আমাদের দেশে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত সম্প্রদায় যারা রাজনীতির সঙ্গে জড়িত এবং যারা সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত না হলেও মোটমুটি সচেতন নাগরিক তারা আলেমদেরকে সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বহির্ভূত অজ্ঞ-অসামাজিক লোক মনে করে অনেকটা অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখে থাকেন।

তারা আলেম সম্প্রদায়ের অতীত গৌরবোজ্জ্বল কীর্তির ইতিহাস জানেন না। সাম্প্রতিককালে আলেম সমাজ সামাজিক, রাজনৈতিক, শিক্ষা ও সংস্কৃতি অঙ্গনে কোথাও তেমন সক্রিয় দেখা যাচ্ছে না। তারা নানা মতে নানা পথে বিচ্ছিন্ন ও দুর্বল হয়ে রয়েছেন।

কিন্তু অতীতে উপমহাদেশের আলেমদের ধর্মীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক অঙ্গনে যে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা ছিল তা খুবই চমকপ্রদ ও উল্লেখযোগ্য। তখন তাঁরা ধর্ম প্রচার, ধর্ম সংস্কারের পাশাপাশি মানব কল্যাণ ও সামাজিক হিত সাধনে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন।

এটি অনস্বীকার্য যে, আলেম সমাজ বঙ্গবিভাগ আন্দোলন থেকে শুরু করে প্যান ইসলামী আন্দোলন, খিলাফত আন্দোলন, আইন অমান্য আন্দোলন ও উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রত্যেকটিতে অংশগ্রহণ করেন এবং সাধারণ জনগণকে ধর্মীয় প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ করার প্রয়াস চালিয়েছেন।

ধর্ম প্রচার, ধর্ম সংস্কার, রাজনৈতিক ক্রিয়াকর্ম, আইন প্রণয়ন ও রাষ্ট্র পরিচালনায় বাংলার আলেম সমাজের অনবদ্য ভূমিকা রয়েছে এবং বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁদের সংস্কারমূলক কাজ প্রশংসনীয়।

মুসলিম সমাজের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ঘটনা এবং কখনো কখনো প্রতিবেশী সম্প্রদায়ের ব্যাপক সাম্প্রদায়িক প্রভাব উপেক্ষা করে তাঁরা স্বসমাজে সৃষ্ট আলোড়ন অভিঘাতের মুখোমুখি হয়েছেন অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে।

জাতীয় জীবনের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাথেই এ দেশের রাজনীতিকদের পাশাপাশি আলেম সমাজও সম্পৃক্ত থেকেছেন। সে সময়ের শাসকবর্গের কঠোর নির্যাতন ও নিপীড়ন উপেক্ষা করে মুসলিম সমাজকে অগ্রগামী করার জন্য তাঁরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। তখন আলেম সমাজ ঐক্যবদ্ধ হয়ে ধর্ম ক্ষেত্রে যেমন দিশারীর ভূমিকা পালন করেছেন।

তেমনি রাজনীতি ও সামাজিক ক্ষেত্রেও নেতৃত্ব দিয়েছেন, ‘তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকতে হবে, যারা কল্যাণের দিকে (মানুষকে) ডাকবে এবং অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখবে’।

আল কুরআনের এই মর্মানুসারে তাঁরা রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্রিয়াকর্মকে ধর্মীয় দায়িত্ব মনে করেন এবং ধর্মীয় নেতৃত্বের পাশাপাশি দেশের আইন প্রণয়ন, রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণ, দলীয় ও নির্দলীয় রাজনৈতিক মতামত সৃজন আর শিক্ষা সংস্কৃতির বিকাশ সাধনেও কাণ্ডারির ভূমিকায় অবতীর্ণ হন এবং সমাজের অন্যান্য শ্রেণীর তুলনায় তাঁরা অধিকতর কারা নির্যাতন ভোগ করেন।

বাংলার আলেম সমাজের রাজনৈতিক ইতিহাসে যথেষ্ট সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড রয়েছে। তাঁরা আনজুমান-এ-ওয়ায়েজীন, আনজুমান-এ-উলামা-এ-বাংলা, বঙ্গীয় খিলাফত কমিটি, জমিয়ত-এ-উলামা-এ-বাংলা ও আসাম ইত্যাদি গঠন করে ধর্মপ্রচারের পাশাপাশি রাজনৈতিক জনমত সৃষ্টির কাজ করেন।

মাওলানা আবু বকর সিদ্দিকী (র.) প্রতিষ্ঠিত (১৯৩৬) জমিয়ত-এ-বাংলা ও আসাম’ ১৯৩৭ সালের সাধারণ নির্বাচনে মুসলিম লীগকে সমর্থন দিয়ে একদিকে বাংলার মুসলিম লীগ মন্ত্রিসভা গঠনে সহায়তা করেন।

অন্যদিকে লাহোর প্রস্তাব (১৯৪০) তথা মুসলিম রাষ্ট্রের ভিত রচনার প্রক্রিয়ায় মুসলিম জাতির পরিপোষকতা করেন। এই জমিয়ত পরবর্তী সময় মাওলানা আবু বকর সিদ্দিকীর জ্যেষ্ঠ পুত্র মাওলানা আবদুল হাই সিদ্দিকীর নেতৃত্বে পাকিস্তান আন্দোলনে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে।

জমিয়ত-এ-উলামা-এ-ইসলাম (১৯৪৫) ছিল জাতীয়তাবাদী ও কংগ্রেসপন্থী জমিয়ত-এ-উলামা-এ- হিন্দু এর বিকল্প একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। এর কর্ম তৎপরতার সামনে পাকিস্তান বিরোধী দেওবন্দী অদেওবন্দী জাতীয়তাবাদী আলেমদের কর্মতৎপরতা স্তব্ধ হয়ে পড়ে।

আলেম সমাজ কেবল সাংগঠনিক রাজনীতি করে বা বক্তৃতা বিবৃতি দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, সাংবাদিকতার মাধ্যমেও তাঁরা ধর্মীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক জনমত সৃষ্টির প্রয়াস পালন বাংলার আলেমদের মধ্যে সাংবাদিকতার ময়দানে সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হন যথাক্রমে মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী ও মাওলানা হাকীম হাবীবুর রহমান।

কিন্তু পীর মুর্শিদ শ্রেণীর মধ্যে ইসলামী সাংবাদিকতার অঙ্গনে সর্বপ্রথম পদার্পণ করেন ফুরফুরার পীর মাওলানা আবু বকর সিদ্দিকী (র.)। মুসলিম বাংলায় যাতে ইসলামী সাময়িকী প্রতিষ্ঠা ও প্রসার লাভ করে, সেই উদ্দেশ্যে তিনি আজীবন প্রচেষ্টা চালিয়ে যান।

মোসলেম হিতৈষী, ইসলাম দর্শন, হানাফী, শরিয়ত, শরিয়তে ইসলাম, সুন্নাত আল জামায়াত, হেদায়াত, মোসলেম প্রভৃতি পত্রিকার সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। এগুলোর মধ্যে কয়েকটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনি নিজে।

ইসলামী সাংবাদিকতার প্রতি তাঁর পৃষ্ঠপোষকতা কেবল ইসলাম প্রচারেই সহায়তা করেনি উলামা সম্প্রদায়ের সংস্কারের প্রেরণা, স্বাতন্ত্র্যবোধ, সামাজিক ঐক্য এবং রাজনৈতিক চিন্তাচেতনা জাগ্রত করে।

এই দিকগুলোর নিরিখে নির্দ্বিধায় বলা চলে যে, বাংলার ইসলাম প্রচার, রাজনৈতিক ক্রিয়াকর্ম, আইন-প্রণয়ন ও রাষ্ট্র পরিচালনায় আলেম সমাজের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। আমাদের ইতিহাসে আলেম সমাজের এই অধ্যায়টি এখনো আনালোচিত রয়ে গেছে।

হাজী শরীয়তুল্লাহ

ঊনিশ শতকে বাংলার রাজনীতিতে আলেম সমাজ সর্বপ্রথম ফরায়েজী আন্দোলনের মাধ্যমে সক্রিয় হয়ে উঠেন। এই আন্দোলনের উদগাতা ছিলেন মাওলানা হাজী শরীয়তুল্লাহ (১৭৮০-১৮৪০)।

ফরিদপুরে এ আন্দোলন শুরু হয়। ধীরে ধীরে ঢাকা, কুমিল্লা, নোয়াখালী, মোমেনশাহী, টাঙ্গাইল, জামালপুর, নেত্রকোনা, বরিশাল ও খুলনা জেলায় বিস্তৃতি লাভ করে।

শরীয়তুল্লাহ এই উপমহাদেশকে ‘দারুল হরব’ (শত্রু দেশ) মনে করতেন। এখানে ইসলামী শাসন কায়েম নেই এই ধর্মীয় যুক্তিতে তিনি এবং তাঁর নেতৃবৃন্দ বাংলার ফরায়েজী প্রধান অঞ্চলে মুসলমানদের জুমা ও ঈদের নামাজ থেকে বিরত রেখেছিলেন।

এ দেশকে ‘দারুল হরব’ ঘোষণা করা এবং জুমা ও ঈদের নামাজ বন্ধ করার পেছনে এটা বুঝানো তাদের উদ্দেশ্য ছিল যে, এ দেশ পরাধীন। পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে এ দেশ আজাদ মুসলিম রাষ্ট্রে পরিণত করতে হবে।

দেশ ব্রিটিশ মুক্ত হওয়ার পূর্বক্ষণ পর্যন্ত ফরায়েজীরা জুমা ও ঈদের নামাজ থেকে বিরত ছিলেন। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হলে তাঁরা আবার জুমা ও ঈদের নামাজ পড়া শুরু করেন। শরীয়তুল্লাহ আমৃত্যু দীর্ঘ ২২ বছর (১৮১৮-১৮৪০) এ আন্দোলন পরিচালনা করেন।

তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র মুহসিনুদ্দীন (দুদু মিয়া) এ আন্দোলনের হাল ধরেন। তিনিও দীর্ঘ ২২ বছর এই দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর সময়ে ফরায়েজী আন্দোলন চরমে ওঠে। ব্রিটিশ মদদপুষ্ট জমিদার ও ইংরেজ নীলকর সাহেবদের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ বাঁধে। সত্যিকার অর্থে তা কৃষক প্রজা আন্দোলনে রূপ ধারণ করে।

দুদু মিয়া ঘোষণা করেন যে, জমির মালিক আল্লাহ, তাই সরকার ছাড়া জমিদার বা তালুকদারদের খাজনা আদায়ের অধিকার নেই। তিনি তাঁর অনুসারীদের এলাকায় ব্রিটিশ কোর্টের পাশাপাশি নিজস্ব কোর্ট স্থাপন করেন। ১৮৫৭ সালে সিপাহী অভ্যুত্থানের সময় ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাবের জন্য তিনি গ্রেফতার হন এবং ১৮৫৯ সালে মুক্তি লাভ করেন।

দুদু মিয়ার মৃত্যুর পর তাঁর বড় পুত্র গিয়াস উদ্দীন হায়দার ফরায়েজী আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। ১৮৬৪ সালে তাঁর মৃত্যুর পর দুদু মিয়ার দ্বিতীয় পুত্র আবদুল গফুর ওরফে নয়ামিয়া আন্দোলনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি ১৮৮৪ সাল পর্যন্ত নেতৃত্ব দেন।

তাঁর মৃত্যুর পর দুদু মিয়ার তৃতীয় পুত্র খান বাহাদুর সাঈদুদ্দীন আহমদ নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং ১৯০৬ সাল পর্যন্ত ২২ বৎসর দায়িত্ব পালন করেন। সাঈদুদ্দীনের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র রশীদুদ্দীন (বাদশা মিয়া) ফরায়েজী আস্তনার গদীনশীন নিযুক্ত হন। তিনি আমৃত্যু (১৯৫৯) ফরায়েজীদের নেতৃত্ব দান করেন।

ফারায়েজী আন্দোলনে যারা সহযোগিতা করেছিলেন, তন্মধ্যে মাওলানা আবদুল জব্বার, মৌলবী সানাউল্লাহ, মৌলবী কফীল আহমদ ও মৌলবী আবদুল হাই প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য। তাঁরা সবাই বিশিষ্ট ধর্মবেত্তা ছিলেন।


১৯২৬ সালে সৈয়দ আহমদ শহীদ বেরেলভী (১৭৮৬-১৮৩১) পাঞ্জাবের শিখযুদ্ধে রওনা হলে তাঁর খলিফা মাওলানা শরাফত আলী জৌনপুরী তাঁর নিকট ঐ জিহাদে যোগদানের অনুমতি প্রার্থনা করলে সৈয়দ সাহেব তাঁকে বাংলাদেশে-জিহাদের বাণী প্রচারের নির্দেশ দেন।
জীবনের শেষ মুহূর্ত (রংপুর ১৮৭৩) পর্যন্ত তিনি মুর্শিদের নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন। ৫১ বছরেরও বেশি সময় ধরে (১৮২২-১৮৭৩) তিনি এই দেশে জিহাদের বাণী প্রচার, ইসলামী শরীয়তের শিক্ষাদান, ইসলামী আচার-আচরণ ও ইসলামী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার কাজে নিয়োজিত থাকেন।

মাওলানা শাহ আবদুল আজিজ (১৭৪৬-১৮২৪) ১৮০৩ সালে ভারতকে দারুল হরব’ বলে ফতোয়া দেন। তাঁর প্রতিনিধি সৈয়দ আহমদ শহীদ অনুরূপ ঘোষণা দেন ১৯১৮ সালে।

পরবর্তী সময় কলকাতা মাদরাসার প্রধান শিক্ষক মাওলানা মুহাম্মদ ওজীহ (মৃত্যু ১৮৬৪) কলকাতার প্রধান কাজী ফজলুর রহমান, সৈয়দ আহমদ শহীদের পাটনাস্থ খলিফা মাওলানা বিলায়ত আলী (মৃত্যু ১৮৫২) ফরায়েজী নেতা হাজী শরীয়তুল্লাহ ও দুদু মিয়া প্রমুখ সেই ধারা জিইয়ে রাখার প্রয়াস পান।

বাংলার মুসলমান স্বভাবতই এবং চিরাচরিতভাবেই ধর্মপ্রাণ ও রাজনীতি সচেতন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় তাঁরা ধর্মের জন্য যেকোনো ত্যাগ স্বীকার করতে পারে। সকল ধর্মীয় আন্দোলনেও আজাদী সংগ্রামে তারা এই প্রেরণার প্রমাণ দিয়েছেন।

স্বভাবতই তাঁদের অনেকে সৈয়দ আহমদ (র.) এর ইংরেজ শিখ বিরোধী জিহাদ আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ হয়ে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। এদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন বিশিষ্ট আলিম। সৈয়দ সাহেব হজ্বব্রত উপলক্ষ্যে মক্কা শরীফের পথে কলকাতা দ্বিতীয় বার আগমন করেন ১৯২২ সালের অক্টোবরে। ঐ সময় তিনি তিন মাস কলকাতায় অবস্থান করেন।

তখন তাঁর অনেক ভক্ত বাংলার বিভিন্ন জেলা থেকে তাঁর সাক্ষাৎ লাভের উদ্দেশ্যে কলকাতা এসে উপস্থিত হন। এ সময়ে তাঁর মুরিদ ও খলিফা চট্টগ্রামের মাওলানা শাহ সুফী নূর মোহাম্মদ নিজামপুরী (র.) (মৃত ১৮৫৮) নোয়াখালীর মাওলানা ইমামুদ্দীন (র.) ১৭৮৮-১৮৫৭) ও ঢাকার মাওলানা আব্দুল্লাহকে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে তাঁর সমাজ সংস্কার ও জিহাদের বাণী প্রচারের জন্য নিয়োগ করেন।

পরবর্তী সময় ইংরেজ শিখ যুদ্ধে (১৮২৬-৩১) সুফী নূর মোহাম্মদ নিজামপুরী ও ইমামুদ্দীন সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। বালাকোট যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে নিযামপুরী গাজী হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। তাঁর ভাই আলীমুদ্দীন শহীদ হন।

সৈয়দ আহমদ শহীদের প্রতিনিধিরূপে তাঁর শূদ্ধি ও সংস্কার অভিযান পরিচালনা কালে ১৮৩০ সালে তিতুমীরের চব্বিশ পরগনার হিন্দু জমিদার ও নীলকর সাহেবদের সাথে সংঘর্ষ বাঁধে।

তিতুমীরের অনুসারীদের মধ্যে সাম্য ও ঐক্যবোধ লক্ষ্য করে হিন্দু জমিদার ও মহাজনগণ শঙ্কিত হন। তারা মনে করেন এই আন্দোলন কৃষক শ্রমিকদের মধ্যে বিস্তার লাভ করলে তাদের কায়েমী স্বার্থ বিপন্ন হবে।

তাই তারা তিতুমীরের শক্তিকে নস্যাৎ করার পথ বেছে নেন। অল্পদিনের মধ্যে জমিদার ও নীলকরদের সম্মিলিত শক্তির সাথে তাঁর সংঘর্ষ বাঁধে। তিতুমীর অনেক স্থানে জয়লাভ করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জমিদার ও নীলকররা তিতুমীরের বিরুদ্ধে শান্তিভঙ্গ ও দেশদ্রোহীর অভিযোগ আনেন এবং সরকারকে তাঁর বিরুদ্ধে পুলিশ ও সামরিক অভিযান পরিচালনার জন্য প্ররোচিত করেন।

তিতুমীর ও তাঁর দলকে শায়েস্তা করার জন্য গভর্নমেন্ট দুই কনটিনজেন্ট পুলিশ প্রেরণ করেন। তিতুমীর ও তাঁর বাহিনী তাদেরকে বিতাড়িত করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত লর্ড বেন্টিংক কর্তৃক ১৮৩১ সালের ১৯ নভেম্বর কলকাতা থেকে নারকেলবাড়িয়ায় সামরিক বাহিনী প্রেরিত হয়।

তিতুমীর ও তাঁর বাহিনীকে তছনছ করে দেয়। ইসলামী জোস-শক্তি থাকা সত্ত্বেও ব্রিটিশ শক্তির মুকাবেলায় তিতুমীর কুলিয়ে উঠতে পারেননি। তাঁর বাঁশের কেল্লাকে কামানের গোলায় উড়িয়ে দেয়। অধিকাংশ সহচরসহ তিনি শাহাদাতবরণ করেন। জিহাদ আন্দোলনে তিতুমীর বাংলার প্রথম শহীদ আর সৈয়দ আহমদ হলেন উপমহাদেশে প্রথম শহীদ।


‘বঙ্গবিভাগ’ ও ‘বঙ্গবিভাগরদ’ এ দু’টি ঘটনা ছিল বিশ শতকে উপমহাদেশের সুদূরপ্রসারী রাজনীতির গতিধারায় একটি প্রারম্ভিক মাইলফলক। এর ফলে হিন্দু ও মুসলিম জাতির মধ্যে পরস্পর বিরোধী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় এবং উভয় জাতির রাজনীতি দু’টি পৃথক ধারায় প্রবাহিত হয়।

সত্যিকার অর্থে ১৯০৬ সালে মুসলিম জাতির সর্বভারতীয় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান মুসলিম লীগ গঠিত হওয়ার পরেই তাদের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনা জেগে ওঠে।

বাংলার যে সকল আলেম স্যার সৈয়দ আহমদ, নওয়াব আবদুল লতিফ, সৈয়দ আমীর আলী, নওয়াব সলিমুল্লাহ, নওয়াব নবাব আলী চৌধুরী, নওয়াব শামসুল হুদা প্রমুখের রাজনীতি ক্ষেত্রে মুসলিম স্বাতন্ত্র্যে বিশ্বাসী এবং বঙ্গ বিভাগের মধ্যে পূর্ব বাংলার মুসলিম জনসাধারণের স্বার্থ নিহিত আছে বলে মনে করতেন।

তারা বঙ্গবিভাগ সমর্থন করেন এবং অনেকে এ ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকাও পালন করেন। এদের মধ্যে মাওলানা হাকীম হাবীবুর রহমান, মাওলানা পীর বাদশা মিঞা, মাওলানা আবদুল হাই আখতার, মৌলবী শামসুল হুদা, মাওলানা নঈম উদ্দীন, মাওলানা আবুল নসর ওহীদ ও মাওলানা আবদুল আউয়াল জৌনপুরীর নাম উল্লেখযোগ্য।

হাকীম হাবীবুর রহমান ছিলেন (১৮৮১-১৯৪৭) পূর্ব বাংলার অন্যতম প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবী রাজনৈতিক। বাংলাদেশের মুসলিম রেনেসাঁ আন্দোলন, স্বতন্ত্র রাজনীতি ও মুসলিম জাতীয়তাবাদ প্রসারণে তাঁর অবদান অসামান্য।

তিনি ঢাকা নওয়াব পরিবারের চিকিৎসক ছিলেন। সেই সুবাদে নওয়াব সলিমুল্লাহর ঘনিষ্ঠ সাহচর্য লাভ করে তাঁর মুসলিম জাতীয়তাভিত্তিক রাজনীতিতে উদ্বুদ্ধ হন এবং চিকিৎসা পেশার পাশাপাশি পূর্ব বাংলার রাজনীতি, সাংবাদিকতা ও শিক্ষা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

তিনি সলিমুল্লাহ বঙ্গবিভাগ কেন্দ্রীক রাজনীতি এবং তাঁর ধর্মীয় লোকায়ত শিক্ষার সমন্বয় সাধনকারী আধুনিক শিক্ষা আন্দোলনকারীদের অন্যতম প্রধান দোসর ছিলেন। পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ সৃষ্টির ফলে এখানকার মুসলিম সমাজে প্রাণচাঞ্চল্য জাগে।

পূর্ববাংলা ও আসামের অনুন্নত মুসলিম সমাজ শিক্ষাদীক্ষা, অর্থসম্পদ, চাকরি-বাকরি ও প্রশাসন ক্ষেত্রে হিন্দুদের সমতালে উন্নতি লাভ করুক এটাই ছিল তাঁর কাম্য। এই লক্ষ্য সামনে রেখে মুসলিম লীগ গঠিত হওয়ার পূর্বেই হাকীম সাহেব ঢাকা থেকে ‘আল মাশরিক’ নামক একটি মাসিক উর্দু পত্রিকা প্রকাশ করেন।

প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত তিনিই ছিলেন তার সম্পাদক। নওয়াব সলিমুল্লাহ ছিলেন এর পৃষ্ঠপোষক। পত্রিকাটি বলিষ্ঠ ভাষায় বঙ্গবিভাগ সমর্থন করে এবং মধ্যবিত্ত হিন্দু বুদ্ধিজীবীদের বঙ্গবিভাগ বিরোধী আন্দোলনের অযৌক্তিকতা ও কংগ্রেস সমর্থিত হিন্দু তরুণদের সন্ত্রাসমূলক কর্মের অশুভ পরিণতির কথা তুলে ধরেন।

ফুরফুরার স্বনামধন্য শ্রেষ্ঠ আলেম মাওলানা আবু বকর সিদ্দিকী (১৮৫৮-১৯৩৯) বঙ্গবিভাগের অকুণ্ঠ সমর্থক ছিলেন। টাঙ্গাইলের সুরুজ গ্রামের মৌরবী নঈমউদ্দীন একজন বিশিষ্ট আলেম ছিলেন।

তিনি অনেক মৌলিক গ্রন্থ রচনাসহ বহু ফারসি গ্রন্থ অনুবাদ করেন। বাদশাহ আলমগীরের তত্ত্বাবধানে ৭০০ আলিম কর্তৃক ফারসি ভাষায় প্রণীত বিখ্যাত ‘ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী’ গ্রন্থের বঙ্গানুবাদ তিনি ৪ খণ্ডে সমাপ্ত করেন (১৮৮৪)। তাঁর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কীতি হলো ৩ খণ্ডে বাংলায় অনূদিত ‘কুরআন শরিফ’ (১৮৮৭-১৯০৮)।

মাওলানা মনিরুজ্জামান এছলামাবাদী (১৮৭৫-১৯৫০) জাঁদরেল আলেম ছিলেন। আজীবন তিনি কংগ্রেসী ভাবাপন্ন ও অখণ্ড ভারতীয় জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা ছিলেন। তিনি মহাকবি ইসমাইল হোসেন শিরাজীর অন্তরঙ্গ বন্ধু ও সাথী ছিলেন।

১৯০৩ সাল থেকে জীবনের শেষ অধ্যায় পর্যন্ত বাংলার প্রায় সকল প্রতিষ্ঠানে জড়িত থেকে জনকল্যাণমূলক বহু কাজ করেছেন। তাঁর কর্মশক্তি, স্বদেশপ্রেম ও রাজনৈতিক জ্ঞান ছিল অসাধারণ।

সারাজীবন অগ্রগামী ন্যাশনালিস্ট রূপে গণ্য হলেও ইসলাম ও মুসলিম স্বার্থ তিনি ষোলআনা আদায় করার চেষ্টা করেছেন। ১৯০২ সালে তিনি কলকাতা থেকে বিখ্যাত সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘ছোলতান’ প্রকাশ করেন।

মাওলানা ইসলামাবাদী প্যান ইসলামী আন্দোলনের সমর্থক। জালালুদ্দীন আফগানীর (১৮৩৯-১৮৯৭) প্যান ইসলামী আন্দোলনের সহযোগী আগা মুঈনুল ইসলাম (১৮৬৩-১৯৩০) ইরানে পালিয়ে এসে এ দেশে রাজনৈতিক আশ্রয় গ্রহণ করেন।

১৮৯৩ সালে তিনি কলকাতা থেকে ‘হাবলুল মতীন’ নামে একটি ফারসি পত্রিকা প্রকাশ করেন। বলকান যুদ্ধ চলাকালে (১৯১১-১৯১৩) মাওলানা ইসলামাবাদীর সম্পাদনায় বাংলা দৈনিক ‘হাবলুল মতীন’ কিছুকাল প্রকাশিত হয়।

এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ইটালির আক্রমণে পর্যুদস্ত তুরস্ক ও তুর্কী খলিফার সহায়তা করা। বলকান যুদ্ধে মহাকবি ইসমাইল হোসেন শিরাজী অংশগ্রহণ করে বাংলাদেশের গৌরব বৃদ্ধি করেন।

চব্বিশ পরগনার বশিরহাট মহকুমার অন্তর্গত হাকীমপুর গ্রামের মাওলানা মুহাম্মদ আকরম খাঁ (১৮৬৯-১৯৬৮) ছিলেন শ্রেষ্ঠ আলেম, মুসলিম বাংলার নবজাগরণের অন্যতম প্রধান দিশারী, ত্যাগী ও নিষ্ঠাবান রাজনীতিবিদ জিন্নাহ সাহেবের সহকর্মী, সাংবাদিকতার দিকপাল ও প্রখ্যাত সাহিত্যিক।

ঢাকায় অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত মুসলমান শিক্ষা সম্মেলন (২৭-২৯ ডিসেম্বর ১৯০৬) যোগদানের মাধ্যমে তাঁর জাতীয় চেতনার উন্মেষ ঘটে। ঐ সম্মেলন শেষে ৩০ ডিসেম্বর মুসলিম নেতৃবৃন্দের যে সভায় ‘নিখিল ভারত মুসলিম লীগ’ গঠিত হয়।

তাতে অংশগ্রহণ করে তিনি মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হন। তিনি বিভিন্ন সভা-সমিতিতে বক্তৃতা দিয়ে স্বদেশী দ্রব্য ব্যবহারের জন্য দেশবাসীকে আহ্বান জানান। ঐ সময় জনগণের মধ্যে তাঁর অসাধারণ বাগ্মিতা পরিস্ফূট হয়ে ওঠে।

মুসলিম বাংলার ধর্মীয় তথা সামাজিক উন্নতিকল্পে একটি মুখপত্রের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে তিনি কলকাতা থেকে ‘সাপ্তাহিক মোহাম্মদী’ প্রকাশ করেন।

এই সাপ্তাহিক মোহাম্মদী মাওলানা মুহাম্মদ আলী প্রতিষ্ঠিত ইংরেজি ‘সাপ্তাহিক কমরেড’ (কলকাতা-১৯২১) ও মাওলানা আবুল কালাম আযাদ প্রকাশিত ঊর্দু ‘সাপ্তাহিক আল হেলাল’ (১৯১২) এর সাহচর্য লাভ করে অদম্য উৎসাহ নিয়ে লক্ষ্যপানে অগ্রসর হয়।

ব্রিটিশ সরকার ঘোষণা করেছিলেন বঙ্গবিভাগ একটি স্থায়ী সিদ্ধান্ত। কিন্তু তারা সেই ওয়াদা ভঙ্গ করেন। কংগ্রেসীদের প্রবল বিরোধিতা এবং এক শ্রেণীর হিন্দু তরুণদের সন্ত্রাসমূলক কর্মকাণ্ডের ফলে ব্রিটিশ গভর্নমেন্ট স্বয়ং পঞ্চম জর্জ ১৯১১ সালে ১২ ডিসেম্বর দিল্লির দরবারে বঙ্গভঙ্গরদ ঘোষণা করেন।

মাওলানা মুহাম্মদ আলী মুসলমানদের রাজনৈতিক অধিকার ও জাতীয় ভাবধারা তাঁর কমরেড পত্রিকার পাতায় পাতায় তুলে ধরেন। তিনি সদ্য প্রতিষ্টিত সংগঠন মুসলিম লীগ এর বিরুদ্ধে হিন্দুদের অভিযোগ খণ্ডন করতে থাকেন বঙ্গভঙ্গ রদ ঘোষণার পর তিনি ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের ওয়াদা ভঙ্গের তীব্র নিন্দা করেন।

মাওলানা আবু বকর সিদ্দিকী (র.) ছিলেন সমাজ ও রাজনীতি সচেতন বিশিষ্ট ব্যক্তি। তিনি বাংলার আলেমগণকে সুনিয়ন্ত্রিত ও সংঘবদ্ধ করতে মনস্থ করেন।

তাঁর পরামর্শে ‘মিহির ও সুধাকর’ (১৮৯৫-১৯১০) সম্পাদক মুনশী শেখ আবদুর রহীম ও অপর কতিপয় সমাজসেবকের চেষ্টায় ১৯১১ সালের ২২ জানুয়ারি কলকাতার গ্রীয়ার পার্কের এক সভায় আঞ্জুমান-এ-ওয়ায়েজীন প্রতিষ্ঠা লাভ করে। মাওলানা আবু বকর স্বয়ং এর আজীবন সভাপতি ছিলেন।

আনজুমানের উদ্দেশ্য ছিল আলেমগণের মাধ্যমে শরাশরীয়ত প্রচার করা, খাঁটি ইসলামী রীতিনীতি শিক্ষা দেয়া। কিন্তু এর মধ্যে একটা সামাজিক ও রাজনৈতিক চরিত্রও ছিল। আনজুমানের উদ্দেশ্য পত্রিকায় প্রচার করা হতো।

এ পত্রিকার অধীনে যথেষ্ট সংখ্যক অনারারি প্রচারক ছাড়াও ১২/১৩ জন বেতনভুগী স্থায়ী প্রচারক ছিলেন। তারা সারাদেশের গ্রামে গ্রামে ঘুরে মকতব-মাদরাসা স্থাপন, ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য সালিসী বোর্ড গঠন, সংবাদপত্র প্রচার, সামাজিক দ্বন্দ্ব কলহের মীমাংসা, মামলা-মোকদ্দমা নিষ্পত্তি, বায়তুলমাল স্থাপন, যুব সমিতি গঠন ইত্যাদি জনহিতকর কাজে লোকদের উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করতেন।

১৯১৫ সালের এপ্রিল-মে মাসে আনজুমান-এ-উলামা-এ-বাংলার মাসিক মুখপত্র ‘আলইসলাম’ প্রকাশিত হয়।

মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী ছিলেন এর সম্পাদক। ড. মুহাম্দ শহীদুল্লাহ, মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ, মাওলানা মোহাম্মদ আব্দুল্লাহেল বাকী, মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী, মাওলানা ফররুখ আহমদ, নিযামপুরীর ন্যায় নামজাদা লেখকদের ধর্ম, সংস্কৃতি, শিক্ষা, রাজনীতি, বাংলাভাষা ও মুসলিম জাতির ইতিহাস, মুসলিম ব্যক্তিত্ব, ইসলামী দর্শন, বিজ্ঞান, সাধারণ জ্ঞান ইত্যাদি বিষয়ক রচনা এতে প্রকাশিত হয়।

মুসলিম জাতীয়তাবাদ, মুসলিম ঐক্য, মুসলিম রাজনীতির বিকাশ সাধনে আনজুমান-এ-উলামা-এ-বাংলা ও এর মুখপত্র ‘আল ইসলাম’ এর ভূমিকা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

১৯১৮ সালের নভেম্বরে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অবসান হয়। সে বছর অক্টোবরে তুরস্ক মিত্র শক্তির কাছে পরাজিত হয়েছিল।

কনস্টানটিনোপল তাদের হাতছাড়া হয় এবং তারা যুদ্ধবিরতি আবেদন করে। যুদ্ধ শেষে ব্রিটিশ গভর্নমেন্টভুক্ত মিত্রশক্তি তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে তুরস্ক থেকে কেড়ে নেয়া অঞ্চলগুলো নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে নেয়।

তখন তুরস্ক রাজ্য মুসলিম ভারতের ধর্মীয় নেতৃত্বের আশা-ভরসার স্থল তথা খিলাফতের প্রাণকেন্দ্র। ভারতীয় মুসলমানরা ভাবলেন, তুরস্কর শক্তি ও স্বাধীনতা ছাড়া খিলাফত টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। এই চিন্তার বশবর্তী হয়ে মুসলিম নেতৃবৃন্দ ভারতে একটি খিলাফত কমিটি গঠন করতে মনস্থ করেন।

১৯১৯ সালের জুলাই মাসে ফিরিঙ্গি মহলের মাওলানা আবদুল বারী (১৮৭৮-১৯৬২) দিল্লির হাকীম আজমল খান (১৮৬৩-১৯২৮) ও বোম্বের অর্থশালী ব্যবসায়ী শেঠ জান মুহাম্মদ ছোটনীর উদ্যোগে লখনৌতে কেন্দ্রীয় খিলাফত কমিটি গঠিত হয়।

অবশ্য এর পূর্বেই শেঠ ছোটনীরসহ বোম্বের ব্যবসায়ীরা ‘খিলাফত মজলিশ’ নামে একটি সমিতি করেছিলেন। যা দ্বিতীয় পর্যায়ে কেন্দ্রীয় খিলাফত কমিটির নাম ধারণ করে। সারা উপমহাদেশে এর শাখা গঠিত হয়।

খিলাফত কমিটির বাংলা শাখার সহসভাপতি, সেক্রেটারি ও সহসেক্রেটারি ছিলেন যথাক্রমে মাওলানা মনিরুজ্জামান ইছলামাবাদী, মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ ও সৈয়দ মজিদ বখশ। বঙ্গীয় ও কলকাতা খিলাফত কমিটির প্রেসিডেন্ট ছিলেন মাওলানা আবুল কালাম আজাদ।

খিলাফত আন্দোলন মাওলানা আকরম খাঁর জীবনে বয়ে আনে নব প্রেরণার জোয়ার। এতে তিনি সক্রিয় ও সংগ্রামী ভূমিকা পালন করেন। এ আন্দোলনকে জোরালো করার উদ্দেশে তিনি মাওলানা মুহাম্মদ আলী ও শওকত আলীর সহকর্মী হিসেবে সারা ভারত সফর করেন। এ সময়ে তিনি বাংলাদেশ খিলাফত কমিটির প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন।

তিনি বঙ্গীয় কংগ্রেস কমিটি, নিখিল ভারত খিলাফত কমিটি, নিখিল ভারত মুসলিম লীগ প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষস্থানীয় কর্মীরূপে খ্যাতি অর্জন করেন।

মুসলিম সাহিত্যিকদের মধ্যে রাজনৈতিক সংগ্রামের কারণে সর্বপ্রথম কারাবরণ করেন ইসমাঈল হোসেন শিরাজী (১৯১০)। তারপর জেল ভোগ করেন মাওলানা আকরম খাঁ (১৯২১)-এ দু’জন সংগ্রামী সাহিত্যিকের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম (১৯২৩)।

এরা শিক্ষা দিয়ে গেলেন যে, সাহিত্য মানসিক বিলাসিতার নাম নয়, তার চরম ও পরম লক্ষ্য হলো জীবন সংগ্রামে বিজয় অর্জন।

মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী (১৮৮০-১৯৭৬) ১৯১৯ সালে কংগ্রেস ও খিলাফত আন্দোলনে যোগ দিয়ে আসামের জোরহাটে দশ মাস কারাদণ্ড ভোগ করেন। সিলেটের মৌলভী রিয়াজ উদ্দীন আহমদ চৌধুরী ও আবদুল মতীন চৌধুরী প্রমুখও তাঁর সাথে একই জেলে কারবরণ করেন। ১৯৩০ সালে তিনি কংগ্রেস ত্যাগ করে মুসলিম লীগে যোগদান করেন।

মাওলানা আশরাফ আলী থানভী খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনের সময় ‘মাসআলা-এ-তারক-এ-মাওয়ালাত’ শীর্ষক একটি উর্দু পুস্তিকা লিখে সারাদেশে প্রচার করেন। পুস্তিকায় তিনি খিলাফত আন্দোলন সমর্থন করেন কিন্তু অসহযোগ আন্দোলনকে শরীয়তের দৃষ্টিতে অবৈধ মনে করেন এবং রাজনৈতিক দিক থেকে মুসলিম জাতির জন্য ক্ষতিকর বলে উল্লেখ করেন।

খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলন একাকার হয়ে গিয়েছিল এবং কংগ্রেসী হিন্দুরাও তাতে একাত্মতা ঘোষণা করেছিলেন বলে মি. মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও ড. আল্লামা ইকবাল এ আন্দোলনে যোগদান করেননি।

ঢাকার মশুরী খোলার শাহসুফী আহসানুল্লাহ (১৭৯৮-১০২৬) হিন্দুদের সাথে একাকার হয়ে খিলাফত আন্দোলন করতে মুসলমানদের নিষেধ করেন। খিলাফত আন্দোলন চলাকালে মাওলানা মুহাম্মদ আলী ও মাওলানা শওকত আলী তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করে খিলাফত আন্দোলন সাফল্যের জন্য তাঁর দোয়া ও সাহায্য কামনা করেন।

যাতে তাঁর অজস্র মুরিদ ঐ আন্দোলনে যোগদান করেন। তার উত্তরে শাহ সাহেব বলেছিলেন : ‘বাবা, নিজ চক্ষে সিপাহী বিদ্রোহ (১৮৫৭) দেখিয়াছি। আমার প্রতিবেশী হিন্দুগণ আমাদের সঙ্গে যে প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করিয়া আমাদিগকে বিপদে ফেলিয়েছিল, সেই ভয়াবহ দৃশ্য আমি এখনো ভুলিতে পারি নাই।

স্বাধীনতার জন্য মুসলমানগণ কাফন ও বন্দুকের সম্মুখীন হইয়াছে। হাজার হাজার আলিম-হাদী রাহবারকে শুলীতে চড়িতে হইয়াছে, তাঁহাদের বাড়িঘর জ্বালাইয়া দেওয়া হইয়াছে ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হইয়াছে। অপরপক্ষে হিন্দুগণ দলে দলে যাইয়া ইংরেজ গভর্নমেন্টের চাকরি ও ভর্তি হইতে থাকে।

গান্ধীর মত পোষণ করিয়া স্বীয় সমাজকে ধ্বংসের মুখে ঠেলিয়া দিও না আমার অভিজ্ঞতা হইতে অনুরোধ এই যে, কংগ্রেস হইতে এখনই আপনারা চলিয়া আসুন ও হিন্দুদের বিশেষত মি. গান্ধীর লীডারশীপ ত্যাগ করুন ও নিজের পায়ের উপর দাঁড়ান এবং খাজা স্যার সলিমুল্লাহ প্রতিষ্ঠিত মোসলেম লীগ যোগদান করুন।

উত্তরকালে ইহাই হইবে মোসলেমগণের একমাত্র প্রতিষ্ঠান ও মুখপাত্র। বাবা, উপযুক্ত হইলেই সেয়ানে সেয়ানে কোলাকুলি হইবে।’

ঢাকার মাওলানা মুফতি দীন মুহাম্মদ খান (১৯০০-১৯৭৪) সক্রিয়ভাবে রাজনীতি করেন। তাঁর যৌবন বয়সে খিলাফত আন্দোলনের বিস্তৃতির ফলে উপমহাদেশের আকাশ বাতাস যখন উদ্বেলিত হয়ে ওঠে, তখন তিনি ভারতের খিলাফত নেতাদের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেন এবং অন্যান্য নেতাদের সাথে তিনিও কারাবরণ করেন।

চট্টগ্রাম জেলার হাজার হাজার মুসলমান পীর মুহাম্মদ বদরুল আলম শাহের পুত্র শাহ মাযহারুল আলম ওরফে সাহেব মিঞার খিলাফত আন্দোলনের সময় গ্রেফতার হন। সিলেটের বহু নেতা ও কর্মী খিলাফত আন্দোলনে কারাবরণ করেন। সিলেটের গ্রেফতারকৃত ৫৩ জন নেতাকর্মীর নাম পাওয়া যায়, তাতে কোনো হিন্দুর নাম নেই।

কৃষকপ্রজা আন্দোলন বাংলাদেশে শুরু হয় বিশ শতকের দ্বিতীয় দশক থেকে। এ কে ফজলুল হক, মৌলভী রজীবুদ্দীন তরফদার, রাজশাহীর মাওলানা ইদ্রীস আলী, টাঙ্গাইলের মাওলানা খোন্দকার আহমদ আলী আকালুভী, মাওলানা আকরম খাঁ, মৌলভী তমিজউদ্দীন খান প্রমুখ এই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে জড়িত থেকে কাজ করেন। ১৯৩৫ সালে একে ফজলুল হক কৃষকপ্রজা পার্টির সভাপতি নির্বাচিত হন।

ঐ সময়ে পীর বাদশা মিঞা পার্টির পৃষ্ঠপোষক মনোনীত হন। ১৯৩৭ সালের সাধারণ নির্বাচনে মুসলিম পার্লামেন্টারি বোর্ডর (মুসলিম লীগ) পাশাপাশি কৃষক প্রজা পার্টির তরফ থেকে ও নমিনেশন দিয়ে প্রার্থী দাঁড় করানো হয়। ঐ সময় পীর বাদশাহ মিঞা জনসভা করে পার্টিকে জয়যুক্ত করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেন।

মোমেনশাহী জিলার গফরগাঁয়ের মাওলানা শামসুল হক পাঁচবাগী খুবই জনপ্রিয় স্থানীয় প্রজানেতা ছিলেন। কৃষকপ্রজা আন্দোলনে তাঁর অবদান অসামান্য। ১৯৩৭ সালের বঙ্গীয় প্রাদেশিক আইন সভার সাধারণ নির্বাচনে তিনি কৃষক প্রজা পার্টির প্রার্থীরূপে মুসলিম লীগ প্রার্থীকে বিপুল ভোটে হারিয়ে নির্বাচিত হন।

মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী (১৯২৯ সালে আসামের ভাসান চরে কৃষক সম্মেলন করেন, যা ইতিহাসে ছিল বৃহত্তর কৃষক সম্মেলন।

১৯৭০ সালের ১৯ জানুয়ারি সন্তোষে কৃষক কর্মী সম্মেলনে তিনি এক সাংস্কৃতিক বিপ্লবের কথা ঘোষণা করেন। তিনি এ দেশের নির্যাতিত ও নিরন্ন মানুষের প্রতি আন্দোলনে অকুতোভয় সৈনিকের মতো লড়েছেন। দেশের মানুষের কাছে তিনি ‘মজলুম জননেতা’ বলে স্মরণীয় হয়ে আছেন।

জাতীয় জীবনে অতীত আলেম সমাজের গৌরবময় ভূমিকার কথা, যারা এককালে কাণ্ডারির মতো দেশের সকল কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাঁদের উত্তরসুরী আলেম সমাজ সেই ইতিহাস ভুলে অর্ধশতাব্দীর অধিক কাল যাবত পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে বাতিলদের দ্বারা অত্যাচারিত, লাঞ্ছিত ও অপমানিত হচ্ছেন দেশে দেশে।

তবু তাদের হুশ জাগ্রত হচ্ছে না। আল্লাহর বাণী ‘ওয়াতাসিমু বিহাবলিল্লাহি জামিয়াও ওলা তাফাররাকু’ অর্থ : তোমরা সবাই মিলে শক্ত করে আঁকড়ে ধরো আল্লাহর রজ্জুকে (কুরআনকে) এবং বিচ্ছিন্ন ভাগ ভাগ হয়ে থেকো না। ভুলে আছেন। জাতীয় জীবনে এটা বড়ই দুঃখের বিষয়।

অতি সম্প্রতি আলেম সমাজের কিছু অংশ নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে তুচ্ছ বিষয় নিয়ে দলাদলি ভুলে অতীতের মতো আবার ঐক্যবদ্ধ হওয়ার জন্য সকল ভয় বাধা দু’পায়ে দলে এগিয়ে আসা শুরু করেছেন। এটা জাতির জন্য খুবই আশা ও আনন্দের সংবাদ।

সংগ্রহ-এআই/