কয়েকজন গাজাখোর ছাড়া ৭ বিলিয়ন বনি আদমের মধ্যে বাকি সবাই গাজার ঘটনা নিয়ে হতাশ, উদ্বিগ্ন ও মর্মাহত । এক দৃশ্য থেকে অন্য দৃশ্য আরো মর্মান্তিক। এক কাহিনী থেকে অন্য কাহিনী আরো হৃদয়বিদারক।

সাত বছর বয়সী মোহাম্মদ আল বাত্স এর কাহিনী দুনিয়ার সমস্ত ট্রাজেডিকে হার মানাবে । মারাত্মক আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে আনা হয়েছে । পরিবারের সকল সদস্য নিহত হয়েছেন। তার মধ্যে দুই বছরের ছোট ভাইটিও রয়েছে । মারাত্মকভাবে আহত আল বাতস ডাক্তারদেরকে তার শরীর স্পর্শ করতে দিচ্ছে না। তার দাবি হলো, আগে ভাইয়ের চিকিৎসা করো। ডাক্তারগণ তার মৃত ছোট ভাইকে চিকিৎসা দেয়ার মিথ্যে অভিনয় করলেই সে নিজে চিকিৎসা নিতে রাজি হয়।

এই ধরনের শত শত মর্মস্পর্শী কাহিনী সৃষ্টি হচ্ছে গাজা নামক ভূ-খন্ডে। ভীতসন্ত্রস্ত মায়ের কোলে আশ্রয় নিচ্ছে তার ছোট ছোট সন্তান। অসহায় মা দুই হাতে সবাইকে জড়িয়ে ধরে কাতর চোখে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। সে জানে এই আশ্রয় শুধু মিথ্যা সান্ত্বনা ছাড়া কিছু নয় । কারন যে কোন মুহুর্তেই বোমার আঘাতে নিজে সহ তার কলিজার টুকরাগুলি নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে।

এই ধরনের নিঃশ্বাস বন্ধ করা ছবি ও খবরগুলি আসছে ফেইসবুক সহ বিকল্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলির মাধ্যমে।

অন্যদিকে বিশ্ব মোড়লগণ এবং তাদের বশংবদ মিডিয়া এখন ইনিয়ে বিনিয়ে বলতে চাচ্ছে যে এক হাতে তালি বাজে না। আত্মরক্ষার অধিকার ইসরাইলের রয়েছে!

The Guardian পত্রিকায় Gaza Crisis নিয়ে একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে । ছবিতে দেখা যাচ্ছে ইউনিফরম পরিহিত তিন জন ইসরাইলী মহিলা সৈনিক একই ভঙ্গিতে হাত দিয়ে মুখ ঢেকে কাঁদছে আর বলছে, "The hamas killed my friend, we need to kill them- not just the hamas militant but all the people in Gaza. What else should we do? Lose more friends? We don't have a choice- if we do not fight to the end, they will kill us."

শত শত আতংকিত ও সন্ত্রস্ত ফিলিস্তিনী নারী ও শিশুদের অসহনীয় দুর্ভোগের চেয়ে এই তিন নারী সৈনিকের কুম্ভীরাশ্রু বর্ষনের ছবি নিঃসন্দেহে অধিক সংখ্যক মানুষের কাছে পৌছে গেছে। মূলত গত কয়েক দশক ধরে এই কাজটিই এরা করে এসেছে। এদের কারসাজিতে দুনিয়ার সবচেয়ে মজলুম জাতি ও তাদের প্রতিরোধ যোদ্ধারা আজ সন্ত্রাসী হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। অন্য দিকে উৎপীড়ক পাচ্ছে বিশ্ব মোড়লদের সহানুভূতি ও নির্যাতনের নৈতিক লাইসেন্স।

সবকিছু দেখে মনে হচ্ছে তারা ধর্ষকের উন্মত্ততার চেয়ে ধর্ষণ প্রতিরোধে ধর্ষিতার নখের আঁচড়কে বড় করে দেখাচ্ছে। এই নখের আঁচড়ও ভয়াবহ মনে হতে পারে যদি ধর্ষণের গল্পটিও সামনে পেছনের পুরো ইতিহাসটি চেপে যাওয়া হয়। আত্মরক্ষার অধিকার আছে শুধু ধর্ষিতার। এক্ষেত্রে ধর্ষকের আত্মরক্ষার গল্প সকল মানবিকতা ও শুভবোধের প্রতি উপহাস মাত্র।

আমাদের দেশে অতি বিবেকবান বলে যাদের সুনাম রয়েছে তারাও গাজা ইস্যুতে চুপ মেরে গেছেন। দেশের প্রথম শ্রেণীর পত্রিকাগুলিও কোন এক অদৃশ্য সূতার টানে অনেকটা নীরব হয়ে আছেন। এই ঘরানার বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিকদের মধ্যে যারা মুখ খুলেছেন তাদের কথা জনগণের কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দিচ্ছে। এদের মধ্যে সবাইকে টপকে প্রথম স্থানটি দখল করেছেন প্রাক্তন মন্ত্রী হাছান মাহমুদ। গাজায় হামলাকারী ইসরাইলের ইহুদিদের সঙ্গে বিএনপির যোগাযোগ আছে বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগের এই প্রচার সম্পাদক ।

এই কথা বলে তিনি এক প্যান্ডোরার বাক্স খুলে দিয়েছেন। ইহুদিদের সাথে ঘর সংসার করা থেকে শুরু করে একই টোনে দেশ-জাতি-কৃষ্টি বিরোধী আর্টিকেল লেখার মত কাজ এখন পর্যন্ত কারা করেছেন তা দেশবাসী ভালোভাবেই জানেন।

মুসলিম মডারেট এই দেশটি কার্যকর গনতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নামক একটা সুন্দর রাস্তা খুঁজে পেয়েছিল। সেই রাস্তাটি নষ্ট করে গণতন্ত্রকে ভয়াবহ সংকটে ফেলা দেয়া হয়েছে। স্বাধীনতার চেতনার একটি সংকীর্ণ ও বিকৃত ব্যাখ্যা করে সেটাকেই গণতন্ত্রের প্রতিপক্ষ বানিয়ে ফেলা হয়েছে। অনেকে মনে করেন এবং তাতে যথেষ্ট যুক্তি রয়েছে যে ইহুদিদের আঁকা রোড ম্যাপ ধরেই এই কাজটি করা হয়েছে। লগি বৈঠার আন্দোলন থেকে শুরু করে, এক এগারোর জরুরি সরকার, ২০০৮ ও ২০১৪ এর নির্বাচন সবই হয়েছে মোসাদ এবং র এর যৌথ ব্যবস্থাপনায়। এটা আজ দিবালোকের মত স্পষ্ট।

আমাদের প্রতিবেশীর সাথে যখন থেকে ইসরাইলের কুটনৈতিক সম্পর্ক বেড়ে যায় তখন থেকেই আমাদের রাজনীতিতেও একটা বিশেষ অস্থিরতা ফুটে উঠে। এটা কাকতালীয় নয়, সুপরিকল্পিত।

তখন থেকেই ধর্মীয় উগ্রবাদ বা জঙ্গীবাদ এদেশে নতুন দিকে মোড় নেয় । তখন থেকেই রাজনৈতিক নেতা নেত্রীর সমাবেশে সশস্ত্র হামলা ভিন্ন মাত্রা ধারন করে । সিনেমা হল, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সমাবেশে বোমা ফাটানো জাতির জন্যে নতুন আপদ হিসাবে দেখা দেয়। অথচ এসব সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড অনেক আগে থেকেই এদেশে বিদ্যমান ছিল। ব্রিটিশ আমল থেকেই খেলাফত আন্দোলনের নামে ধর্মভিত্তিক রাজনীতিও চালু ছিল।

এ ধরনের যে কোন হামলা হলেই বশংবদ মিডিয়াকে ব্যবহার করে তদানিন্তন সরকারকে দায়ী করে নাস্তানাবুদ করে ফেলা হয় । বোমা মেরে ইসলাম কায়েমের নতুন জজবা সৃষ্টি হয় এবং তার দোষ চারদলীয় জোটের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া হয় । যে জোট সংসদে নিজেদের দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ব্যবহার করে সহজেই ইসলামী শাসন কায়েম করে ফেলতে পারতো- তারা কেন নিজেদের পায়ে কুড়াল মারতে এই বোমাবাজ জঙ্গীদেরকে পৃষ্ঠপোষকতা করতে গেলো ? মানুষের মনে এই ধরনের অনেক প্রশ্ন থাকলেও তারা নিজেদের পরিকল্পনা নিয়ে বাধাহীন ভাবে এগিয়ে যায়।

তবে মাঠ পর্যায়ে থেকে যে শায়েখরা এই কাজগুলি আাঞ্জাম দিয়েছে তারা তাদের মূল কম্যান্ড সেন্টারটি কোথায় ছিল তা ঠাহর করতে পারে নি। কারন কোন রাব্বি কোন শায়েখের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করবে না। এর জন্যে যে লম্বা চেইনটি ব্যবহার করা হবে তার তিন নম্বর লিংকটি পাঁচ নম্বর লিংককেও চিনবে না। শুধুমাত্র সার্বিক কাজের ফলাফলটি দেখে পুরো পরিকল্পনাটি বুঝতে হবে।

এই ধরনের গ্র্যান্ড ডিজাইনের আওতায় মহাজোটের যে সরকার এসেছে তাতে দেখা গেলো কিছু বামপন্থী নেতাদের গুরুত্ব অত্যধিক বেড়ে গেছে। শায়েখ আব্দুর রহমানের শ্যালক মির্জা আজমের পদবী ও গুরুত্বও বেড়ে গেছে । ক্ষমতার সম্মুখ সারিতে আরো যারা এসেছেন তাদের অনেকেরই দৃশ্যমান কোন কন্ট্রিবিউশন দেখা যায় নি। শুধু এক আবুলের দৌড়ের কাহিনী জানা গেলেও অন্যরা কিসের প্রতিযোগিতায় জয়ী হয়েছিলেন তা জানা যায় নি। কাজেই হাছান মাহমুদ এদেশে ইহুদি কানেকশনের যে ইঙ্গিত দিয়েছেন তা খুজে বের করতে গবেষকদের জন্যে উপরোক্ত তথ্যগুলি কাজে লাগতে পারে।

জায়নিষ্ট বা ইসরাইল ঘাবড়ে যায় মুসলিম বিশ্বে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কোন সিম্পটম বা নমুনা দেখতে পেলে । মিসরের সিসি আর বাংলার হাসিকে বোধহয় একই জায়গা থেকে বসানো হয়েছে। কাজেই হাছান মাহমুদরা গণতন্ত্র ধ্বংস করে এই ইহুদিদের পরিকল্পনাই বাস্তবায়ন করে যাচ্ছেন। তবে বিষয়টি তাদের মগজে কতটুকু ঢুকতে পারবে সেটা একটা বড় প্রশ্ন। কারন যারা ইহুদিদের মনে প্রাণে ঘৃণা করে ( যেমন মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ শাসক) তাদের মাধ্যমেও বিচক্ষণ ইহুদিরা তাদের পারপাজ সার্ভ করতে পারে।

হাছান মাহমুদের এই ইরিটেটিং মন্তব্যটি পড়ে আমার এক সিনিয়র ভাই আমার উপর খেপে গেছেন। আত্মপক্ষ সমর্থনে বললাম, 'স্যার, কথাটি এক জনের, কিন্তু আপনি খেপছেন অন্য নিরীহ আদমির ওপর?'

তাঁর জবাব, খেপছি এ কারনে যে তুমি এখনও কেন এই বিষয়টি নিয়ে লিখছো না ? দেখো, আমার শরীরের রক্ত টগবগ করে ফুটছে। প্রতি সেকেন্ডে গাজার অসহায় শিশুদের মুখগুলি ভেসে ওঠে। খেতে গেলে মনে হয় যেন খাবার গিলতে পারছি না। অসহায় বাচ্চাগুলির দিকে তাকালে নিজের সন্তানের মুখগুলি ভেসে ওঠে। এমতাবস্থায় এদেশের এক গাজাখোর নেতা গাজার অসহায় মানুষকে নিয়ে মশকরা করে আমার শরীর জ্বালিয়ে দিয়েছে। কাজেই তোমার লেখার রকেটটি আরো জোরে নিক্ষেপ করে আমার মনে একটু প্রশান্তি এনে দাও।

তার প্রিয়(একদা) আওয়ামী লীগ আজ এই ধরনের ইতর শ্রেণীর মানুষ দিয়ে ভরে গেছে দেখে তিনি খুবই কাতর হয়ে পড়েছেন। 'ইতর' শব্দটি বাদ না দেয়ার জন্যে তিনি বিশেষ নির্দেশ দিয়েছেন।

প্রিয় পাঠক, মনে করবেন না যে আমার এই সিনিয়র ভাইটি এখন বিএনপি- জামায়াত হয়ে পড়েছেন। বন্ধুমহলে তর্ক বিতর্কের সময় আওয়ামী লীগের পক্ষে শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত যার কন্ঠটি সরব থাকতো সেটি ছিলো তাঁর। এখন কষ্ট নিয়ে বলেন, এতদিন যাদের সাথে তর্ক করেছি তাদের অনেকেই এখন আওয়ামী লীগার হয়ে গেছে!

স্বাধীনতা যুদ্ধে অবদান রাখা এক শতটি পরিবারের তালিকা তৈরি করলে সেখানে তাঁর নিজের এবং তাঁর স্ত্রীর পরিবার নিঃসন্দেহে জায়গা করে নিবে । বঙ্গবন্ধু যেদিন নিহত হন সেদিন একজন অসহায় কিশোর হিসাবে সারাদিন কেঁদেছেন।

হিটলারের কথার(আমি কিছু ইহুদিকে বাঁচিয়ে রেখেছি যাতে মানুষ বুঝতে পারে কেন বাকিদের মেরেছি) সাথে মিল রেখে মেজর ডালিমের মুখ থেকে একটি কথা ফেইস বুকে ছড়িয়ে পড়েছিল। বিষয়টি তিনিই আমার নজরে এনেছিলেন । ফেইস বুক, টুইটার হলো ডিজিটাল দেয়াল । এই ডিজিটাল দেয়াল লেখনগুলি এই ডিজিটাল সরকার পড়তে পারে না, পড়ে না। তা দেখে তিনি অত্যন্ত আতংকিত হয়ে পড়েন। তাঁর শংকা , আওয়ামী লীগ আজ যা শুরু করেছে তাতে এই ধরনের কথার উপর বিশ্বাস স্থাপনকারীর সংখ্যা অনেক বেড়ে যাবে। কারন মানুষ কখনও কখনও পরাধীন হলেও চিন্তার ক্ষেত্রে মানুষের মনটি সর্বদা স্বাধীন।

এক আওয়ামী ভক্তের এই ধরনের মনোবেদনা বোঝার মত মন আওয়ামী লীগে আজ সত্যিই অনেক কমে গেছে।

যে কোন হত্যাকেই জাষ্টিফাই বা গ্লোরিফাই করা চরম গর্হিত কাজ। কিন্তু এক হত্যার নির্মম শিকারেরা যখন অন্য মানুষের উপর অত্যাচার নিপীড়নের মাত্রা বাড়িয়ে দেয় তখন হতাশ,ক্ষুদ্ধ ও ক্রুদ্ধ মানুষ এই ধরনের প্রচারণার খপ্পরে পড়ে যায়। বর্তমান আওয়ামী নেতৃত্বের উপর আওয়ামী মনা আমার এই বড় ভাইয়ের ক্ষোভটি মূলতঃ একারনেই। বঙ্গবন্ধুর হত্যা কোনভাবেই জাষ্টিফাই হোক তা তিনি চান না। তিনি ভয় পাচ্ছেন, আওয়ামী লীগ যদি তাদের পরিকল্পনামত জোর করে আসলেই ক্ষমতায় টিকে থাকে তবে তাই ঘটতে থাকবে। তাঁর এই আশংকা ও বিশ্লেষণটি আমার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে।

শাসক শ্রেণীর ঔদ্ধত্য মানুষকে ভয়ংকরভাবে খেপিয়ে তুলে। দেখা গেছে প্রতিটি স্বৈর শাসকের সময় ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও যন্ত্রণা দায়ক কথা বলে কিছু কমিক চরিত্র জনগণের মন ও কানকে বিষিয়ে তুলে। এক পর্যায়ে ত্যাক্তবিরক্ত জনগণ মনে মনে কামনা করে যে এই যন্ত্রণাগুলিকে স্টেডিয়ামে একদিনের জন্যে ছেড়ে দেয়া হোক।

এই কামনাটি শুধু জামায়াত-বিএনপি ঘরানার মানুষের মনেই উদয় হচ্ছে না- এই বড় ভাইটির মত অনেক পিওর আওয়ামী মনেও উদয় হচ্ছে। সূত্র: ফেসবুক।

লেখক- মীনার রশীদ, মেরিন ইঞ্জিনিয়ার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

ঢাকা, ২৬ জুলাই, টাইমনিউজবিডি.কম, এনএস