দীর্ঘ নয় মাস, তিরিশ লাখ জীবন, দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম, এক সাগর রক্ত, অর্ধকোটি যুদ্ধাহত মানুষ-এসবের বিনিময়ে পেলাম ৫:৩ আয়তনের একটি লাল সবুজের পতাকা। বিশ্বমানচিত্রে আমাদের জন্মভূমির জন্য স্থায়ী আসন নির্ধারিত হল। জন্ম হল বাংলাদেশের। এটা আমার বাংলাদেশ, গর্বের বাংলাদেশ, প্রানের বাংলাদেশ। মুক্তিযুদ্ধের দলিপত্রের ইতিহাসে ২৬ মার্চকে আমাদের স্বাধীনতা দিবস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু একটি ২৬ মার্চ পেতে আমাদেরকে সংগ্রাম করতে হয়েছে দীর্ঘ ২৩ বছর। অবশেষে আমরা পেয়েছিলাম স্বাধীনতার ঘোষণা এবং পরবর্তীতে পূর্ণ বিজয়ের দিন। পৃথিবীর একমাত্র জাতি হিসেবে বাংলাদেশীরা স্বতন্ত্র স্বকীয়তাপূর্ণ বৈশিষ্ট্যে ভাস্বর কেননা আমাদের রয়েছে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হওয়ার চিহ্ন হিসেবে দু’টি দিন। একটি স্বাধীনতা দিবস যা ২৬ মার্চ পালন করবো এবং অন্যটি ১৬ ডিসেম্বর আমাদের বিজয় দিবস।

……

৫৬ হাজার বর্গমাইলের এ ভূখণ্ডে জন্ম নেওয়া কোন বাংলাদেশী আমাদের স্বাধীনতাকে অস্বীকার করার নৈতিক এবং সাংবিধানিক অধিকার রাখে না। আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাস কারো দানে পাওয়া ইতিহাস নয়; এটা লাখো শহীদের জীবনের বিনিমেয় কেনা আমাদের অহংকার। বিশ্বের সকল জাতিকে সংগ্রাম করেই তার মাতৃঠিকানার স্বাধীনতাকে অর্জন ও সংরক্ষণ করতে হয়েছে। তবে সে সংগ্রামের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের রয়েছে নতুন ইতিহাস সৃষ্টিকারী সব উপাদান। বিশ্বের কোন জাতি মাত্র ৯ মাসের যুদ্ধে তাদের স্বাধীনতা লাভ করতে পারেনি; যেটা বাংলাদেশীরা পেরেছিল তাদের অদম্য সাহসের বলে। অবশ্য এত কম সময়ে এত অধিক সংখ্যক মানুষের প্রাণও হারাতে হয়নি কোন জাতিকে। সব কিছু ছাপিয়ে, বাংলাদেশের জন্মের ৪৬ বসন্ত পেরিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের স্বাধীনতার কথা স্মরণ করে কিছুটা অবাক হতে হয় বটে। যে উদ্দেশ্যকে মানদণ্ড করে দীর্ঘকালের মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের মাধ্যমে সূচিত হয়েছিল একটি স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশের-সে রাষ্ট্রের সেই উদ্দেশ্যগুলো কতটুকু সংরক্ষিত হয়েছে ?

……

* বাংলাদেশের স্বাধীনতা তখনই তাৎপর্যমণ্ডিত হবে যখন প্রত্যেক নাগরিক তার মনের ভাব (কথ্য ও লেখ্য) স্বাধীনভাবে প্রকাশ করার ক্ষমতা পাবে। এদেশের নাগরিকরা কতটুকু পেয়েছে সে স্বাধীনতা ?

…..

* রাষ্ট্রের স্বাধীনতা বলতে বুঝি এদেশের মানুষের জীবন ও সম্পদের সংরক্ষন । আমি আমার জন্মভূমির বর্তমান অবস্থাকে পাকিস্তান আমলের সাথে তুলনা করার মত বোকামী করব না কিন্তু গত ৫ বছরে যে অধিক সংখ্যক নিরীহ মানুষ অস্বাভাবিকভাবে প্রাণ হারিয়েছে-সেটা কি রাষ্ট্রের স্বাধনীতা সমর্থন করে ?

…….

 প্রতিবেশী বন্ধুপ্রতীম দেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর গুলিতে যদি প্রতি বছর শত মানুষকে জীবন দিতে হয় এবং এর জন্য জোড়ালো প্রতিবাদ করার সক্ষমতা আমরা দেখাতে না পারি তবে সে স্বাধীনতা ব্যক্তির উপকারে কতটুকু এসেছে ?

…….

 দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি প্রবেশ করার পরেও যখন রাষ্ট্র তার লাঘামটানতে ব্যর্থ হয় তখন সে স্বাধীনতা দিয়ে সাধারণ মানুষ কি করবে সেটা স্বাধীনতার কাছেই জানতে চাচ্ছি!

………

 গণতান্ত্রিক কাঠামোতে শাসনব্যবস্থা পরিচালনার জন্য রাষ্ট্রের নাগরিকরা যদি তার পছন্দসই প্রার্থী বাছাইয়ের সুযোগ না পায় তবে সেটা কোন অর্থে মানুষের মুক্ত স্বাধীনতার প্রকাশ ঘটায় ?

……

 দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে যে রাষ্ট্রের পরিচয় সৃষ্ট হল সে রাষ্ট্রের চার যুগ পার করার পরেও যদি আজও নিত্যদিন নারীকে সম্ভ্রম বিলাতে হয়, অনিরাপত্তা ও অনিশ্চয়তায় ভুগতেহয় তবে সে স্বাধীনতার যথার্থতা কোথায় ? আজও যখন দেখি, তনু হত্যার বিচারের জন্য মানুষকে রাস্তায় আন্দোলন নামতে হয় তখন এ চিত্র আমাদের দারিদ্রপুষ্ট স্বাধীনতার ইঙ্গিত দেয়।

…..

কষ্টের কথা জমে আছে বহু। প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিস্যা ক্রমশ জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। যার সবগুলো বলতে গেলে বিশাল ক্রমিকে দাঁড়াবে। এগুলো সব ক্ষোভের কথা, অপ্রাপ্তির কথা। আজ মিটল না তো কি হয়েছে আগামীকাল মিটবে। সর্বোপরি, আমরা স্বাধীন তো। আমাদের দেশটাকে আমরা আমাদের মত করেই গড়ে তুলব। শুধু সেদিনের প্রতীক্ষায়, যেদিন আমাদের দেশটা আমাদের মনের মত করে সাজাতে পারবো। বাংলাদেশ ! চিরজীবি হও । তোমার মধ্যেই দুধে-ভাতে বেঁচে থাকুক এদেশের প্রতিটি মানুষ, লতাগুল্ম, পশু-পাখি। সাগর-নদী সতত প্রবাহিত থাকুক কালান্তর জুড়ে। মুছে ঝাক শত গ্লানি, না পাওয়ার কষ্ট। শুধু স্বাধীনতাই হোক শ্রেষ্ঠ পাওয়া।

 

এমআই্এস।