বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিণে। গত শনিবার থেকে বিরোধী বিএনপি প্রধান বেগম খালেদা জিয়াকে তার কার্যালয়ে পুলিশ ও নিরাপত্তারীরা অন্তরীণ রেখেছে।

তার দল গত বছরের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রথম বার্ষিকীতে একটি সমাবেশ ডেকে ছিল। সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই এই পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে। বিএনপি ও তার মিত্ররা ওই নির্বাচন বয়কট করে। যার ফলে আওয়ামী লীগ ও তার মিত্রদের পে জয়লাভ করা সহজ হয়।

এরপর থেকে বিএনপি ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে গণতন্ত্র হত্যা দিবস হিসেবে চিহ্নিত করে আসছে। কিন্তু বেগম জিয়ার অন্তরীণ রাখাকে কেন্দ্র করে দল সারা দেশে অনির্দিষ্টকাল ধরে অবরোধের ডাক দিয়েছে।

এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, গত নির্বাচনে অংশ না নিয়ে বিএনপি বিরাট ভুল করেছে। এতে করে স্পষ্ট হয়েছে, দলটির যারা নেতৃত্বে রয়েছেন, তাদের নেতৃত্বদান অকার্যকর ও অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে।

এই নেতৃত্ব বলছে, দশম জাতীয় নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়নি কারণ তা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়নি। তাদের এই দাবি শিশুসুলভ। বাংলাদেশ সংবিধানের ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিলোপ ঘটেছে; কিন্তু সরকার ওই সংশোধনী আইনি প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন করেছে।

পার্লামেন্টে ভোটাভুটির মাধ্যমে তা পাস হয়েছে। তখনো বিএনপি সংসদে থেকে ওই বিল পাসের কার্যধারা বয়কট করে চলছিল। আওয়ামী লীগকে বিল পাসে সেজন্য তেমন কোনো বেগ পেতে হয়নি।

এ ছাড়া পূর্ববর্তী সরকারের পে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়ার ভালো কারণ ছিল। আওয়ামী লীগই একদা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন করেছিল। এমনকি সেজন্য তারা ১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ সংসদ বয়কট করেছিল। এর ফলে বিএনপি বাংলাদেশের সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংযোজনে বাধ্য হয়েছিল।

কিন্তু শেষবার ২০০১ থেকে ২০০৬ সালে ক্ষমতায় থেকে বিএনপি যখন তত্ত্বাবধায়ক প্রশাসনের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করল, তখন বিপত্তি দেখা দিলো। ওই তত্ত্বাবধায়ক সরকার গণতন্ত্রকে প্রায় দুই বছর ধরে স্থগিত করে দিলো।

তারা বেগম খালেদা জিয়া এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে জেলে পুরলো। যদিও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মুখ্য কাজ হচ্ছে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন পরিচালনা করা; কিন্তু ২০০৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০০৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাংলাদেশে গণতন্ত্রের প্রতি আঘাত হানলো।

এই কারণেই পূর্ববর্তী সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করে দিলো। তারা যুক্তি দিলো, এই বিষয়ে আওয়ামী লীগের সাথে দ্বিমত করতে বিএনপির পুরোপুরি স্বাধীনতা রয়েছে।

এমনকি তারা ক্ষমতায় গিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনরুজ্জীবনের অধিকার করতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো আজকের যুক্তি তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে অনুপস্থিত এবং বিএনপি যদি সত্যিই আইন প্রণয়নে সংসদের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করে তাহলে তাকে অবশ্যই বাস্তবতা স্বীকার করতে হবে এবং পরিবর্তিত প্রোপট মেনে নিয়েই তাকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে হবে।

তবে এসব সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ বিএনপির সাথে একটি সংলাপের উদ্যোগ না নিয়ে ভুল করেছে।

সত্য বটে, তারা নৈতিকভাবে এবং আইনগতভাবে সঠিক। কিন্তু তারা আজকের বাংলাদেশের রাজনৈতিক গোলযোগ উপেক্ষা করতে পারে না। বিএনপি যদিও সংসদের বাইরে রয়েছে, তদুপরি তারা জনগণের উল্লেখযোগ্য অংশের প্রতিনিধিত্ব করে। এটা এমন একটি সরল সত্য, আওয়ামী লীগ যা এড়িয়ে যেতে পারে না।

বাংলাদেশের সমাজ ইতোমধ্যেই জনগণের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার দিক থেকে একেবারে মাঝখান থেকে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এটা বাংলাদেশী গণতন্ত্রের জন্য একেবারেই ইতিবাচক নয়।

রক্তস্নাত এবং ডামাডোলপূর্ণ ইতিহাসে এফোঁড়-ওফোঁড় হওয়া বাংলাদেশ যদি এখন সমৃদ্ধি ও সামনের দিকে অগ্রসর হতে চায়, তাহলে তাকে এই বিভক্তির মধ্যে সেতু স্থাপন করতে হবে।

এটা সুখপ্রদ যে, বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির প্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ মতপার্থক্য ঘুচাতে সংলাপের জন্য সব দলকে বৈঠকে বসতে আহ্বান জানিয়েছেন।

বাংলাদেশের এখন দারুণভাবে একটি নতুন রাজনৈতিক ঐকমত্য দরকার। সেটা কেবল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বাভাবিকীকরণের জন্য নয়, বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার স্বার্থেও দরকার। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক অস্পৃশ্যতা ঘুচিয়ে ফেলার এখনই সময়। (টাইমস অব ইন্ডিয়া থেকে)।

(সূত্র: দৈনিক নয়া দিগন্ত)

এমকে