প্যারিসে সন্ত্রাসী হামলার প্রেক্ষাপটে সেখানে অনুষ্ঠিত হয়েছে সন্ত্রাস বিরোধী বিক্ষোভ। তবে সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো এতো ঘটনার পরও নির্লজ্জের মত আবারো ফ্রান্সের ব্যাঙ্গাত্মক সাপ্তাহিক পত্রিকা শার্লি এবদো তাদের নতুন সংস্করণে মহানবী হযরত মোহাম্মদের (স.) কার্টুন ছাপাবে। মহানবীর আপত্তিকর কার্টুনের জের ধরেই সম্প্রতি সন্ত্রাসী হামলা চালানো হয়েছিল পত্রিকাটির প্যারিস কার্যালয়ে।
ফান্সের সেই বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন ইউরোপের বেশ কয়েকজন নেতা যাদের মধ্যে রয়েছেন ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন ও জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেল ও ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ।
এই নেতারা হচ্ছেন এমন সব নেতা যারা মধ্যপ্রাচ্যে সন্ত্রাসী তৎপরতায় সর্বাত্মক সহায়তা দিয়ে আসছেন। পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষকরা বলছেন, সন্ত্রাসবাদের ব্যাপারে এইসব নেতার দ্বিমুখী ও ভুল নীতি এখন বুমেরাং হয়ে দেখা দিয়েছে।
তবে সবচেয়ে বড় পরিহাসের ব্যাপার হলো প্যারিসের সন্ত্রাস-বিরোধী গণ-মিছিলে অংশ নিয়েছেন তার মধ্যে ছিলেন ফিলিস্তিনিদের শান্তির ঘুম নষ্টকারি ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু। মধ্যপ্রাচ্য ও ফিলিস্তিনসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, গণহত্যা, বর্ণবাদী হামলা এবং গুপ্তহত্যায় অভ্যস্ত ইসরাইলি নেতারা যখন শান্তির কথা বলেন তখন তা ভুতের মুখে রামনাম বা চোরের মায়ের বড় গলার মত প্রবাদ-বাক্যগুলোকেই স্মরণ করিয়ে দেয়।
এক দিকে বিশ্বের নেতারা সন্ত্রাসবিরোধী মিছিল করবেন আরেক দিকে সকল ধরনের সহিংসতার উস্কানির মদদ আবার তারাই দিবেন ব্যাপারটা খুবই হাস্যকর।ভুতের মুখে রামনাম বা চোরের মায়ের বড় গলার মত প্রবাদ-বাক্যগুলোকে আবারো আমাদের স্বরণ করিয়ে দেয় তাদের কুৎসিত কার্যকলাপ।।
চলুন দেখা যাক বুধবার ম্যাগাজিনটির যে নতুন সংখ্যা প্রকাশিত হচ্ছে তাতে কি থাকবে। মেগাজিনটির প্রচ্ছদে থাকবে মহানবীর কার্টুন। ওই কার্টুনের হাতে ধরা থাকবে 'আই এ্যাম শার্লি' বা 'আমি শার্লি' লেখা পোস্টার। এর নিচেই 'সব কিছু ক্ষমার যোগ্য' শব্দগুলো লেখা থাকবে।
এ বিষয়ে সোমবার ম্যাগাজিনের আইনজীবী রিচার্ড মালকা ফরাসি রেডিওতে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। পত্রিকার সাংবাদিক এবং কর্মচারীরা চরমপন্থিদের হামলার কাছে নিজেদের আত্মসমর্পণ করবেন না।
সন্ত্রাসবিরোধী মিছিল নিয়ে লেবাননের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়ায়েল আবু ফায়ুর বলেছেন: নেতানিয়াহু প্যারিসে সন্ত্রাসবাদ বিরোধী মিছিলের সামনের সারিতে অংশগ্রহণ করলেও সেখানে যা কম ছিল তা হলো সাবরা ও শাতিলা গণহত্যার কসাই নামে খ্যাত সাবেক ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী অ্যারিয়েল শ্যারনের আত্মাকেও জাহান্নাম থেকে ডেকে এনে এই মিছিলে যোগ দিতে বলা।
আবু ফায়ুর আরো বলেছেন: কথিত সেই ন্যায়বিচারের ওপর অভিশাপ যাতে নেতৃত্ব দেন নেতানিয়াহুর মতো মহা-অপরাধী। -টুইটারে লেখা তার এইসব মন্তব্য লেবাননসহ গোটা মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
বিভিন্ন গনমাধ্যমের খবরে দেখা যায় ইহুদিবাদী ইসরাইল সিরিয়ায় আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে কথিত জিহাদে লিপ্ত আন-নুসরা ও আইএসআইলসহ আসাদ বিরোধী সন্ত্রাসী ও গেরিলা গ্রুপগুলোকে গোয়েন্দা এবং অর্থ ও অস্ত্র সাহায্যসহ প্রকাশ্যেই সব ধরনের সহায়তা দিয়ে আসছে। এমনকি এইসব গ্রুপের সন্ত্রাসীরা যুদ্ধ-ক্ষেত্রে আহত হলে ইসরাইলি হাসপাতালগুলো তাদের চিকিৎসা সেবাও দেয়। খোদ নেতানিয়াহু কয়েকবার ইসরাইলি হাসপাতালে গিয়ে এইসব সন্ত্রাসীকে সান্ত্বনা দিয়েছেন এবং নানা গণমাধ্যমে সেসবের ছবিও প্রকাশিত হয়েছে।
আর এখন এই নেতানিয়াহু সন্ত্রাসবাদের বিরোধী হওয়ার ভান করেছেন সন্ত্রাস বিরোধী মিছিলে যোগ দিয়ে। আরো মজার ব্যাপার হলো নেতানিয়াহু ফ্রান্সের ইহুদিদেরকে নিরাপত্তার কারণে ওই দেশ ছেড়ে অধিকৃত ফিলিস্তিন তথা ইসরাইলে চলে আসার পরামর্শ দিয়েছেন! আর এ থেকে এই সন্দেহই জোরদার হচ্ছে যে, প্যারিসের সাম্প্রতিক হামলায় ইসরাইলেরও হাত রয়েছে।
এছাড়া কিছুদিন পরপরই গনমাধ্যমে দেখা যায় আমেরিকা বিমান থেকে ইরাক ও সিরিয়ার জঙ্গি সংঘঠন 'আইএসআইএল' কে বিমান থেকে অস্ত্র ফেলে সহায়তা করা হচ্ছে।
ফ্রান্সের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ডমিনিক দ্য ভিল্লিপিন বিশ্বে সন্ত্রাসবাদ বহুগুণ বেড়ে যাওয়ার জন্য পাশ্চাত্যের দেশগুলোর পররাষ্ট্রনীতিকেই দায়ি করেছেন।
তিনি আইএসআইএল-কে পশ্চিমা পররাষ্ট্রনীতির ফসল হিসেবে জন্ম নেয়া 'বিকৃত আকৃতির শিশু' বলে অভিহিত করেন।
ভিল্লিপিন বলেছেন, আগে সন্ত্রাসীরা ছিল আফগানিস্তানেই কেন্দ্রীভূত। কিন্তু ইরাকে ও আফগানিস্তানে পাশ্চাত্যসহ মার্কিন সরকারের হামলা ও বহু বছরের দ্বিমুখী-নীতির কারণে সন্ত্রাস এখন মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বহু অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে।
বিশ্বে শান্তি ও সন্ত্রাসবাদ সম্পর্কে নেতানিয়াহু ও তার সহযোগী পশ্চিমা নেতাদের বক্তব্য বা নীতি দেখে যে কেউ স্মরণ করতে পারেন একজন বিখ্যাত বাঙ্গালী কবির এই কবিতার পংক্তিটি:
'অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ,
যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশী আজ চোখে দেখে তারা;
যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই, প্রীতি নেই, করুণার আলোড়ন নেই
পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।'
সর্বশেষ একটা কথাই আমাদের বুঝতে হবে 'সন্ত্রাসবিরোধী মিছিল' আর 'ভুতের মুখে রামনাম' বা 'চোরের মায়ের বড় গলা' একই জিনিস।
ইআর





