ব্রিটিশ-ভারত থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত প্রশাসনিক কাঠামো প্রধানত দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য উপযোগী ছিল। কিন্তু সুশাসন ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সহায়ক ছিল না।  বিদেশী শাসকদের নিকট জাতীয় উন্নতির ধারণা ছিল অনেকটা অমূলক ও কল্পনাবিলাস। রাষ্ট্র ছিল তখন পুলিশী রাষ্ট্র (Police State) ।

মূলত আধুনিক রাষ্ট্র এক জনকল্যাণকর প্রতিষ্ঠান। জনহিতকর কার্যাবলী সম্পাদনই বর্তমান রাষ্ট্রের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হ্যারল্ড লাস্কি (Harold Laski) বলেছেন, (The modern state is a territorial society divided into government and subjects, claiming within its allotted physical area supremacy over all other institutions.)

অর্থাৎ আধুনিক রাষ্ট্র ভূখন্ডে অবস্থিত এমন এক সমাজ , যা শাসকগোষ্ঠী ও শাসিত-এ দু’ভাগে বিভক্ত এবং নিজের নির্দিষ্ট ক্ষেত্রের মধ্যে অবস্থিত সকল সংস্থার উপর প্রধান্য দাবি করে।

আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় রাষ্ট্রের কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ থাকে। আর রাষ্ট্রের উল্লেখ্যযোগ্য বিভাগ হলো প্রশাসন। আর প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ উপবিভাগ হলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। দেশের আইন-শৃঙ্খলাবাহিনী বলতে প্রধানত পুলিশকেই বোঝানো হয়। যদিও সংজ্ঞা অনুযায়ি অপরাপর বাহিনীগুলোও এক সাথে জড়িত আছে। মূলত পুলিশই আইনশৃঙ্খলার ক্ষেত্রে মূখ্য ভুমিকা পালন করে। আর অন্যবাহিনীগুলো পুলিশের সহায়ক শক্তি। তাই পুলিশ বাহিনীর উপর জনগণের জানমালের নিরাপত্তা ও সুশাসন অনেকটাই নির্ভরশীল। কিন্তু আমাদের দেশের এই অতিগুরুত্বপূর্ণ বাহিনী তাদের সে দায়িত্ব ও কর্তব্যের প্রতি সুবিচার করতে পেরেছে বলে মনে হয় না।

উন্নত বিশ্বে পুলিশ বাহিনী জনগণের সার্বক্ষণিক সেবায় নিয়োজিত থাকে। যেকোন সমস্যায় মানুষ পুলিশের দারস্থ হয়। এদের কাজই হলো জনগণের যেকোন সমস্যায় সকল প্রকার সহযোগিতা করা। এ ব্যাপারে অতিচমকপ্রদ ঘটনার উল্লেখ করছি। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের জেলা চুয়াডাঙ্গা সফরকালে দুই কোরীয় নাগরিক কিছু টাকা হারিয়ে ফেলেন। থানায় যোগাযোগ করে জানতে চান যে, তাদের হারানো টাকাগুলো থানায় জমা হয়েছে কী-না ? থানা কর্তাবাবুর তো একেবারে আক্কেলগুরুম। যে দেশে সিন্দুক কেটে টাকা চুরি করা হয়, সে দেশে এমন আশা করা বাতুলতা বৈ কিছু নয়।

এবিষয়ে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অনেকটা বুদ্ধিমত্তারই পরিচয় দিয়েছেন। তিনি বিদেশীদের জানান যে, হারানো টাকাগুলো এখনো তাদের কাছে জমা পড়েনি। তাদেরকে পরে যোগাযোগ করতে বলে ওসি সাহেব জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় টাকা ম্যানেজ করে কোন মতে দেশের মানটা বাঁচিয়েছিলেন। এঘটনা থেকেই বোঝা যায় আমাদের দেশের পুলিশের সেবার ধরন, আর অন্যদেশের পুলিশের সেবার ধরনের মধ্যে মৌলিক পার্থক্যটা।

যাহোক এসব কথা কারো কারো কাছে আষাঢ়ে গল্পই মনে হওয়ার কথা। যেদেশের একশ্রেণীর পুলিশ সদস্য অবৈধ অর্থলিপ্সার জন্য রাস্তা থেকে পথচারি ধরে নির্মম ও নিষ্ঠুর নির্যাতন করে। এমনকি যৌনাঙ্গে পাশবিক নির্যাতন চালিয়ে মূল্যবান জীবনকে নষ্ট করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। তাই পুলিশের কাছে  বেশী আশা করা কতখানি যৌক্তিক তা বিচারের ভার দেশের সচেতন মানুষের উপর ছেড়ে দেওয়াই শ্রেয় মনে করছি।

সাম্প্রতিক সময়ে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে একশ্রেণীর পুলিশ সদস্য পেশাগত অসদাচরণ ও ক্ষমতার অপব্যবহার করেই চলেছেন। কোনভাবেই এসব অসৎপ্রবণ পুলিশ সদস্যদের লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না। অভিজ্ঞজনরা বলছেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় পুলিশে লোক নিয়োগ, বেপরোয়া ক্ষমতাদান ও বিরোধী দল দমনে নিয়োজিত করায় পুলিশ বাহিনী যেমন পেশাদারিত্ব হারিয়েছে, ঠিক তেমনিভাবে বাহিনীর চেইন অব কমান্ডও ভেঙ্গে পড়েছে রীতিমত। সম্প্রতি সংঘঠিত কিছু ঘটনা থেকে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। যা আমাদের জন্য  রীতিমত আতঙ্কের।

সম্প্রতি কতিপয় অসৎপ্রবন পুলিশ সদস্যের কারণে জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এসব পুলিশ সদস্য রাজধানীসহ সারা দেশেই ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, বরিশালের আগৈলঝাড়ায় ওসিসহ দুই পুলিশ সদস্যের দুই দফা নির্যাতনে আহত গাছ ব্যবসায়ী এক স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। গত ১৬ জানুয়ারি দুপুরে এ নির্মম ও নিষ্ঠুর ঘটনা ঘটে। নির্যাতনের শিকার আসাদুজ্জামান বাদল সেরনিয়াবাত শেরাল উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি এবং গৈলা ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক।

অপর দিকে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে কোনো অভিযোগ ছাড়াই এক ব্যবসায়ীকে আটকের পর ৪৫ হাজার টাকা আদায় করে নিয়েছে পুলিশ। গত ১৩ জানুয়ারি রাতে উপজেলার হোসেনাবাদ বাজার থেকে নাহারুল ইসলাম নামে ওই তৈরি পোশাক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে এই টাকা আদায় করে পুলিশ। গত ১৫ জানুয়ারি কাকভোরে যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশ মীরহাজিরবাগে পিটিয়ে মারাত্মক আহত করে সিটি করপোরেশন কর্মকর্তা বিকাশ চন্দ্র দাসকে। পুলিশ বিকাশকে পেটাচ্ছিল আর বলছিল, ‘মাছের রাজা ইলিশ, দেশের রাজা পুলিশ’। পুলিশ রাজা হলে কোন সমস্যা নেই, কিন্তু তা প্রজাবান্ধব হলেই শেষ রক্ষা।

দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োচিত পুলিশের এমন হিংস্র ও দানবীয় আচরণ এখন সারা দেশের নিত্যদিনের চিত্র। অপরাধ দমনের দায়িত্ব যাদের, সেই পুলিশই এখন এমন সব অপরাধ কর্মকান্ডে বেপরোয়া। ঘুষ, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, নির্যাতন, ব্লাকমেইলিংয়ের পাশাপাশি ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়ের মতো ভয়ঙ্কর অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে এই বাহিনীর কতিপয় সদস্য। এমতাবস্থায় সরকারের ভাবমূর্তিও নষ্ট হচ্ছে আশঙ্কাজনকভাবে।

পুলিশ বাহিনীকে জনগণের বন্ধু বলা হলেও তারা এখন মানুষের কাছে আতঙ্কের নাম। বিরোধী দল দমনে পুলিশকে বেপরোয়া ও নিয়ন্ত্রণহীন ক্ষমতা দেয়ার কারণেই এ বাহিনীর ক্ষমতার অপব্যবহার, অনৈতিক লোভ-লালসা ও স্বেচ্চাচারিতা বেড়েছে বলেই মনে করছেন বোদ্ধামহল। যা থেকে উত্তরণের আপাতত কোন পথ দেখা যাচ্ছে না।

বিশিষ্টজনরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় পুলিশে লোক নিয়োগ করার কারণেই দেশের এই মহাসর্বনাশটা হয়েছে। সরকারের  পুলিশ বাহিনীকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার প্রবণতাও এ সমস্যার জন্য দায়ি। ফলে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারিরা পেশাগত অসদাচরণ ও চাকুরীবিধি লঙ্ঘন দেশের রাজনীতিতে সক্রিয় ও নিয়ামক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। পুলিশ বাহিনীর শীর্ষকর্তাদের মুখে প্রায়শই রাজনৈতিক বক্তব্য শোনা যাচ্ছে। যা আমাদের দেশের গণমুখী প্রশাসন গড়ার ক্ষেত্রে অন্তরায়ই বলতে হবে।

পুলিশের কতিপয় সদস্যের হিংস্র আচরণে পুলিশ কর্মকর্তারাও হতবাক। সাম্প্রতিক একটি ঘটনায় পুলিশ প্রশাসনকে কিছুটা হলেও নড়েচড়ে বসতে দেখা গেছে। অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে বলে আপাতত মনে করা হচেছ। মোহাম্মদপুরে ব্যাংক কর্মকর্তা গোলাম রাব্বীকে ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়ের চেষ্টা ও নির্যাতনকারী পুলিশ কর্মকর্তা এসআই মাসুদকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার বরাতে জানা গেছে, প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে পুলিশ কর্মকর্তারা অপরাধ করে বেড়ালেও শাস্তি পেতে হয়েছে এমন নজির খুব একটা দেখা যায় না। কোনো কোনো ঘটনার পর অনেকেরই রহস্যজনকভাবে সুবিধাজনক স্থানে পদায়ন পর্যন্ত হয়। ফলে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যরা অতিমাত্রায় উৎসাহী হয়ে নানাবিধ অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। কারণ, তাদের অপরাধের কোন বিচার বা শাস্তি হয় না।

জানা গেছে,  কয়েক হাজার পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে পুলিশ সদর দফতরে এ ধরনের অভিযোগ জমা পড়লেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে ধামাচাপা পড়ে যাচেছ। সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণেই অপরাধী পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাচ্ছে না।  এ ছাড়াও আদালতে মামলা হলেও পুলিশ সদস্যদের শাস্তি পেতে হয় না। তারা অভিযুক্তদের বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখিয়ে মামলা মামলা প্রত্যাহারে  বাধ্য করেন। যা আবারও প্রমাণ হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তা গোলাম রাব্বীর ক্ষেত্রেও। তাকেও হাসপাতাল বেডে মামলা প্রত্যাহারের জন্য হুমকি দেয়া হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। আবার প্রায় ক্ষেত্রে অপরাধী পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে কেউ সাক্ষী দিতে চায় না। ফলে অসাধু এসব পুলিশ ক্রমশ হিংস্র হয়ে ওঠে এবং নতুন করে অপরাধ প্রবণতায় জড়িয়ে পরে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দুর্বলতা, সংকীর্ণ দলীয় মনেবৃত্তি, পুলিশ প্রশাসনে দলীয়করণ, পুলিশের অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং এবং চেইন অব কমান্ড দুর্বল হয়ে যাওয়ার কারণে পুলিশে অপরাধ প্রবণতা বেড়ে যাচ্ছে। পুলিশ বাহিনীতে জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে কোন নৈতিক মানদন্ড বিবেচনায় আনা হচ্ছে না; বরং যারা দলীয় রাজনীতির লেজুড়বৃত্তি করছে তাদেরকেই এই বাহিনীতে নিয়োগ করা হচ্ছে। ফলে পেশাদারিত্ব হারাতে বসেছে রাষ্ট্রের অতিগুরুত্বপূর্ণ এই বাহিনী।  কিন্তু পুলিশ বাহিনীর কতিপয় সদস্যের এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কোন কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয় বা হচ্ছে বলে কখনো শোনা যায়নি।

আসলে অপরাধীকে অপরাধী হিসাবেই চিহ্নিত করতে হবে। আর তা সে যেহোক না কেন। মূলত দেশে আইনের শাসন ও জনগণের জানমালের নিরাপত্তাবিধানের জন্য একটি গণমুখী পুলিশ প্রশাসন ও অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের কোন বিকল্প নেই। আর তা করতে ব্যর্থ হলে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও মারাত্মক অবণতি হতে বাধ্য। যা সরকারের জন্যও এক সময় বিপদ ডেকে আনতে পারে। 

অবশ্য সর্বসাম্প্রতিক ঘটনায় পুলিশ প্রশাসনকে বেশ তৎপর মনে হচ্ছে। পুলিশের আইজি এ কে এম শহীদুল হক এ বিষয়ে বলেছেন, পুলিশের অপরাধ প্রমাণিত হলে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম-কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, ব্যক্তিগত বিচ্যুতির দায় ডিপার্টমেন্ট নেবে না। পুলিশ সদস্যরা যেন অন্যায় কাজে জড়িয়ে না পড়েন সে জন্য কাউন্সিলিং ও ব্রিফিংয়ের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, সম্প্রতি শাহবাগ, যাত্রাবাড়ী ও মোহাম্মদপুরে পুলিশ সদস্যরা যেসব অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটিয়েছে তার তদন্ত হচ্ছে। অনেক ঘটনায় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। যাত্রাবাড়ীতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তার ওপর পুলিশের মারধরের ঘটনা তদন্তে দুটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।  আসলে পুলিশের শীর্ষকর্তাদের এমন ইতিবাচক বক্তব্যে দেশের মানুষ কিছুটা হলেও আশাবাদী হচ্ছেন। কিন্তু তা কতখানী বাস্তবসম্মত তা অবশ্য সময়ই বলে দেবে।

মূলত সেই ঔপনিবেশিক আমলের আইন দিয়েই পুলিশ প্রশাসন পরিচালনা করা হচ্ছে এখনও। দেশের সকল ক্ষেত্রেই পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগলেও পুলিশ প্রশাসন চলছে সেকেলে ট্রাডিশনেই। ফলে আমরা এই বাহিনীর কাছ থেকে কাঙ্খিত সেবা পাচ্ছি না। এ ছাড়া পুলিশের কর্মকান্ডের ক্ষেত্রে কোনো জবাবদিহিতাও নেই। এ বাহিনীকে বেপরোয়া ক্ষমতা দিয়ে স্বেচ্ছাচারি বাহিনীতে পরিণত করা হয়েছে। কোনো ধরনের অপরাধের  জন্য পুলিশকে  জবাবদিহিতা করতে হয় না।

সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো পুলিশবাহিনীকে রাজনৈতিকভাবে অপব্যবহার। এত বেশি রাজনৈতিক ব্যবহার হচ্ছে যে, কিছু পুলিশ সদস্য সুনির্দিষ্ট মন্ত্রী ও এমপির আদেশ মানা বা সেবাকেই দায়িত্ব মনে করছে, অন্য কাউকে সেবা দেওয়াকে ধর্তব্যের মধ্যেই আনছে না। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর বার্ষিক প্রতিবেদনগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের পুলিশ কখনোই তেমন একটা জনবান্ধব ছিল না। পুলিশ বাহিনী কর্তৃক প্রতিনিয়তই নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। এমনকি পুলিশি হেফাজতে নির্যাতনের উদাহরণও কম নয়। পরিস্থিতি উত্তরণের জন্য নতুন আইনি কাঠামো তৈরি করে পুলিশকে জনবান্ধব করার চেষ্টার কোনো বিকল্প নেই।

অভিজ্ঞমহল থেকে অভিযোগ করা হচ্ছে যে, পুলিশের অপকর্মের সাধারণত নিরপেক্ষ তদন্ত হয় না, সাসপেন্ডও করা হয় না, শুধু ক্লোজ করা হয়। পরে এদেরই অনেকে বড় বড় পোস্টে কাজ করেন।  পুলিশের বেপরোয়া আচরণের পেছনে কাজ করছে তাদের আর্থিক লেনদেনে চাকরি নেওয়া ও রাজনৈতিকভাবে পদোন্নতি পাওয়া।   পুলিশের বিচার পুলিশ নিজেরাই করছে। ফলে জবাবদিহিতাও নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই তারা নিজেদেরকে সকল আইনের উর্দ্ধেই মনে করতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। তাই এই বাহিনী জনতুষ্টির পরিবর্তে জনআতঙ্কে রূপ নিয়েছে কতিপয় বিপদগামী পুলিশ সদস্যের কারণে।

আসলে পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটাতে হলে পুলিশের  নিয়োগ প্রক্রিয়া অবশ্যই স্বচ্ছ করতে হবে। যোগ্যদের অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে নিয়োগ দিতে হবে। এ ছাড়া পুলিশ আইনের সংস্কারও সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। জানা গেছে, বর্তমানে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় টহল পুলিশ, বিশেষ করে রাতে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশের ইউনিটগুলো সম্পর্কে বিস্তর অভিযোগ সাধারণ নগরবাসীর। মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিতে নিরীহ মানুষকে সন্দেহভাজন জঙ্গি হিসেবে আটক করা হয়েছে বলে জানানো হয় বা হত্যাসহ কোনো গুরুতর মামলার সন্দেহভাজন আসামি কিংবা মাদক-কারবারি হিসেবে আদালতে চালান করা হবে বলে ভয়ভীতি দেখানো হয় টহল গাড়িতে তুলে।

ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন আটক ব্যক্তি। সর্বস্ব পুলিশের হাতে তুলে দিয়ে এবং নিকটজনদের ফোন দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা যোগার করে পুলিশের অবৈধ চাহিদা পুরুণ করা হয়। সম্প্রতি মোহাম্মদপুরের আসাদগেট এলাকা থেকে মোহাম্মদপুর থানার এসআই মাসুদ রানা শিকদারসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্য কর্তৃক বাংলাদেশ ব্যাংকের জনসংযোগ বিভাগের সহকারী পরিচালক গোলাম রাব্বীকে তুলে নিয়ে বেদম প্রহারের পর মেরে ফেলার ভয় দেখানো হয়। প্রাণ বাঁচাতে পাঁচ লাখ টাকা দিতে হবে বলে দাবি করে পুলিশের ওই দলটি। তবে কোনোক্রমে ছাড়া পাওয়ার পর রুখে দাঁড়িয়েছেন গোলাম রাব্বী।  তেজগাঁও বিভাগের ডিসি বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছেন তিনি।

সেদিন সকালেই রাজধানীর রূপনগরের আরিফাবাদ এলাকার এক নম্বর সড়কের ই নম্বর ব্লকের  একটি বাড়িতে ঢুকে পেন্ডিং মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে রূপনগর থানার দুই কর্মকর্তা পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন বলে অভিযোগ করেন শামসুল হুদা তুহিন নামে এক ব্যবসায়ী। এ বিষয়ে ওই ব্যবসায়ী থানা পুলিশের সহযোগিতা চেয়েও ব্যর্থ হয়ে  পুলিশের ডিএমপি কমিশনার ও মিরপুর বিভাগের ডিসি বরাবর লিখিত অভিযোগ দেন।

ভাড়াটিয়াদের তথ্য সংগ্রহের কথা বলে গত ৮ ডিসেম্বর বাসায় ঢুকে বাড়িওয়ালাকে পেন্ডিং মামলায় ফাঁসানোর ভয়ভীতি দেখিয়ে ২ লাখ ৮৫ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ তুলে গত ১২ ডিসেম্বর মিরপুর বিভাগের ডিসির দফতরে রূপনগর থানার দুই পুলিশের বিরুদ্ধে লিখিতভাবে অভিযোগ দেন রূপনগরের ইস্টার্ন হাউজিং এলাকার বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী শামসুজ্জোহা ফরহাদ।

ডিবি পরিচয়ে রাজু নামে এক যুবককে বাসা থেকে তুলে নিয়ে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ এনে গত ১৯ নভেম্বর মিরপুর মডেল থানার দুই এসআই ও এক এএসআইয়ের বিরুদ্ধে পুলিশের মিরপুর বিভাগের ডিসি বরাবর লিখিত অভিযোগ দেন তার মা তাসলিমা আক্তার। পরে মুক্তিপণ বাবদ রাজুর স্বজনদের কাছে পাঁচ লাখ টাকা দাবি করেন। অনেক চেষ্টা করেও এ বিশাল অঙ্কের টাকা জোগাড় করতে পারেননি রাজুর স্বজনরা। তাই ইয়াবা দিয়ে মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে তাকে আদালতে চালান দেওয়া হয়।

পুলিশ বাহিনীর কতিপয় অসৎপ্রবণ ও অতিউচ্চাভিলাষী সদস্যের কারণেই গোটা বাহিনীই এখন ইমেজ সংকটে পড়েছে। জনগণ এখন পুলিশবাহিনীকে জনবান্ধব মনে করতে পারছে না। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য অবশ্যই পুলিশ বাহিনীর নিয়োগ প্রক্রিয়া অবাধ, সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ করতে হবে। নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতর ব্যক্তিদেরকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। অভিযুক্তদের স্বচছ ও গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়ায় বিচার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

সর্বোপরি বিদ্যমান পুলিশ আইনের সংস্কার, যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ এবং মূল্যবোধ সৃষ্টি এবং সকল কাজের জন্য তাদেরকে জবাবদিহিতার আনার কোন বিকল্প নেই। রাজনৈতিক স্বার্থে পুলিশ বাহিনীর অপব্যবহারও রোধ করতে হবে। তাই এই বাহিনীর শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে একটি জনবান্ধব বাহিনীতে পরিণত করা সম্ভব হবে। দেশের মানুষ সরকারে কাছে দায়িত্বশীল আচরণই আশা করে।

সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা

[email protected]

ঢাকা- ১৯ জানুয়ারি/১৬ ইং

বি.দ্র. মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব। টাইমনিউজবিডির সম্পাদকীয় নীতিমালার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই।