এই লেখাটি লিখতে হবে— স্বপ্নেও ভাবিনি! লেখাটি শুরু করে বারবার মুছে ফেলেছি; অসাড় হয়েছে আঙুল, কেঁপে উঠেছে বুক, সিক্ত হয়েছে চোখ। এই লেখাটি যে একটি এপিটাফ, এ যে আমার স্বপ্নের শাহবাগের এপিটাফ!

৫ ফেব্রুয়ারি-পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ শাহবাগ ছিল বাঙালির নতুন গণঅভ্যুত্থানের আঁতুরঘর, বাঙালির আবেগ-অনুভূতির তীর্থস্থান। ২৮ ফেব্রুয়ারি সাইদির ফাঁসির রায়ের পর শাহবাগ-আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটা উচিত ছিল, ঘটেনি। শাহবাগ কেবল একটি আন্দোলনের নাম নয়; শাহবাগ একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেরও নাম, শাহবাগ সোনার-ডিম-পাড়া একটি হাঁসেরও নাম! দশদিক থেকে এই আন্দোলনে টাকা এসেছে। শাহবাগব্যবসা বন্ধ করে দিলে অনেকের অন্নসংস্থানও বন্ধ হয়ে যাবে বলে আজ পর্যন্ত শাহবাগকে টিকিয়ে রাখা হয়েছে, ফরমালিন মাখিয়ে। টাকা-ভাগাভাগি, নেতৃত্বের কোন্দল আর মাইকের দখল নিয়ে শাহবাগ বারবার বিভক্ত হয়েছে।

যখন শাহবাগের শত্রু ছিল বিএনপি-জামায়াত-হেফাজত, তখন আমরা সম্মিলিতভাবে এদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি; সেই লড়াইয়ে আনন্দ ছিল, তৃপ্তি ছিল। এখন যখন শাহবাগের শত্রু শাহবাগ; এখন যখন মুখপাত্রের বিরুদ্ধে মুখপাত্র, মাইকের বিরুদ্ধে মাইক, চেয়ারের বিরুদ্ধে চেয়ার; তখন নিজেকে আর শাহবাগি ভাবতে পারি না, ঘেন্না লাগে!

শাহবাগে গেলে এখন রাজপথে বসতে পারি না, এক কোণায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়; কোথাও বসলেই কোনো এক গ্রুপের ট্যাগ পেতে হবে— এই ভয়ে! ৫ ফেব্রুয়ারি মানুষ শাহবাগে কোনো গ্রুপিং করতে আসেনি, কোনো মুখপাত্রের ডাকে আসেনি; নিজের কাজ ফেলে মানুষ শাহবাগে এসেছিল কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে। তীব্র গণআন্দোলনে সরকার আপিল আইন পরিবর্তনে বাধ্য হলো, সাধারণ মানুষও শাহবাগ ছেড়ে নিজ কাজে মন দিলো।

কিন্তু শাহবাগে বাঁশ পুঁতে তাঁবু গেড়ে পড়ে থাকল একদল শাহবাগজীবী। শাহবাগলব্ধ কচকচে টাকা যাদের জীবন পালটে দিলো, জীবিকার নিশ্চয়তা দিলো; তারা চাকরি ছেড়ে দিয়ে শাহবাগব্যবসাকেই বেছে নিল পেশা হিশেবে। দিবসে-দিবসে শাহবাগে মাইক বসিয়ে, কিছু বাদ্যবাজনা বাজিয়ে তারা শাহবাগকে গরম রাখল। সমুদ্রসম শাহবাগকে তারা পরিণত করল কচুরিপানাভর্তি হাজা-মজা পুকুরে, মহীরূহসম শাহবাগকে বানাল বনসাই; শাহবাগ পরিণত হলো পাড়ার ক্লাবঘরে!

ব্রিটিশদের 'ডিভাইড অ্যান্ড রুল' নীতির আদলে শাহবাগকে বিভক্ত করতে আওয়ামি লিগ শাহবাগে বসাল আরেক শাহবাগ, চেয়ার-টেবিল পাতিয়ে কিছু পেশাদার বেকারকে লিগ শাহবাগে বসিয়ে দিলো। আরেক দিকে শাহবাগের এককোণা ধরে রাখলেন উপপ্রধানমন্ত্রী হবার খায়েশে বিভোর এক ফরাসি দাড়িওয়ালা।

মাঝে স্যান্ডউইচের মতো ভাঁড়ামো করতে লাগল কয়েকটি নষ্ট বাম। প্রেস ক্লাবে কুড়িজন মিলে প্লাকার্ড ধরে 'বিশাল জনসভা' করা পর্যন্ত যে বামদের দৌরাত্ম্য, শাহবাগে লক্ষ জনতার ভীড়ে মাইক হাতে পেয়ে সেই বামরা ছিল স্বভাবতই আপ্লুত। লিগপন্থিদের কাছে শাহবাগ এখন পরিত্যক্ত পলিথিন হলেও বামদের কাছে শাহবাগ এখনও আবে জমজম।

শাহবাগ আর সাইদির মাহফিলের মাঝে এখন আর কোনো মৌলিক পার্থক্য নেই! মাহমিলে লোক জড়ো করে প্রথমে ধর্মের বাণী ঝেড়ে শেষে রাজনীতির বকোয়াজ বাকশো খুলত সাইদি, এখন শাহবাগে মাইক লাগিয়ে প্রথমে মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান দিয়ে শেষে রাজনৈতিক বয়ান শুরু করে শাহবাগজীবীরা। একপক্ষ করতে থাকে সরকারবন্দনা, আরেকপক্ষ সরকারবিরোধিতা। তিন-চার পক্ষ যখন ত্রিশ গজের মধ্যে ত্রিশটা মাইক লাগিয়ে গান-স্লোগান-ভাষণের সার্কাস শুরু করে, পথচারী-বাসযাত্রীরা তখন কানে আঙুল চেপে এলাকাটা পেরিয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচে; শাহবাগ তখন পরিণত হয় অখণ্ড এক বস্তিতে!

'মুখপাত্র' কোনো স্থায়ী চাকরির নাম নয়। সেরেফ মিডিয়ায় ব্রিফ করার জন্য সময়ের প্রয়োজনে একজন মুখপাত্রের দরকার হয়ে পড়েছিল। আন্দোলন বহু আগেই শেষ, শাহবাগের প্রয়োজনও শেষ। এখন আর মুখপাত্রেরও কোনো প্রয়োজন নেই।

কেউ ব্যক্তি-উদ্যোগে শাহবাগে বা অন্য কোথাও রাজাকারদের ফাঁসির দাবিতে অনুষ্ঠান করতে চাইলে করতেই পারে, তবে তা কোনোভাবেই আমাদের স্বপ্নের গণজাগরণের নাম বা লোগো ব্যবহার করে নয়। কেউ শাহবাগলব্ধ পরিচিতিকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক দল করতে চাইলে তাও করতে পারে, তবে তা কোনোভাবেই শাহবাগ আন্দোলনের সাথে যুক্ত থাকাবস্থায় না।

কারো দলগঠনের ইচ্ছে থাকলে যেন এখনই মঞ্চত্যাগ করে দল গঠন করে ফেলে, মঞ্চকে ব্যবহার করে আর কোনো ব্যবসা নয়! সদ্য গোঁফ-গজানো বাচ্চা ছেলেগুলোকে জলকামানের মুখে ফেলে দিয়ে, সদ্য চোখ-ফোটানো বাচ্চা মেয়েগুলোকে টিয়ার শেলের মুখে ঠেলে দিয়ে, নিজে বেহুঁশ হবার ভান করে হাসপাতালে শুয়ে থেকে কেউ দেশের উপপ্রধানমন্ত্রী হবার স্বপ্ন দেখে থাকলে সেই স্বপ্নের গুড়ে বালি!

এই বাচ্চা ছেলেমেয়েগুলো যখন বুঝতে পারবে আন্দোলনের নামে তারা প্রতারিত হচ্ছে, তাদেরকে ব্যবহার করা হচ্ছে কারো ক্ষমতায় যাবার সিঁড়ির তক্তা হিশেবে; তখন শাহবাগের কোনো 'মুখপাত্র', 'সংগঠক' কিংবা 'অন্যতম সংগঠক' ঐ ছেলেমেয়েদের পালটা-অভ্যুত্থান রেহাই পাবে না; পরিণতি হবে ইশপের গল্পের মিথ্যেবাদী রাখালের মতো।

অভ্যুত্থান, বিপ্লব বা গণজাগরণ বছরের পর বছর স্থায়ী হয় না, বছরের পর বছর স্থায়ী হয় ব্যবসা। শাহবাগ নামক লেবুটিকে কচলে-কচলে তেতো করে ফেলা হয়েছে, শাহবাগ নামক মৃত নারীটির ওপর চালানো হচ্ছে বহুপাক্ষিক গণধর্ষণ। শাহবাগের চেয়ার-ছোড়াছুড়ি আর গরম পানি মারামারির ছবি শেয়ার করে ছাগু পেজগুলো যখন হাসাহাসি করে, তখন এই পতিত শাহবাগ নিয়ে লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে যায়!

শাহবাগ থেকে সাধারণ মানুষ চলে গেছে, থেকে গেছে তিন-চারটে পির ও তাদের কিছু মুরিদ-লাঠিয়াল। এদের কারণে আমার প্রাণের শাহবাগকে নিয়ে যখন ছাগুরা তামাশা করে, তখন আর চুপ থাকতে পারি না। শত নোংরামো চোখে দেখেও এতদিন মুখ খুলিনি, নোংরা-পরিত্যক্ত-পতিত শাহবাগকে দেখে বিবেকের তাড়নায় মুখ খুলতে হচ্ছে!

শাহবাগে এসব নাটক বন্ধ না করলে পুলিশ লাগবে না, একদিন শাহবাগের চাওয়ালা-ফুলওয়ালা-হকার-ঝাড়ুদাররাই ঝাড়ুহাতে শাহবাগিদের ওপর যৌথ হামলা করে বসবে! সেই দিনটি আসার আগে, পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে যাবার আগে শাহবাগ থেকে এখন মানে-মানে নিরাপদে প্রস্থান করাই উত্তম।

শাহবাগে গিয়েছিলাম কাদের মোল্লাকে ফাঁসির পাত্র বানাতে, মুক্তিযুদ্ধকে হাসির পাত্র বানাতে নয়!

আখতারুজ্জামান আজাদ

সূত্র: প্রিয়ডটকম

ঢাকা, ২৩ সেপ্টেম্বর, টাইমনিউজবিডি.কম, জেএ