ঈদ মানে আনন্দ বা খুশি। মুসলিম জগতে দীর্ঘ এক মাস রোজা রেখে মুসলিমরা ঈদ পালন করে থাকেন। আল্লাহর রাসূল (সা) এর হাদিস অনুযায়ী যদি কোন ব্যক্তি ঈদের মাঠে নামাজের উদ্দেশ্য যায় এবং নামাজ পড়া শেষে বাড়িতে ফিরে তখন তার সমস্ত গুনাহ (সগীরা) মাফ করে দেয়া হয়। মনে হয় তিনি এই মাত্র্র জন্মগ্রহণ করেছেন।
কিন্তু সে ঈদ পালন যদি সঠিক সময়ে না হয় তাহলে কি আমরা সে সওয়াব থেকে বঞ্চিত হবোনা? তেমনি আমাদের দেশের অনেক অঞ্চল রয়েছে যেখানে তারা আরব বিশ্বের সময় অনুযায়ী রোযা এবং ঈদ পালন করেন।
(১) মানুষের বিভিন্ন প্রয়োজন ও বিশেষভাবে হজ্জের জন্যে একটি সুনির্দিষ্ট চাঁদের হিসাব জরুরী:
পবিত্র কুরআনে মহান রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন:-
يَسْئَلُوْنَكَ عَنِ الْاَهِلَّةِ - قُلْ هِىَ مَوَاقِيْتُ لِلنَّاسِ وَالْحَجَّ
“লোকেরা আপনাকে নতুন চাঁদ সম্পর্কে প্রশ্ন করে। বলুন: এটা মানুষ ও হজ্জের জন্য সুনির্দিষ্ট সময় নির্দেশক।” [সূরা বাক্বারাহ : ১৮৯ আয়াত]
শিক্ষণীয় দিক: আয়াতটি দ্বারা সুস্পষ্ট হয়, মানবজাতির জন্য চাঁদের হিসাবে দিন-তারিখ ও হজ্জের সময় নির্ধারণ একই হতে হবে। যেন তারা সবাই চাঁদের হিসাব অনুযায়ী দিন, মাস ও বছর গণনা এবং হজ্জ উদযাপন করতে পারে। তবে এ দ্বারা এটা প্রমাণীত হয়না যে রোযাও সারা পৃথিবীতে এক সাথে পালন করতে হবে।
হজ্জ পালনের ক্ষেত্রেই মুসলিমদের তারিখ এক হবে এবং অন্যান্য ধর্মীয় নির্দেশগুলোর ক্ষেত্রে চাঁদ দর্শনের আঞ্চলিকতাই প্রাধান্য পাবে। এটাই যুক্তিযুক্ত।
এক্ষেত্রে বলা যায় যে, হজ্জ পালন করতে মক্কা শরীফে যেতে হয়। কিন্তু রোযা পালন করতে মক্কা শরীফে যেতে হয় না। সে ক্ষেত্রে আঞ্চলিকতা প্রাধান্য পাবে। একজন মুসলিম সে যে দেশেই বাস করুন না কেন তিনি সে দেশের চাঁদ দেখে রোযা ও ঈদ পালন করবেন। এটাই বিশুদ্ধ মত যা উপরিউক্ত কুরআনের আয়াত দ্বারা প্রমাণিত।
(২) প্রতিদিনের সময় নির্ধারণের জন্য যেভাবে সূর্যকে সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে, তেমনি সুনির্দিষ্টভাবে মাস ও বছর গণনার জন্য একটি চাঁদের হিসাবই আল্লাহর পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট। আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন :
هُوَ الَّذِىْ جَعَلَ الشَّمْسَ ضِيَاءً وَالْقَمَرَ نُوْرًا وَّقَدَّرَه‘ مَنَازِلَ لِتَعْلَمُوْا عَدَدَ السِّنِيْنَ وَالْحِسَابَ - مَا خَلَقَ اللهُ ذلِكَ اِلاَّ بِالْحَقِّ - يُفَضِّلُ الْآيتِ لِقَوْمٍ يَّعْلَمُوْنَ
“তিনিই (আল্লাহ তা‘আলা) সূর্যকে তেজস্কর ও চন্দ্রকে জ্যোতির্ময় করেছেন এবং এর মনযিল নির্দিষ্ট করেছেন, যাতে তোমরা বছর গণনা ও সময়ের হিসাব জানতে পার। আল্লাহ এগুলো নিরর্থক সৃষ্টি করেন নি। জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য তিনি এসব নিদর্শন বিশদভাবে বিবৃত করেন।”[সূরা ইউনুস : ৫ আয়াত]
আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন :
وَجَعَلْنَا الَّيْلَ وَالنَّهَارَ آيَتَيَنِ فَمَحُوْنَا آيَةَ الَّيْلِ وَجَعَلْنَا آيَةَ النَّهَارِ مُبْصِرَةً لِّتَبْتَغُوْا فَضْلاً مِّنْ رَّبِّكُمْ وَلِتَعْلَمُوْا عَدَدَ السِّنِيْنَ وَالْحِسَابِ
“আমি রাত ও দিনকে করেছি দু’টি নিদর্শন; এরপর রাতের নিদর্শনটি করেছি নিষ্প্রভ, আর দিনের নিদর্শনকে করেছি আলোকময়, যাতে তোমরা তোমাদের রবের অনুগ্রহ সন্ধান করতে পার এবং যাতে তোমরা বছরের সংখ্যা ও হিসাব স্থির করতে পার।”[সূরা বানী ইসরাঈল : ১২ আয়াত]
লক্ষ্যণীয় দিকঃ উপরের দুটি আয়াত দ্বারা এটাই প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহপাক সূর্য ও চাঁদ সৃষ্টি করেছেন আল্লাহর অনুগ্রহ ও হিসাব করার জন্য। ইহা এই জন্য যে বান্দা কখন নামাজ ও রোযা পালন করবেন।
যে সব মুসলিম ভাইয়েরা আরব বিশ্ব অনুযায়ী রোযা ও ঈদ পালন করেন তাদের উদ্দেশ্য আমি বলতে চাই-
১. সারাদিন রোযা রাখার পর আপনারা কেন সূর্য অস্ত গেলে ইফতার করেন। আপনারাতো ইফতার করবেন আরো ৪ ঘন্টা পরে যখন আরববিশ্বে ইফতার করা হয়। যদি বাংলাদেশে ইফতার করেন তাহলেতো আরব বিশ্বের অনুযায়ী হবেনা। অর্থাৎ আপনাদের এখন ইফতার করতে হবে রাত ১১টার দিকে।
২. আমরা সূর্যের গতিবিধির উপর লক্ষ্য রেখে নামাজ কায়েম করি, যদি আরব বিশ্ব অনুযায়ী নামাজ পড়া হয় তাহলে কি আমাদের নামাজ সঠিকভাবে কায়েম করা হবে? উদাহরণস্বরুপ বলতে চাই আরব দেশের সাথে মিলিয়ে নামাজ পড়তে হলে আপনাদের এখন (২৮ জুলাই ২০১৪) মাগরিবের নামাজ পড়তে হবে সন্ধ্যা ৭ টার পরিবর্তে রাত ১১টায়। এছাড়া আরেকটু পরিস্কার করে বলি আমরা যখন ভোর সাড়ে ৫টায় ফজরের নামাজ পড়ি, আরব দেশের সাথে মিলিয়ে পড়তে হলে সেটা পড়তে হবে সকাল সাড়ে ৯টায়। কিন্তু ফজরের নামাজ সকাল সাড়ে ৯টায় কি কখনো পড়েছেন?
৩. ধীবরের দেশ নরওয়েতে ২০-২২ ঘন্টা রোযা রাখতে হয়, যদি আরব বিশ্বের অনুযায়ী হতো তাহলেতো তাদের এত কষ্ট করতে হতো না। আরব বিশ্বে যখন ইফতার করা হয় তখন তারা ইফতার করলেইতো রোযা পালন হতো।
৪. আমরা আমাদের দেশে নামাজ কায়েম করবো আমাদের দেশের সময় অনুযায়ী এবং রোযা ও ঈদ পালন করবো আরব বিশ্ব অনুযায়ী তা কতটুকু শরীয়া মোতাবেক?
সহীহ হাদীসের আলোকে চাঁদের বিধান:
মাসআলা - ০১: চাঁদের হিসাবে মাস ২৯ দিন বা ৩০ দিন হয়ে থাকে। ২৯ দিনের কমও নয় আবার ৩০ দিনের বেশীও নয়। রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন:
اَلشَّهْرُ هكَذَا (وفى رواية وَخَنَسَ الْاِبْهَامَ فِى الثَّالِثَةِ) يعنى مَرَّةً تِسْعَةً وَعِشْرِيْنَ وَمَرَّةً ثَلاَثِيْنَ ـ
“মাস এই দিনগুলোতে এবং এই দিনগুলোতে – অর্থাৎ কখনো ২৯ দিন আবার কখনো ৩০ দিন। (উভয় সংখ্যাটি তিনি আঙ্গুলের ইশারা দ্বারা বুঝালেন। ২৯ সংখ্যাটি বুঝানোর সময়) তিনি (স) তৃতীয় বার নিজের বৃদ্ধা আঙ্গুল বন্ধ করলেন। [সহীহ বুখারী - কিতাবুস সিয়াম باب قول النبى صلى الله عليه وسلم لا نكتب ولانحسب ، وباب قول النبى صلى الله عليه وسلم اذا رأيتم الهلال فصوموا ; সহীহ মুসলিম - কিতাবুস সিয়াম باب وجوب صوم رمضان لرؤية الهلال| শব্দগুলো সহীহুল বুখারীর। [তাফসীরে কুরআনে ‘আযীয ১/৬৫৬ পৃ:]
মাসআলা – ০২: যদি ২৯ তারিখে মেঘের কারণে চাঁদ দেখা না যায়, তাহলে ৩০ দিন গণনা করবে। রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন:
اَلشَّهْرُ تِسْعٌ وَعِشْرُوْنَ لَيْلَةً فَلاَ تَصُوْمُوْا حَتّى تَرَوْهُ فَاِنْ غُمَّ ্عَلَيْكُمْ فَاَكْمِلُوا الْعِدَّةَ ثَلثِيْنَ
“মাস কখনো উনত্রিশ রাত্রিতেও হয়। সুতরাং তোমরা সিয়াম রাখবে না যে পর্যন্ত না চাঁদ দেখ। যদি চাঁদ তোমাদের থেকে মেঘের কারণে গোপন থাকে, তবে ত্রিশ দিন পূর্ণ করবে।”[সহীহ : সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, মিশকাত (এমদা) ৪/১৮৭২ নং]
মাসআলা – ০৩: যদি ২৯ তারিখে চাঁদ না দেখা যায়, সেক্ষেত্রে দু’-এক দিন পরে চাঁদ দেখে যেন এটা বলা না হয় – “এটাতো অমুক তারিখের চাঁদ।” বরং যে তারিখে চাঁদ দেখবে তাকে সেই তারিখেরই চাঁদ বলবে। অর্থাৎ চাঁদ বড়-ছোট হওয়া বিষয়টি ধর্তব্য নয়। রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন:
اِنَّ اللهَ مُدَّه‘ لِلرُّؤْيَةِ فَهُوَ لِلَيْلَةٍ رَأَيْتُمُوْهُ
“দেখার সুবিধার্থে আল্লাহ একে বর্ধিত করে দিয়েছেন। মূলত এ ঐ রাত্রের চাঁদ যে রাতে তোমরা দেখেছ।”[সহীহ মুসলিম - কিতাবুস সিয়াম باب بيان انه لا اعتبار بكبر الهلال وصغره]
মাসআলা – ০৪: রমযানের জন্য শা‘বানের চাঁদ দেখা ও তার তারিখ স্মরণ রাখার চেষ্টা করতে হবে। রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন:
اَحْصُوْا حِلاَلَ شَعْبَانَ لِرَمَضَانَ
“রমযানের জন্য শা‘বানের তারিখের হিসাব রাখ।”[তিরমিযী - কিতাবুস সিয়াম باب ماجاء فى احصاء هلال شعبان| আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। [সহীহ জামে‘উস সগীর ওয়া যিয়াদাতাহু লিলআলবানী ১/১৯৮ নং]
মাসআলা – ০৫: স্থানীয়ভাবে চাঁদের দর্শক অনেক হলে একজন আদল সম্পন্ন (ন্যায় – নিষ্ঠাবান) মুসলিম ব্যক্তির সাক্ষ্য প্রয়োজন। অন্যদের জন্য এর সংবাদই যথেষ্ট। ‘আব্দুল্লাহ ইবনে ‘উমার (রা) বলেন:
تَرَاءَ النَّاسُ الْهِلاَلَ فَاَخْبَرْتُ رَسُوْلَ اللهِ - اِنِّىْ رَاَيْتُه‘ فَصَامَ وَاَمَرَ النَّاسَ بِصِيَامِه
“একবার বহুলোক মিলে চাঁদ দেখতে ও দেখাতে লাগল। আমি রসূলুল্লাহ (স)-এর কাছে সংবাদ দিলাম যে, আমি চাঁদ দেখেছি। তখন তিনি সাওম রাখলেন এবং লোকদেরকে সাওম রাখতে নির্দেশ দিলেন।”[আবূ দাউদ, দারেমী, মিশকাত (এমদা) ৪/১৮৮২ নং। আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন [তাহক্বীক্বকৃত আবূ দাউদ হা/২৩৪২]।
মাসআলা – ০৬: স্থানীয়ভাবে স্বচক্ষে চাঁদ দেখা না গেলে দু’ জন আদল সম্পন্ন (ন্যায়-নিষ্ঠাবান) মুসলিম ব্যক্তির সাক্ষ্য প্রয়োজন। অন্যদের জন্য এর সংবাদই যথেষ্ট। হাদিসে বর্ণিত আছে:
حُسَيْنُ بِنُ الْحَارِسِ الْجَدَلِيِّ جَدِيْلَةَ قَيْسٍ اَنَّ اَمِيْرَ مَكَّةَ خَطَبَ ثُمَّ قَالَ عَهِدَ اِلَيْنَا رَسُوْلُ اللهِ - اَنْ نَّنْسُكَ لِلرُّؤْيَةِ فَاِنْ لَّمْ نَرَه‘ وَشَهِدَ شَاهِدَا عَدْلٍ نَسْكَنَا بِشَهَادَتِهِمَا …. قال الحسين فقلت لشيخ الى جنبى من هذا الذى اوما اليه الامير قال هذا عبد الله بن عمر صدق كان اعلم بالله منه فقال بذلك امرنا رسول الله -
“হুসায়িন ইবনে আল-হারিস আল-জাদলী থেকে বর্ণিত, একবার মক্কার আমীর খুতবা প্রদানের সময় বললেন: রসূলুল্লাহ (স) আমাদের প্রতি নির্দেশ প্রদান করেছেন, আমরা যেন চাঁদ দেখাকে ‘ইবাদত হিসাবে গুরুত্ব দেই। আর আমরা স্বচক্ষে যদি তা না দেখি তবে দু’জন ন্যায়পরায়ন লোক এ ব্যাপারে সাক্ষ্য প্রদান করলে – তখন আমরা যেন তাদের সাক্ষের উপর নির্ভর করি।” …. হুসায়িন বলেন: আমি আমার পার্শ্ববর্তী একজন শায়েখকে জিজ্ঞাসা করি: এই ব্যক্তি কে – যাঁর প্রতি আমীর ইশারা করলেন? তিনি বলেন : ইনি ‘আব্দুল্লাহ ইবনে ‘উমার (রা)। আর তিনি (রা) সত্য বলেন। তাঁর (আমীরের) চাইতে তিনি [ইবনে ‘উমার (রা)] আল্লাহ সম্পর্কে অধিক জ্ঞানী ছিলেন। যিনি (রা) বলেছেন: রসূলুল্লাহ (স) আমাদেরকে এরূপ করতে নির্দেশ প্রদান করেন।”[আবূ দাউদ - কিতাবুস সিয়াম باب شهادة رجلين على رؤية هلال شوال| আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। [তাহক্বীক্বকৃত আবূ দাউদ হা/২২৩৮ নং]
عَنْ رِبْعِىِّ بِّنْ حِرَاشٍ عَنْ رَجُلٍ مِنْ اَصْحَابِ النَّبِىِّ - قَالَ اخْتَلَفَ النَّاسُ فِىْ اخِرِ يَوْمٍ مِّنْ رَّمَضَانَ فَقَدِمَ اَعْرَابِيَّانِ فَشَهِدَا عِنْدَ النَّبِىِّ - بِاللهِ لاَهَلاَّ
الْهِلاَلَ اَمْسِ عَشِيَّةً فَاَمَرَ رَسُوْلُ اللهِ - النَّاسَ اَنْ يُّفْطِرُوْا زاد فى حديثه وَاَنْ يَّغْدُوْا اِلَى مُصَلاَّهُمْ
“রিব‘য়ী ইবনে হিরাশ নবী (স) এর জনৈক সাহাবী হতে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: একবার লোকেরা রমযানের শেষে শাওয়ালের চাঁদ দেখা সম্পর্কে মতভেদ করেন। তখন দু’জন বেদুঈন নবী (স)এর নিকট উপস্থিত হয়ে আল্লাহর শপথ করে সাক্ষ্য প্রদান করেন যে, গত সন্ধ্যায় তারা শাওয়ালে চাঁদ দেখেছে। রসূলুল্লাহ (স) লোকদেরকে রোযা ভাঙ্গার নির্দেশ দেন। বর্ণনাকারী তাঁর হাদীসে অতিরিক্ত বর্ণনা করেছেন যে, তিনি (স) আরও নির্দেশ দিয়েছিলেন : “আর তারা যেন আগামী কাল ‘ঈদের সালাত আদায়ের জন্য ‘ঈদগাহে গমন করে।”[আবূ দাউদ - কিতাবুস সিয়াম باب شهادة رجلين على رؤية هلال شوال| আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। [তাহক্বীক্বকৃত আবূ দাউদ হা/২২৩৯ নং]
মাসআলা – ০৭: রমাযানের চাঁদের ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তির সাক্ষ্য গ্রহণ।
عن ابن عمر قال : تراءى الناس الهلال فرأيته فأخبرت رسول الله صلى الله عليه وسلم فصام وأمر الناس بصيامه
ইবনে উমার (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: একবার লোকেরা চাঁদ অন্বেষণ করে, কিন্তু দেখতে পায়নি। পরে এক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ (স)-কে খবর দেয় যে, সে চাঁদ দেখেছে। এরপর তিনি সিয়াম রাখেন এবং লোকদেরকেও সিয়াম রাখার নির্দেশ দেন।[ আবূ দাউদ - কিতাবুস সিয়াম باب فيى شهادة الواحد على رؤية هلال رمضان ; আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন [তাহক্বীক্বকৃত আবূ দাউদ হা/২৩৪২]। শুআয়েব আরনাউত তাঁর সহীহ ইবনে হিব্বানের তাহক্বীক্বেও হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন [তাহক্বীক্বকৃত সহীহ ইবনে হিব্বান ৮/৩৪৪৭ নং]
মাসআলা – ০৮: যখন চাঁদ দেখবে তখন নিচের দু‘আটি পড়বে।
اَللَّهُمَّ اَهِلَّه‘ عَلَيْنَا بِالْاَمْنِ وَالْاِيْمَانِ وَالسَّلاَمَةِ وَالْاِسْلاَمِ رَبِّىْ وَرَبِّكَ اللهُ
“হে আল্লাহ! এই নতুন চাঁদকে উদয় কর আমাদের জন্যে নিরাপত্তা, ঈমান, শান্তি ও ইসলামের সাথে। আল্লাহ আমাদের এবং তোমার (চাঁদের) রব।”[তরমিযী, দারেমী। হাদীসটি সহীহ। অবশ্য প্রথমে ‘আল্লাহু আকবার’ শব্দে বর্ণিত উক্ত হাদীসের বর্ধিত বর্ণনাটিকে অনেকে য‘য়ীফ বলেছেন [তাহক্বীক্বকৃত দারেমী (মিশর) ১/৪৪৫ পৃ:, তাহক্বীক্ব : সাইয়েদ ইবরাহীম ও ‘আলী মুহাম্মাদ ‘আলী]। মিশকাত (এমদা) ৫/২৩১৬ নং]
মাসআলা – ০৯: সিয়াম হল যেদিন মুসলিমদের মধ্যে সিয়াম পালন করা হয়। ঈদুল ফিতর হল যেদিন মুসলিমদের মধ্যে ইফতার করা হয়। আর ঈদুল আযহা হল যেদিন মুসলিমদের মধ্যে কুরবানী করা হয়।
আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, নবী (স) বলেছেন :
اَلصَّوْمُ يَوْمَ تَصُوْمُوْنَ، وَالْفِطْرُ يَوْمَ تَفْطَرُوْنَ، وَالْأَضْحَى يَوْمَ تُضْحُّوْنَ
“সিয়াম হল যেদিন তোমরা সিয়াম পালন কর। ঈদুল ফিতর হল যেদিন তোমরা ইফতার কর। আর ঈদুল আযহা হল যেদিন তোমরা কুরবানী কর।”[তিরমিযী - কিতাবুস সিয়াম باب ما جاء الصوم يوم تصومو ... ; আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। [তাহক্বীক্বকৃত তিরমিযী (রিয়াদ) হা/৬৯৭]
এ পর্যায়ে সহীহ মুসলিমের তরজমাতুল বাব (অনুচ্ছেদ) অনেককে সংশয়ের মধ্যে ফেলে দেয়। যেখানে বলা হয়েছে:
بَابُ بَيَانِ اَنَّ لِكُلِّ بَلَدٍ رُؤْيَتِهِمْ وَاَنَّهُمْ اِذَا رَاَوُ الْهِلاَلَ بِبِلَدٍ لاَيَثْبُتُ حُكْمُهُ لِمَا بَعْدُ عَنْهُمْ [بلد
“প্রত্যেক দেশের শহরের অধিবাসীদের জন্য তাদের চাঁদ দেখা তাদের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য, অন্য শহরের মানুষের জন্য নয়। সুতরাং কোন শহরের লোক যদি চাঁদ দেখে তবে এ হুকুম তাদের থেকে দূরবর্তী শহরের লোকদের জন্য প্রযোজ্য হবে না।”[সহীহ মুসলিম, কিতাবুস সিয়াম]
সহীহ মুসলিমের নিম্নোক্ত বর্ণনাটিও অনেকে অঞ্চলভিত্তিক চন্দ্র দিন-তারিখ নির্ধারণের স্বপক্ষে উপস্থাপন করেন। বর্ণনাটি নিম্নরূপ :
কুরায়ব (রহ) থেকে বর্ণিত, উম্মুল ফযল বিনতে হারিস তাকে সিরিয়ায় মু‘আবিয়া (রা)এর কাছে পাঠালেন। (কুরায়ব বলেন,) আমি সিরিয়ায় পৌঁছলাম এবং প্রয়োজনীয় কাজ সমাধা করলাম। আমি সিরিয়া থাকাবস্থায়ই রমযানের চাঁদ দেখা গেল। জুম‘আর দিন সন্ধ্যায় আমি চাঁদ দেখলাম। এরপর রমাযানের শেষ ভাগে আমি মদীনায় ফিরলাম। ‘আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) আমার নিকট জিজ্ঞাসা করলেন এবং চাঁদ সম্পর্কে আলোচনা করলেন। এরপর তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা কোন দিন চাঁদ দেখেছ? আমি বললাম, আমরা তো জুম‘আর দিন সন্ধ্যায় চাঁদ দেখেছি। তিনি আবার জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি নিজে দেখেছ কি? আমি বললাম, হাঁ, আমি দেখেছি এবং লোকেরাও দেখেছে। তারা সিয়াম পালন করেছে এবং মু‘আবিয়া (রা)ও সিয়াম পালন করেছেন। তিনি বললেন, আমরা কিন্তু শনিবার সন্ধ্যায় চাঁদ দেখেছি। আমরা সিয়াম পালন করতে থাকব, শেষ পর্যন্ত ত্রিশ দিন পূর্ণ করব অথবা চাঁদ দেখব। আমি বললাম, মু‘আবিয়া (রা) এর চাঁদ দেখা এবং তার সাওম পালন করা আপনার জন্য যথেষ্ট নয় কি? তিনি (রা) বললেন :
لاَ هكَذَا اَمَرَنَا رَسُوْلُ اللهِ – وَشَكَّ يَحْيَ بِنْ يَحْيَ فِىْ نَكْتَفِىْ اَوْ تَكْتَفِىْ
“না যথেষ্ট নয়। কেননা রসূলুল্লাহ (স) আমাদেরকে এরূপ করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন।” [সহীহ মুসলিম, কিতাবুস সিয়াম, باب بيان ان لكل بلد رؤيتهم وانهم اذا راو الهلال ....]
সমাধান: ইমাম শওকানী (রহ) ইবনে ‘আব্বাসের শেষোক্ত উক্তির ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেন : “এর দাবী হল যেভাবে তিনি (পূর্বে) বলেছেন : فَلاَ نَزَالُ نَصُوْمُ حَتّى نُكْمِلَ ثَلاَثِيْنَ اَوْ نَرَاهُ “আমরা সিয়াম পালন করতে থাকব, শেষ পর্যন্ত ত্রিশ দিন পূর্ণ করব অথবা চাঁদ দেখব।” এ মর্মে নবী (স)এর নির্দেশ সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে উল্লেখ করা হয়েছে : لا تصوموا حتى تروا الهلال ، ولا تفطروا حتى تروه فإن غم عليكم فأكملوا العدة ثلاثين “সিয়াম রাখবে না যতক্ষণ না চাঁদ দেখ। এভাবে রোযা খুলবে না যতক্ষণ না (শাওয়ালের) চাঁদ দেখ। আর যদি চাঁদ তোমাদের উপর গোপন থাকে, তাহলে তোমরা ত্রিশ দিন পূর্ণ করবে।”
‘বালাদ’ শব্দটির অর্থ নিরূপন: বলা হয় – যে সমস্ত মুহাদ্দিস নিজেদের হাদীস সঙ্কলনে ইবনে আব্বাস (রা)-এর বর্ণনাটি উল্লেখ করেছেন তারা এই মর্মে বাব বা অনুচ্ছেদ লিখেছেন যে, “প্রত্যেক বালাদের জন্য নিজ নিজ চাঁদ প্রযোজ্য” – যেভাবে সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, মুহাদ্দিসগণ আলোচ্য হাদীসের এই অর্থই নিয়েছেন।
এর জবাব হল, নিঃসন্দেহে মুহাদ্দিসগণ ইবনে আব্বাস (রা)-এর হাদীস অনুযায়ী যে অনুচ্ছেদ লিখেছেন তার দাবী এটাই। কেননা উক্ত হাদীসে ইবনে আব্বাস (রা) সেদিকেই ইশারা করেছেন। তাছাড়া তিনি (রা) صُوْمُوْا لِرُؤْيَتِه وَافْطِرُوْا لِرُؤْيَتِهِ
“চাঁদ দেখে সিয়াম রাখ এবং চাঁদ দেখে সিয়াম খোল” [সহীহ: সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, মিশকাত (ঢাকা : এমদাদিয়া) ৪/১৮৭৩ নং] – হাদীসটি থেকে উক্ত মর্ম নিয়েছেন।
কুরআন ও সহীহ হাদীস মতবিরোধপূর্ণ ও পরস্পর বিরোধী নয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
اَفَلاَ يَتَدَبَّرُوْنَ الْقُرْانَ ط وَلَوْ كَانَ مِنْ عِنْدَ غَيْرِ اللهِ لَوَجَدُوْا فِيْه اخْتِلاَفًا كَثِيْرًا
“তারা কি কুরআন নিয়ে চিন্তাভাবনা করে না? এটা যদি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো পক্ষ থেকে নাযিল হত, তাহলে অবশ্যই এতে বৈপরীত্য (ইখতিলাফ) দেখতে পেত।” [সূরা নিসা : ৮২ আয়াত]
আল্লাহ তা‘আলা নবী (আ)দের আগমনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেন:
وَاَنْزَلَ مَعَهُمُ الْكِتبَ بِالْحَقِّ لِيَحْكُمَ بَيْنَ النَّاسِ فِيْمَا اخْتَلَفُوْا فِيْه
“আর তাদের (নবীদের) সাথে হক্বসহ কিতাব নাযিল করেছি, যেন মানুষের মধ্যকার ইখতিলাফ (মতপার্থক্য)গুলো নিরসন হয়।” [সূরা বাক্বারাহ : ২১৩ আয়াত]
এ সম্পর্কে নবী (স) বলেছেন :
لاَ تَخْتَلِفُوْا فَاِنَّ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمُ اخْتَلَفُوْا فَهَلَكُوْا
“ইখতিলাফ করো না। কেননা তোমাদের পূর্বে যারা ছিল, তারা ইখতিলাফ করত। এ কারণে তারা ধ্বংস হয়ে গেছে।” [বুখারী, কিতাবুল আহাদিসুল আম্বিয়া]
অন্যত্র বর্ণিত হয়েছে :
اِنَّمَا هَلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ بِاِخْتِلاَفِهِمْ فِي الْكِتَابِ
“তোমাদের পূর্বে যারা ছিল, তারা (আল্লাহর) কিতাবে ইখতিলাফ করেছিল। এ কারণে তারা ধ্বংস হয়েছিল।” [মুসলিম, কিতাবুল ইলম]
কুরআন ও সুন্নাহর মতবিরোধ নিরসনে নবী (স) বলেছেন :
سَمِعَ النَّبِيُّ- قَوْمًا يَّتَدَارَؤُنَ فِي الْقُرْانِ فَقَالَ اِنَّمَا هَلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ بِهذَا ضَرَبُوْا كِتَابَ اللهِ بَعْضَه‘ بِبَعْضٍ وَّ انَّمَا نَزَلَ كِتَابُ اللهِ يُصَدِّقُ بَعْضُه‘ بَعْضًا فَلاَ تُكَذِّبُوْا بَعْضَه‘ بِبَعْضٍ فَمَا عَلِمْتُمْ مِّنْهُ فَقُوْلُوْا وَمَا جَهِلْتُمْ فَكِلُوْهُ اِلي عَالِمِه
“নবী (স) একদল লোককে কুরআনের বিষয়ে বিতর্ক করতে শুনলেন। তখন তিনি (স) বললেন: তোমাদের পূর্বে যারা ছিল তারা এ কারণেই হালাক (ধ্বংস) হয়েছে। তারা আল্লাহর কিতাবের এক অংশকে অপর অংশ দ্বারা বাতিল করার চেষ্টা করেছিল। অথচ কিতাবুল্লাহ নাযিল হয়েছে এর এক অংশ অপর অংশের সমর্থক হিসাবে। সুতরাং তোমরা এর এক অংশকে অপর অংশ দ্বারা মিথ্যা প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করবে না। বরং যা তোমরা জান কেবল তা-ই বলবে। আর যা জান না তা যে জানে তার কাছে সপর্দ করবে।”[আহমাদ, মিশকাত [ঢাকা : এমদাদিয়া লাইব্রেরী] ২য় খন্ড হা/২২১। আলবানী হাদীসটিকে ‘হাসান’ বলেছেন – আলবানীর তাহক্বীক্বকৃত মিশকাত ১/২৩৮ পৃ]
সুতরাং চাঁদ সম্পর্কীত উল্লিখিত কুরআন ও হাদীসের মধ্যকার সঠিক সমাধানের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করুন এবং উম্মাহর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই ব্যাপারে মুসলিমদের ঐক্যকে ত্বরান্বিত করুন। হে আল্লাহ! তুমি আমাদের নেক নিয়্যাত ও কাজগুলো ক্ববুল কর, আমিন!
ঢাকা, ২৮জুলাই, টাইমনিউজবিডি.কম, এসএইচ, কেবি





