আমি পাতা ঝরার শব্দ শুনতে পেয়েছি, হৃদয় আমার ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে। ইলিয়াসকে যতটুকু চিনেছি সহজ মানুষ বলে জেনেছি। সে আমার দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা, একজন ভালো বন্ধু কিন্তু কিছুটা সেন্টিমেন্টাল ছিল যা আমাকে উদ্বিগ্ন করতো ; তার সরলতার কারণে এটিকে কখনো ধর্তব্যের মধ্যে নেইনি।

স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী যে নয় জন ছাত্রদল নেতাকে সে সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয় ইলিয়াস আলী তাদের মধ্যে অন্যতম।

আজকে যারা বিএনপিতে প্রতিষ্ঠিত নেতা অনেকে এমপি মন্ত্রী হয়েছেন, আমি তাদের অনেকেরই বন্ধু কাম নেতা ছিলাম। এদের অনেকে আমার এবং বাবলু ভাইয়ের হাত ধরে বিভিন্ন রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠন থেকে এসে প্রথমে ছাত্রদল ও পরবর্তীতে বিএনপিতে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। আজকে তারা রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত হওয়া থেকে শুরু করে এমপি, মন্ত্রী হয়েছেন- এতে আমি খুবই খুশী এবং একজন পরিতৃপ্ত মানুষ।

আমি বরাবরই একটু লাজুক স্বভাবের কিন্তু সারাজীবনই আত্বসম্মানবোধ সম্পন্ন একজন মানুষ। একমাত্র আল্লাহ ছাড়া জীবনে কারো কাছে, কোন অন্যায়ের সাথে আপোষ কিংবা কখনো মাথা নত করিনি। সকল অবস্থাতেই সবার জন্য কল্যাণ কামনা ও ভালো কিছু করার চেষ্টা করেছি। নিজের জন্যে যা কিছু চেয়েছি, একজনের কাছেই চেয়েছি মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে ; যা পেয়েছি -- আমি পরিতৃপ্ত, যা কিছু হয়নি কল্যাণের জন্যেই হয়নি তাতে আরো অধিক পরিতৃপ্ত।

পৃথিবীতে সম্মানের সাথে বেচে থাকাটাই তো এক পরম পাওয়া। কারো প্রতি কোন অনুযোগ নেই এর চেয়ে পরম সুখ আর কিইবা হতে পারে ? একটি কথা - আমি সবাইকে গ্যারান্টি দিতে পারি, যদি কেউ আল্লাহ পাকের হাবীব মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি দরুদপাঠ করেন এবং উনাকে ভালোবাসতে পারেন তবে দারিদ্র এবং দুনিয়া ও আখিরাতের কোন প্রকার বালা মসিবত তাকে কখনো স্পর্শ করবে না।

সম্ভবত ১৩ অথবা ১৪ এপ্রিল ২০১২ রাতে আমার বন্ধু ইলিয়াসের সাথে শেষ দেখা। অনেক চেষ্টার পর শেষ পর্যন্ত তার সাক্ষাত পাওয়া গেলো। আমার যতটুকু মনে পড়ে-সে সময়ে দলীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে সে খুবই ব্যস্ত ছিলো ; বিশেষ করে সিলেট বিভাগের কমিটি ও ঢাকার রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে তখন সে খুবই ব্যস্ত সময় পার করছিলো। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া'র ডিপ্লোমা ইণ্জিনিয়ার্স ইন্সষ্টিটিউটের প্রোগ্রামের পরে তার সাথে আমার স্বাক্ষাত হয়, ছাত্রদলের সাবেক নেতা কামরুজ্জামান রতনের বাসায়। যেখানে রিজভী আহমেদ, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির একজন শিক্ষক ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাবেক ছাত্রদল নেতাও আমাদের সাথে উপস্থিত ছিলো।

উল্লেখিত সাক্ষাতের বিষয়ে রিজভী আহমেদ ও কামরুজ্জামান রতন আমাকে সহযোগীতা করেন। কামরুজ্জামান রতনের পূরাতন ডিওএইচএস এর বাসায় রাতের খাবার শেষ করে, ইলিয়াসকে তার নিরাপত্তা ; বিশেষ করে সরকারের তরফ থেকে তাকে গুম অথবা হত্যার বিষয়ে যে ষড়যন্ত্র হচ্ছে এ বিষয়ে আমরা তাকে বিশেষ মনোযোগী হওয়ার এবং সতর্ক থাকার অনুরোধ জানাই। বিশেষ করে খুব প্রয়োজন ছাড়া একা বাইরে না বের হওয়া ও রাতের বেলায় পার্টি অফিস অথবা অন্য কোথাও যেতে হলে সবাইকে- নূন্যতম ১০/১২ জনকে সাথে নিয়ে যেতে অনুরোধ করি।

তার পরের ঘটনা সবারই জানা। ১৭ এপ্রিল রাত আনুমানিক আড়াইটায় দুঃসংবাদটি জানানোর জন্য রতন এবং রিজভী আহমেদ আমাকে মোবাইল ফোনে চেষ্টা করে পাননি। কেননা রাত ১২টার টিভি নিউজ বিশেষ করে মতি ভাইয়ের চ্যানেল আই ও বাংলাভিশনে দৈনিক পত্রিকার হেড লাইন নিয়ে সংবাদ পর্যালোচনা দেখে আমি মোবাইল ফোন চার্জে দিয়ে (বন্ধ করে) ঘুমাতে যাই।

সকালে আনুমানিক সাড়ে দশটার দিকে ধানমন্ডিতে আমার নিজস্ব অফিসে রওনা করার মূহুর্তে ফোন অন করার পর প্রথমে রতন আমাকে জানায় যে, গত রাতে ১২টার পর গোয়েন্দা সংস্থার সাদা পোশাকধারী লোকজন ইলিয়াসের বাসার সামনের রাস্তা থেকে তাকে উঠিয়ে নিয়ে যায় এবং সে সময় রতন আমাকে রিজভী আহমেদ-এর সাথে কথা বলতে অনুরোধ করলে উনি আমাকে আক্ষেপের সাথে বলেন- নিরু ভাই মাত্র দুইদিন পুর্বে আপনি/আমরা তাকে সাবধান করলাম অথচ আজকে ইলিয়াস ভাই নেই। দূর্ভাগ্যজনক হলেও বলতে দ্বিধা নেই বিএনপি'র যে সকল ত্যাগী নেতারা আজকে সরকারের কোপানলে আছে, খুন ও গুম হয়েছে এর প্রতিটি ঘটনার সাথে বিএনপির কিছু নেতার সম্পৃক্ততা খুঁজে পাওয়া যাবে।

আমাদের নেত্রীর গুলশান অফিসের বেশিরভাগ কর্মকর্তা ও নীতি নির্ধারকরাই এখন সরকারের বি টিম - আর এ কারণেই সরকার দলীয় মন্ত্রী, বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃত্ব বিএনপিকে টিটকারী ও হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন ; আন্দোলনের চেষ্টা করলে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। তারা বিএনপিকে এখন নসিহত করছেন- মরা বিএনপি নাকি আর জীবিত হবে না, খালেদা জিয়াকে আগে দল গুছাতে এবং পরে আন্দোলন করার পরামর্শ দেন- সেম, এ লজ্জা কোথায় রাখি? আমরা যারা বুকের তাজা রক্ত দিয়ে একদিন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে রাজপথ থেকে রাজসিংহাসনে বসিয়েছি ; তারা এখন সবাই দলে নাই হয়ে গেছি।

শতকরা ৭০ ভাগ জনসমর্থন থাকার পরও বর্তমানে দলটির করুণ অবস্থা দেখে খুবই কষ্ট হয়। জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন থাকার পরও দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের বেইমানীর কারণে বারবার আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে তা মুখ থুবড়ে পড়েছে। যে দলটির প্রতিষ্ঠাতা একজন বীর সিপাহশালা, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক, মুক্তিযুদ্ধের কান্ডারি, অস্ত্র কাধে নিয়ে যিনি রণাঙ্গনে নেতৃত্ব দিয়েছেন, দেশের স্বাধীনতা ও স্বার্বভৌমত্বকে ছিনিয়ে এনেছেন একজন সেক্টর কমান্ডার, ১৯৭৫- এর ৭ই নভেম্বর ভারতীয় ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের হাত থেকে বাংলাদেশকে পুনরুদ্ধার করেছেন একটি সিপাহী জনতার সফল অভূত্থ্যানের মধ্যে দিয়ে এবং বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি ও সফল রাষ্ট্র্ নায়কও তিনিই। যিনি দেশমাতৃকার জন্য নির্ভয়ে প্রাণ বিলিয়ে দিয়েছেন সেই জিয়ার সৈনিকদের ভয় কিসের?

আমরা মাহবুবুল হক বাবলু, মাঈনুদ্দিন, জগলু, ইয়াহিয়া, বীর প্রতীক এটি এম খালেদ ও অসংখ্য ছাত্রদলের যোগ্য নেতৃত্বের উত্তরসূরী - আমরা ইলিয়াস আলীর উত্তরসূরী সুতরাং ভয় কিসের! আমরা ভারতীয় সকল প্রকার আগ্রাসন ও বিশ্বাস ঘাতকদের বাংলার মাটিতে কবর রচনা করে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শিক চেতনায় বাংলাদেশকে গড়ব এটিই আজকের এই দিনে আমাদের দৃপ্ত অঙ্গীকার। ইলিয়াস আমরা কি হাতে চুড়ি পরে তোমার অপেক্ষায় সারা জীবন দিন গুনব? নাকি সকল ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে এ সকল ভারতীয় বেজন্মা দালালদের শিকড় উপড়ে ফেলে বাংলার মাটিতে তাদের কবব রচনা করবো? (মো: শাহাবুদ্দিন লাল্টুর ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

কেএইচ