এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, গণতন্ত্রের প্রাণ হচ্ছেনির্বাচন। কারণ নির্বাচনের মাধ্যমেই জনগণ রাষ্ট্রীয়কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের স্বাদ পায়। অথচ এই নির্বাচন নিয়েই যদি প্রশ্ন ওঠে তাহলে এর মাধ্যমে গঠিত সরকারবৈধতার সংকটে ভোগে। গত শতাব্দির মাঝামাঝি সময়থেকে ভারতীয় উপমহাদেশসহ ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোয়সামরিক ক্যু-এর মাধ্যমে গঠিত সরকারগুলোও এ সংকটেনিপতিত হয়েছিল।
এ কারণে এসব দেশে রাজনৈতিকস্থিতিশীলতা ছিল না। বাংলাদেশও এর অন্যথা ছিল না। একান্নব্বইয়ের পর থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত যে ক’টি নির্বাচন হয়েছে, তা নিয়ে বিরোধী দলের অভিযোগ ছিল সত্য; কিন্তু ওইসব নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকারের বৈধতার সংকট ছিল না। নবম সংসদের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ ছাড়াই ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন হয়।
তাতে দেখা যায়, একটি রাজনৈতিক দল যে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সরকার গঠন করে, সেই সমসংখ্যক আসনে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট পেয়ে যায়। অন্য আসনগুলোর নির্বাচনেও ভোটারদের উপস্থিতি ছিল নেহায়েৎ কম। তখন আওয়ামী লীগের নেতারা তখন বলেছিলেন, সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার জন্য নির্বাচনটি করা হয়েছে।
অতি অল্প সময়ের মধ্যেই সকলে অংশগ্রহণ করতে পারে-এমন একটি নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে। এখন ওপর্যন্ত বিশ্বে বাংলাদেশের বন্ধপ্রতিম দেশগুলোও একটি অংশপ্রহণমূলক নির্বাচনের ওর গুরত্ব দিয়ে আসছে। আধুনিক যুগের প্রভাবশালী রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হ্যারল্ড জে. লাস্কি তাঁর ‘অ্যা গ্রামার অব পলিটিক্স’ গ্রন্থে এ ব্যাপারে বলেছেন, ‘আমরা কোনো মানুষকে উপযুক্ত কারণ ছাড়া ভোটের অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে পারি না। আমার মতে তা করা উচিত নয়।’ এর কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন,‘গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রত্যেক নাগরিকের তার নিজস্ব মতামত প্রকাশের অধিকার আছে। তার আশা-আকাক্সক্ষাকে বাস্তবায়িত করার অধিকার আছে।’
(হ্যারল্ড জে. লাস্কি, রাজনীতির গোঁড়ার কথা, আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া অনূদিত,বাংলা একাডেমি, ১৯৭৬, পৃষ্ঠা : ১৯ ও ২০)।
আসলে নির্বাচনের মাধ্যমেই একজন নাগরিক রাষ্ট্রীয় কাজের ব্যাপারে তার মতামত প্রকাশ করে থাকেন। কিন্তু ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে যেহেতু ১৫৪টি আসনে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়নি এবং বাকি আসনগুলোর নির্বাচনেও ভোটারের উপস্থিতি ছিল নেহায়েতই কম, সেহেতু এ নির্বাচনে ভোটারদের মতামতের প্রতিফলন ঘটেছে- এমনটি বলা যায় না।
এজন্যই বোধকরি সকল মহলই মনে করছেন, গণতন্ত্রের স্বার্থেই একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন প্রয়োজন। এই আকাক্সিক্ষত নির্বাচনটি কীভাবে হবে, তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। আলোচনা ব্যতিরেকে গণতন্ত্রকে চিন্তা করা যায় না। কেননা, আলোচনা ও যুক্তি প্রয়োগের দ্বারা গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা পরিচালিত হয়, বল প্রয়োগের দ্বারা নয়।
এ ক’টি কথা বলেছেন বাংলাদেশের প্রথিতযশা রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্রফেসর ড. মুজাফ্ধসঢ়;ফর আহমদ চৌধুরী (মুজাফফর আহমদ চৌধুরী, গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ, দেখুন, মুজাফফর আহমদ চৌধুরী স্বারক গ্রন্থ, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়, ১৯৮১, পৃষ্ঠা :৫১)। তাই বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য স্থিতিশীল ররাজনৈতিক পরিবেশ গড়তে এ মুহূর্তে সরকারি ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে আলোচনা বা সংলাপ প্রয়োজন। তবে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, নির্বাচন বর্তমানে যে পর্যায়ে পেীঁছেছে, তাতে নির্বাচকমন্ডলীর কোন মতামত প্রতিফলিত হয় না বললেই চলে।
শেষ হওয়া ইউনিয়ন পরিষদ(ইউপি) নির্বাচনই এর বড় প্রমাণ। এই ইউপি নির্বাচনের মাধ্যমে যেভাবে সহিংসতা একেবারে গ্রামেগঞ্জে ছড়িয়ে দেয়া হলো, তাতে ভবিষ্যতে ভালো কোনো লোক এই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ না হতেও পারে। কারণ, প্রাণ হারিয়ে কিংবা অঙ্গের ক্ষতিসাধণ করে তো আর কেউ জনসেবা করতে যাবে না। কেউ যদিওবা এ ধরনের স্বপ্ন দেখে, তাতে বাধা দেবে তার পরিবারপরিজন। ইউপি নির্বাচনের কথাইবা বলি কেন। নির্বাচনটা তো শেষ হয়ে গেছে সেই ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমেই।
এতে আন্তর্জাতিক বন্ধু রাষ্ট্রগুলো যারপরনাই আশ্চর্য হলো। মাত্র কিছুদিন আগে যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক শীর্ষ বেসরকারী গোয়েন্দা সংস্থা স্ট্র্যাটফোরের একটি বিশ্লেষণীতে এ নির্বাচন নিয়ে বলাহয়েছে যে, ২০১৪ সালের জানুয়ারির নির্বাচন বিএনপি’র বয়কট করার সিদ্ধান্তের ফায়দা হাসিল করেছেন হাসিনা। তাতে আওয়ামী লীগের বিজয় নিশ্চিত হয়, যদিও দেশের ইতিহাসে এ নির্বাচনের ভোটার অংশগ্রহণ ছিল সবচেয়ে কম।
হাসিনার মহাজোট বর্তমানে ৩০০ আসন বিশিষ্ট সংসদের ২৮০টি দখল করে আছে। ৩১শে মে প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বিশ্লেষণী নিবন্ধটির শিরোনাম ‘বাংলাদেশ’স ডিসেন্ট ইনটু অথোরিটেরিয়ানিজম’। এজন্য সেই প্রথম থেকেই একমাত্র প্রতিবেশী ভারত ছাড়া অন্য বন্ধু রাষ্ট্রগুলো বললো,এটা কেমন করে হয়। তারা বর্তমান সরকারকে আবার একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করার আহ্বান জানায়। কিন্তু বর্তমান সরকার কোন কথা শুনছে না। তারা বলে যাচ্ছে, নির্বাচন যথা সময়েই অনুষ্ঠিত হবে।
জানুয়ারির নির্বাচনের আগে তৎকালীন মহাজোট সরকার ও বিএনপি নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের মধ্যে যেসংকট চলছিল, তার সমাধানের জন্য জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো দূতিয়ালি করতে এসেছিলেন।
দূতিয়ালির মাধ্যমে কীভাবে এই বিবদমান দুই পক্ষের সংকট সমাধান করলেন-তা তখন পরিষ্কার না করলেও এখন উভয় পক্ষই মানছেন যে, তখন তাদের দুইপক্ষের মধ্যে একটি বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছিল এবং তা হলো, ‘সংবিধানের ধারবাহিকতার জন্য ৫ জানুয়ারির নির্বাচন প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তারপরই খুব সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে সব পক্ষের অংশগ্রহণে সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন দেওয়া হবে।’
কিন্তু এখন আওয়ামী লীগ বলছে, ‘এ রকম কথা থাকলেও ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়নি। তাই, তারাই কথার বরখেলাপ করেছে বলে কম সময়ের মধ্যে আরেকটি নির্বাচন দেয়ার শর্তও আর টেকে না।’ কিশ আশ্চর্যম! আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার এখন দুর্দন্ডপ্রতাপে রাষ্ট্রশাসন করে যাচ্ছে। আগামীতে যে নির্বাচন হবে, তাতেও বিজয় লাভের জন্য এ সরকারের প্রধান শেখ হাসিনা এখন থেকে ছক করে এগুচ্ছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক শীর্ষ বেসরকারী গোয়েন্দা সংস্থা স্ট্র্যাটফোরের একটি বিশ্লেষণীতে এ বিষয়টি অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, “হাসিনার সরকার বিএনপি’র উচ্চপদস্থ সদস্য ও গণমাধ্যমে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছে।
জানুয়ারিতে, বিএনপি প্রধান খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ আনা হয়েছে, কারণ তিনি ১৯৭১ সালের যুদ্ধে নিহতদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক থাকার কথা বলেছিলেন। এরপর ১১ই মে, খালেদা ও বিএনপির ২৭ সদস্যের বিরুদ্ধে গত বছরে দুইটি বাসে অগ্নিসংযোগের অভিযোগ গঠন করা হয়। অন্যান্য প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধেও বিচার চলছে।
দেশের সবচেয়ে বড় ইংরেজি ভাষার পত্রিকা ডেইলি স্টারের সম্পপাদক মাহফুজ আনামের বিরুদ্ধে ৭৯টি পৃথক মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৭টি রাষ্ট্রদ্রোহের, ৬৯টি মানহানির। প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে ফেব্রুয়ারিতে ধর্মীয় অনুভ’তিতে আঘাত দানের অভিযোগে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করা হয়।”এতে আরও বলা হয়, “খালেদা জিয়াকে নিষ্ক্রিয় করার ফলে, বিএনপির রক্ষণশীল আসনগুলোতে দলটির আর কোন প্রতিনিধিত্ব রইলো না। হাসিনা এ আসনগুলো করায়ত্ত্বে নিতে চান। এ কারণে তিনি কিছুটা রক্ষণশীল অবস্থান নেবেন, বিশেষ করে ধর্মীয় ইস্যুতে। এ কারণেই বোঝা যায় তিনি কেন সম্প্রতি বলেছেন যে, মানুষের উচিৎ অন্যের ধর্মীয় বিশ্বাসকে সম্মান করা।
এ কথাগুলো তিনি বলেছেন, ইসলামের সমালোচনাকারী ব্লগারদের প্রতিক্রিয়ায়। এ কারণেই বোঝা যায় সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট ইসলামকে রাষ্ট্রধর্মের স্থান থেকে সরানোর চেষ্টা নিলেও, হাসিনা কেন চুপ ছিলেন।
অবশ্য আদালত পরে এ অবস্থান থেকে সরে আসে এ যুক্তিতে যে, পিটিশনাররা প্রমাণ করতে পারেননি ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ায় তাদের কোন ক্ষতি হয়েছে। হাসিনা এ রাজনৈতিক হিসাব কষেছেন যে, যদি তিনি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ ধরে রেখে নতুন চাকরি সৃষ্টি, দারিদ্র্য দূরীকরণ, স্বাস্থ্যসেবা বৃদ্ধি করতে পারেন, তাহলে জনগণ একদলীয় শাসনের দিকে দৃষ্টিপাত করবে নাএবং ২০১৮ সালের নির্বাচনেও আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করবে।”আওয়ামী লীগ এককভাবে এমন চিন্তা করতেই পারে।
কিন্তু ভবিষ্যতে কী হবে-তা তো আর বলা যাচ্ছে না। তাই বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক কাঠামোতে বর্তমানে যে বৈধতার সংকট চলছে, তা থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হচ্ছে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ব্যবস্থা করা। এজন্য উভয় পক্ষের মধ্যে সংলাপের প্রয়োজন। এখন সংলাপই পারে বাংলাদেশকে এই গভীর সংকট থেকে মুক্তি দিতে।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কলাম লেখক
এআই
[বি. দ্র.- মতামত লেখকের একান্ত নিজেস্ব, টাইমনিউজবিডির সম্পাদকীয় নীতিমালার সাথে এর কোন সস্পর্ক নেই। ]





