঃ) বলেন: “জান্নাতে রাইয়ান নামক একটি দরজা আছে। রোজাদাররা তার সে দরজার যে দিক দিয়ে ইচ্ছা প্রবেশ করবে”(বুখারী-১৭৯৭)।

রোজা ক্বিয়ামতে সুপারিশকারী: ক্বিয়ামতের দিন রোজা মানুষের জন্য সুপারিশ করে বলবে “হে রব আমি তাকে পানাহার ও প্রবৃত্তি কামনা হতে বাধা দিয়েছি তার জন্য আমার সুপারিশ গ্রহন করুন। সেদিন তার সুপারিশ গ্রহন করা হবে”

(মুসনাদ-৬৬২৬)।

রোজা জাহান্নাম হতে মুক্তির পথ: রাসুল (সাঃ) বলেছেন, “যে বান্দাহ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে একদিন রোজা রাখবে তার ও জাহান্নামের মাঝে ৭০ বছরের দুরত্ব তৈরী করে দিবেন” (বুখারী-১৮৯৪)।

রোজাদারের সুখ শান্তি লাভ: রাসুল (সাঃ) বলেছেন “রোজাদারের জন্য দুটি খুশির সময় রয়েছে একটি ইফতারের সময় অপরটি আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের সময়” (বুখারী-১৮০৫)।

রোজা ট্রেনিংয়ের মাস: ভালো কৃষক, শ্রমিক ডাক্তার ও ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার জন্য যেমন লাগাতর ট্রেনিং ছাড়া সম্ভব নয়। তেমনি ট্রেনিং দরকার ভাল মুসলমান হওয়ার জন্য। আর এজন্য প্রয়োজন জিহবা, পেট ও যৌনতার পূর্ন নিয়ন্ত্রন।

ব্রেক ছাড়া যেমন গাড়ী নির্মান ও গাড়ী রাস্তায় নামানো দূর্ঘটনার শামিল তেমনি জিহবা, পেট ও যৌনতার নিয়ন্ত্রন ছাড়া মুসলমান হওয়া অসম্ভব। রাসুল (সাঃ) বলেছেন “অধিকাংশ লোক জাহান্নামে যাবে লাগামহীন জিহবা ও যৌনতার

কারনে”।

রমজান মাসে রোজার মাধ্যমে মানুষ ট্রেনিং গ্রহন করে বাকী ১১মাস তার জীবন সুন্দর ভাবে পরিচালনা করতে শিখে। এভাবেই আমরা একজন পূর্ন মুসলিম ও রোজার প্রকৃত উদ্দেশ্য তাকওয়ার গুন অর্জন করতে পারি। আল্লাহ আমাদের

রমজান মাসকে ট্রেনিংয়ের মাস হিসেবে গ্রহন করে রোজার সেই প্রকৃত উদ্দেশ্য মুত্তাকী হওয়ার মাধ্যমে কুআনের রঙ্গে নিজেদের রঙ্গীন করার তৌফিক দান করুন। আমীন।

এসএইচ