বরিশাল বিভাগের ৬ জেলার ৪০ টি উপজেলার মধ্যে দুই দফায় তিন জেলার ৮টি উপজেলায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এরমেধ্যে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগ পেয়েছে ৬টি, আর বিএনপি পেয়েছে মাত্র দুটি।
১৯ ফেব্রুয়ারি প্রথম দফায় অনুষ্ঠিত ৩টি উপজেলার সবকটিতেই নিজেদের বিজয় নিশ্চিত করে নেয় আওয়ামী লীগ। এরমেধ্যে বরিশাল জেলার গৌরনদী ও বাকেরগঞ্জ এবং ভোলা জেলার লালমোহনে একতরফা সিল পিটিয়ে কথিত ‘বিজয়’ নিজেদের ঘরে তুলে নেয় আওয়ামী লীগ। আর বিএনপির নেতাকর্মিদের চোখের সামনে প্রকাশ্যে কারচুপি হলেও তারা কোন ধরনের প্রতিরোধ গড়ে না তুলে ভোটের দিন ‘নির্বাচন বর্জন’ করে নিজেদের দায়িত্ব শেষ করে।
একিই অবস্থা হয়েছে ২৭ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে। সেদিন অনুষ্ঠিত বরিশাল বিভাগের ৩ জেলার ৫টি উপজেলা নির্বাচনে ৩টিতে নিজেদের বিজয় নিশ্চিত করে নেয় আওয়ামী লীগ। আর ভোটকেন্দ্রে শক্ত অবস্থান ও কিছুটা প্রতিরোধ গড়ে তুলে ২টিতে বিজয়ী হয় বিএনপি প্রার্থীরা। দ্বিতীয় দফায় আওয়ামী লীগের বিজয়ী উপজেলাগুলো হচ্ছে বরিশাল সদর, ভোলার চরফ্যাশন ও বোরহানউদ্দিন উপজেলা। এসব উপজেলায়ও ‘নির্বাচন বর্জন’ করে নিজেদের দায়িত্ব শেষ করে বিএনপি। আর প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে নিজেদের শক্ত অবস্থান বজায় রেখে বিএনপি নিজেদের বিজয় নিশ্চিত করে পিরোজপুরের কাউখালী ও নাজিরপুর উপজেলায়।
দুই দফা উপজেলা নির্বাচনেরই সংবাদ সংগ্রহ করেছেন এই প্রতিবেদক। আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নিয়ে প্রকাশ্যে সিল মারার দৃশ্যসহ সচিত্র প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে গণমাধ্যমে। নির্বাচনী সংবাদ সংগ্রহকালে ভোট দিতে না পারা অনেক ভোটারকে বলতে শোনা গেছে ‘স্বৈরাচারী এরশাদের সময়ও এমন প্রকাশ্য ভোট ডাকাতির ঘটনা ঘটেনি’।
এদিকে বিএনপির ঘাটি হিসেবে পরিচিত বরিশাল সদর উপজেলায় বিশাল ব্যবধানে বিএনপির প্রার্থীকে পরাজিত করে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর বিজয় নিয়ে চলছে নানামুখী বিশ্লেষণ। গত ২ যুগেরও বেশি সময় ধরে বরিশাল সদর আসনে বিএনপি প্রার্থীরা বিজয়ী হয়ে আসছেন। এই সদর আসন থেকেই ৫ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোঃ মজিবর রহমান সরোয়ার। গত উপজেলা নির্বাচনেও বরিশাল সদর উপজেলা থেকে বিজয়ী হয়েছিলেন বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট আজিজুল হক আক্কাস। বিএনপির এই ঘাটিতে আওয়ামী লীগের প্রকাশ্য ভোট ডাকাতির প্রতিবাদে একটি ভোটকেন্দ্রেও বিএনপির পক্ষ থেকে কোন প্রতিরোধ গড়ে না তুলে ভোটের দিন সহজ পন্থায় ‘নির্বাচন বর্জন’ করার বিষয়টি সহজভাবে মানতে পারছেন না বিএনপি সমর্থক ভোটাররা।
তাছাড়া আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীর বিজয় নিশ্চিত করতে বরিশাল সদর আসনের সংসদ সদস্য (বিনাভোটে নির্বাচিত) অ্যাডভোকেট মোঃ শওকত হোসেন হিরন ভোটকেন্দ্রগুলোতে সরাসরি উপস্থিত থেকে মরিয়া হয়ে যেসব বিতর্কিত কর্মকান্ড ঘটিয়েছেন তার বিপরীতে বরিশাল বিএনপির অভিভাবক খ্যাত অ্যাডভোকেট মোঃ মজিবর রহমান সরোয়ারসহ জেলা এবং মহানগর বিএনপির শীর্ষ নেতাদের ভোটের দিন কোন ভোট কেন্দ্রে না যাওয়ার বিষয়টিও ‘রহস্যজনক’ বলে মনে করছেন কেউ কেউ। অনেকে বলছেন, সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মজিবর রহমান সরোয়ার সরাসরি ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত থেকে সাহসিকতার সাথে যেভাবে আওয়ামী লীগের ‘ভোট ডাকাতির চেষ্টা’র বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন তার আংশিক ভূমিকাও এবার উপজেলা নির্বাচনের দিন পালন করেন নি। অনেক বিএনপি সমর্থক মনে করেন, সদর উপজেলা নির্বাচনের দিন ভোটকেন্দ্রগুলোতে সাবেক এমপি সরোয়ার স্বশরীরে উপস্থিত থাকলেও আওয়ামী লীগ এমন প্রকাশ্য ভোট ডাকাতির সাহস করতো না।
এবিষয়ে অ্যাডভোকেট মোঃ মজিবর রহমান সরোয়ার বলেন, বরিশাল সদরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ভোট গ্রহন শুরুর আগেই প্রশাসনের সহায়তায় যেভাবে ভোটকেন্দ্র দখল করে নিয়েছে তাতে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার মত কোন পরিবেশ ছিলনা। তাই আমরা প্রশাসনকে এসব অনিয়মের বিষয়ে অভিযোগ জানিয়েও কোন সহযোগিতা না পেয়ে সকাল ১০টার পরে নির্বাচন বর্জন করি।
বরিশালের সবকটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ভোট কারচুপির অভিযোগ এনে বিএনপি প্রার্থীদের ধারাবাহিক নির্বাচন বর্জন বিষয়ে বরিশালের সিনিয়র নির্বাচন কর্মকর্তা দুলাল তালুকদার জানান, আমরা নির্বাচন সুষ্ঠু করার চেষ্টা করেছি। কোন প্রার্থী আমাদের কাছে অভিযোগ না করে ‘নির্বাচন বর্জন’ করে থাকলে এটা তাদের ব্যাপার। তিনি বলেন, তরপরেও কারও কোন অভিযোগ থাকলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিরা আইনের আশ্রয় নিতে পারেন।
বরিশাল মহানগর যুবদলের সাধারন সম্পাদক অ্যাডভোকেট আকতারুজ্জামান শামীম বলেন, আওয়ামী লীগের ‘ভোট ডাকাতি’র বিরুদ্ধে ভোটকেন্দ্রগুলোতে বিএনপির পক্ষ থেকে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারলে পরবর্তী উপজেলা নির্বাচন গুলোতেও তারা (আওয়ামী লীগ) এভাবে সিল টাকিয়ে নির্বাচনী ফল একতরফাভাবে নিজেদের ঘরে নিয়ে যাবে। এসব বিষয়ে বিএনপি তথা ১৯ দলকে এখন থেকেই সতর্ক পদক্ষেপ নিতে হবে।
লেখক: সাংবাদিক
email: [email protected]
মতামত
বিএনপির নির্লিপ্ততায় আওয়ামী লীগের প্রকাশ্য ভোট ডাকাতি
বরিশাল বিভাগের ৬ জেলার ৪০ টি উপজেলার মধ্যে দুই দফায় তিন জেলার ৮টি উপজেলায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এরমেধ্যে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগ পেয়েছে ৬টি, আর বিএনপি পেয়েছে মাত্র দুটি।





