নিজের ঘাড়ে পড়ার পর নড়ে বসেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সাংবাদিক জেমস ফলিকে শিরশ্ছেদ করে হত্যার পর সুন্নি জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটকে (আইএস) সমূলে উৎপাটন করতে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েছে ওয়াশিংটন। কিন্তু সময় অনেক গড়িয়েছে। বিস্তার, কৌশল, সামরিক ও আর্থিক সামর্থ্যে আইএস এখন পরিপক্ব, দারুণ শক্তিশালী। তাদের দমন অত সহজ হবে না। নামতে হবে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে।

গত জুনে বিশ্ববাসীকে তাক লাগিয়ে দেয় আইএস। ইরাকে সরকারি বাহিনীকে হটিয়ে একের পর শহর-অঞ্চল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয় তারা। ইরাক ও সিরিয়ায় নিজেদের দখলে থাকা অঞ্চল নিয়ে ‘খেলাফত’ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়। তাদের খলিফা সংগঠনের প্রধান আবু বকর আল-বাগদাদি। রাজধানী সিরিয়ার আল-রাকাহ শহর। বিরোধীদের গণহারে হত্যা করে ইতিমধ্যে ব্যাপক কুখ্যাতি কুড়িয়েছে সংগঠনটি।

জামায়াত আল-তাওহিদ ওয়া-আল-জিহাদ নামে প্রায় এক দশক আগে আইএসের জন্ম। পরে ইসলামিক স্টেট অব ইরাক অ্যান্ড দ্য লেভান্ট (আইএসআইএল), ইসলামিক স্টেট অব ইরাক অ্যান্ড সিরিয়া (আইএসআইএস) প্রভৃতি নামে পরিচিতি পায়। কট্টরপন্থী সংগঠনটি ইরাকে মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধেও তাদের সংশ্লিষ্টতা আছে।

ইরাকে জঙ্গি সংগঠনটির অগ্রযাত্রা ঠেকাতে সম্প্রতি সীমিত বিমান হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। এমন প্রেক্ষাপটে সিরিয়ায় অপহৃত ফলির শিরশ্ছেদের মাধ্যমে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের গলায় ছুরি চালিয়েছে আইএস। একে ‘সন্ত্রাসবাদী আক্রমণ’ বলে অভিহিত করেছে ওয়াশিংটন।

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী চাক হেগেল এই সংগঠনটিকে নিজেদের জন্য ‘দীর্ঘমেয়াদি হুমকি’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেন, ‘এরা শুধু একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী নয়, তার চেয়েও বেশি কিছু। তারা আদর্শের সঙ্গে অসাধারণ কৌশলগত ও সামরিক দক্ষতার সমন্বয় ঘটিয়েছে। তাদের পেছনে অর্থের জোগানও আছে অঢেল। এমনটা আমরা আগে কখনো দেখিনি।’

দেশটির সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্তা জেনারেল মার্টিন ডেম্পসি অকপটে স্বীকার করেছেন, আইএসের বিরুদ্ধে লড়াই হবে দীর্ঘ। গোষ্ঠীটিকে ধ্বংস করতে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় শক্তির সব হাতিয়ার তথা কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক ও তথ্যগত শক্তি ব্যবহার করতে হবে।

আইএসের প্রায় ৮০ হাজার প্রশিক্ষিত যোদ্ধা আছেন। এর মধ্যে সিরিয়ায় ৫০ হাজার ও ইরাকে ৩০ হাজার। তাদের আছে জঙ্গি হেলিকপ্টার, পরিবহন বিমান ও অত্যাধুনিক সব সমরাস্ত্র। এই দুই দেশের বাইরে লেবাননেও তৎপর আইএস। বিভিন্ন দেশে আছে তাদের মিত্র। সব মিলিয়ে বিশ্ব ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য ভয়ংকর হয়ে উঠেছে আইএস।

উদ্বিগ্ন ওবামা প্রশাসন বলছে, ইরাকের ভেতরে আইএসের বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালাতে তারা প্রস্তুত। তবে আইএসকে দমাতে ইরাকের প্রতিবেশী সিরিয়ায়ও সামরিক অভিযানের কথা সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। মার্টিন ডেম্পসি স্পষ্ট করে বলেছেন, সিরিয়ার ঘাঁটিতে হামলা চালাতে না পারলে আইএসকে ধ্বংস করা যাবে না।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার কৌশলগত যোগাযোগবিষয়ক উপ-উপদেষ্টা বেন রোডসেরও একই মত। তিনি বলেছেন, আইএসের বিরুদ্ধে কোনো কৌশল নিতে চাইলে ইরাক ও সিরিয়া দুই দেশের সীমান্ত অঞ্চলের কথা বিবেচনা করতে হবে।

সন্ত্রাসবাদবিরোধী বিশেষজ্ঞ ব্রায়ান ফিশম্যানও মনে করেন, আইএসকে সত্যিকার অর্থে পরাজিত করতে ইরাক ও সিরিয়ায় পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দরকার পড়বে।

সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে না জড়ানোর বিষয়ে অনড় থাকা ওবামা প্রশাসনের জন্য এখানেই বড় চ্যালেঞ্জ। এ প্রসঙ্গে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, সিরিয়ায় আইএসকে কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, সে ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো পরিকল্পনা নেই।

ওবামা প্রশাসনের কর্মকর্তারা দ্য গার্ডিয়ানকে বলেছেন, আইএসকে পরাজিত করার সবচেয়ে ভালো দীর্ঘমেয়াদি কৌশল হলো সিরিয়ার মধ্যপন্থী বিদ্রোহীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া, যাতে তারা একই সঙ্গে আইএস ও বাশার আল-আসাদের বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়তে পারে।

এদিকে আসাদ সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আইএসকে দমনে যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে তারা কাজ করতে চায়।

সিরিয়ায় আইএস জঙ্গিদের ওপর ইতিমধ্যে গোয়েন্দা বিমান দিয়ে নজরদারি শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন কর্মকর্তারা গত সপ্তাহে এ খবর নিশ্চিত করেছেন। এ পদক্ষেপের মাধ্যমে আইএস জঙ্গিদের ওপর মার্কিন বিমান হামলার পথ সুগম হতে পারে। তবে সিরিয়া জানিয়ে দিয়েছে, তাদের ভূখন্ডে কোনো সামরিক পদক্ষেপের জন্য আগে থেকে সমন্বয় করে নিতে হবে।

ফলির ঘটনার পর আইএসকে দমাতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করার লক্ষ্যে কাজ করছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে কাজটি খুব সহজ হবে না। এই যেমন আইএসের হুমকির বিষয়ে একমত হলেও মধ্যপ্রাচ্যনীতির অন্যান্য দিক নিয়ে অনেক আরব দেশের মধ্যে মতভেদ আছে।

আইএসকে মোকাবিলায় ইরাকে একটি শক্তিশালী সরকার দরকার। এ জন্য অঞ্চলটির সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সহায়তাপ্রত্যাশী ওয়াশিংটন। এ ছাড়া আইএসে বিদেশি যোদ্ধা ও অর্থের প্রবাহ বন্ধেও তাদের আন্তরিক সহযোগিতা অপরিহার্য। এ প্রসঙ্গে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ম্যারি হার্ফ জানান, আইএসকে রুখতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে, অঞ্চলটির এমন যেকোনো দেশের সঙ্গে কাজ করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। এ ছাড়া অন্যান্য দেশেরও সহযোগিতা চায় ওয়াশিংটন।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ মনে করেন, আইএসের বিরুদ্ধে বিশ্ব সংগঠিত না হলে, ফলির মতো আরও ঘটনা ঘটবে।

ওয়াশিংটনের আশা, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আইএসকে ঠেকাতে সিরিয়া ও ইরাক সীমান্তে নজরদারি জোরদার করবে তুরস্ক। এ ছাড়া কাতারও তাদের অবস্থান বদলাবে।

আইএসের বিদেশি অর্থায়ন বন্ধে আন্তর্জাতিক তৎপরতা কতটা ফলপ্রসূ হবে, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। কারণ, সংগঠনটির আয়ে বিদেশি অর্থায়নের ভূমিকা খুবই কম বলে মনে করেন আটলান্টিক কাউন্সিলের ফেলো ফয়সল ইতানি। তাঁর দাবি, গোষ্ঠীটির তহবিল ও আয়ের সিংহভাগ আসে অভ্যন্তরীণভাবে।

ইরাকের ওপর দেশটির সরকারের পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হলে আইএসের অর্থের উৎস নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে বলে মনে করেন ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের স্টেইন প্রোগ্রাম অন কাউন্টারটেরোরিজম অ্যান্ড ইনটেলিজেন্সের পরিচালক ম্যাথু লেভিট৷

আইএসকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করতে ওবামা প্রশাসনকে আরও আগ্রাসী ভূমিকা নিতে হবে বলে মত দিয়েছেন কয়েকজন বিশ্লেষক। তাঁদের মতে, ওবামাকে ইরাক ও সিরিয়ায় বোমা হামলা বাড়াতে হবে। এই যুদ্ধে পশ্চিমা ও আরব মিত্রদেরও সঙ্গে নিতে হবে। এ ছাড়া এই যুদ্ধে বাগদাদের পাশাপাশি দেশটির কুর্দি ও সুন্নি আদিবাসীদের ওপর নির্ভর করতে হবে ওয়াশিংটনকে।

ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের ম্যাথু লেভিট বলেন, আইএসের অগ্রযাত্রা থামাতে নানা ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করতে হবে। তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ, বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপ। ইরাক ও সিরিয়া উভয় দেশের সীমান্ত দিয়ে হামলা চালাতে হবে।

গত কয়েক সপ্তাহে ইরাকে বেশ কিছু হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। কিন্তু আইএসকে ছিন্নভিন্ন করতে যুক্তরাষ্ট্রকে তার বিমানশক্তির পুরোটাই কাজে লাগাতে হবে বলে মনে করেন মার্কিন বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লে. জেনারেল ডেভ ডেপটুলা। এই ধরনের আগ্রাসী হামলায় ২০০১ সালে আফগানিস্তানে তালেবানের পতন হয়েছিল। সূক্ষ্ম বিমান হামলা চালাতে নির্দেশনা পাওয়ার জন্য আরও বিশেষ অভিযান পরিচালনাকারী বাহিনী মোতায়েন করতে ওয়াশিংটনকে পরামর্শ দিয়েছেন কিছু বিশ্লেষক।

এসব কৌশলের বাইরে জঙ্গি সংগঠনটিকে দমাতে ইরাক ও সিরিয়ায় আইএস-বিরোধী স্থানীয় বাহিনীগুলোকে অস্ত্র ও অন্যান্য সহায়তা দিয়ে শক্তিশালী করার ব্যাপারেও পরামর্শ এসেছে। (সূত্র: প্রথম আলো)