রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থায় সুষ্ঠু পরিচালনার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের পাশাপাশি স্থানীয় শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়। কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে একটি রাষ্ট্রের সমস্ত বিষয় দেখভাল করা, সমস্যা নিরূপণ, জনগণের অভাব অভিযোগ শোনা এবং সকল সমস্যার সমাধান করা কষ্টসাধ্য কাজ। তাই স্থানীয় পর্যায়ে যেসব সমস্যা রয়েছে তার স্থানীয় সমাধান, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, সরকারি সুযোগ-সুবিধার সমবন্টন এবং সেসব সুযোগ-সুবিধা জনগণের দ্বারগোড়ায় পোঁছে দিতে এ ধরনের সরকার ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়।
এ সরকারের জনপ্রতিনিধিরা জনগণের চাহিদা বা দাবিসমূহ সহজে জানতে পারে। ফলে স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকার সেসব বিষয় সম্পর্কে অবহিত হওয়ার সুযোগ পায়।
স্থানীয় সরকার বলতে স্থানীয় পর্যায়ে সরকার ব্যবস্থা অর্থাৎ সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও অপরাপর সংস্থার কর্মতৎপরতাকে বোঝায়। এ সমস্ত কর্মতৎপরতা সাধারণত কোনো নির্দিষ্ট এলাকা বা স্থানের জনগোষ্ঠীর কল্যাণার্থে সম্পাদিত হয়ে থাকে।
স্থানীয় সরকার হলো কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের কল্যাণের জন্য প্রতিষ্ঠিত একটি পদ্ধতি। এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট এলাকার উন্নয়ন সাধন করা হয়। অপরদিকে, জাতীয় সরকার হলো কোনো বিশেষ গোষ্ঠী বা অংশের সরকার নয় বরং গোটা দেশের সরকার। এ সরকার জাতীয় স্বার্থে, জাতীয় উন্নয়নে কাজ করে থাকে। একটা দেশের সমস্ত বিষয় দেখভাল করা বা নজরদারি করা এ সরকারের কাজ।
মোট কথা, স্থানীয় সরকার ও জাতীয় সরকারের মূল পার্থক্য হলো স্থানীয় সরকার ক্ষুদ্র স্বার্থে এবং জাতীয় সরকার বৃহৎ স্বার্থে কাজ করে।
স্থানীয় সরকার গঠনে প্রয়োজন পড়ে স্থানীয় নির্বাচন। অনুরূপভাবে কেন্দ্রীয় বা জাতীয় সরকার গঠনে দরকার হয় জাতীয় নির্বাচন। এ দুটি সরকার ব্যবস্থা যেহেতু এক বিষয় নয় সেহেতু পৃথক পৃথক বিধি অনুযায়ী এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তবে ইদানিংকালে আমরা স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাটিকে জাতীয় সরকার ব্যবস্থার ন্যায় রূপান্তরিত করে ফেলেছি। বর্তমানে কোনটি জাতীয় বা স্থানীয় নির্বাচন তা বোঝা কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় নির্বাচন স্থানীয় পর্যায়ে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। স্থানীয় নির্বাচন সম্পর্কিত বিধিসমূহ মেনে যে কেউ এ নির্বাচনে অংশ নিতে পারে। এটি দলীয় কোন নির্বাচন না হওয়ায় এতে দলীয় কোনো প্রতীক ব্যবহার করা যায় না। যে কোনো দলের যে কেউ এতে অংশ নিতে পারে। আমাদের দেশের অনেক জাতীয় পর্যায়ে নেতা রয়েছেন যারা স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখার কারণে জাতীয় পর্যায়ের নেতা হতে পেরেছেন। স্থানীয় নির্বাচনব্যবস্থাকে জাতীয় নেতা তৈরির কারখানাও বলা চলে।
তবে জাতীয় নির্বাচন জাতীয় পর্যায়ে অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোই অংশগ্রহণের সুযোগ পায়। এছাড়া কোনো প্রার্থী ইচ্ছা করলে কোনো দলের সমর্থন ছাড়াও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিতে পারে। এতে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি রাজনৈতিক দল বা জোট তাদের দলীয় প্রতীক ব্যবহারের সুযোগ পায় এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা রাজনৈতিক দলের প্রতীক ব্যতীত অন্য প্রতীক ব্যবহারের সুযোগ পায়। জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে প্রতিটি রাজনৈতিক দল তাদের নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করে এবং তা জনগনের সামনে তুলে ধরে জনসমর্থন লাভের চেষ্টা করে। এসব দল জনগণের কাছে গিয়ে তাদের প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে অবহিত করে এবং ভোট প্রার্থনা করে। মোটকথা, জাতীয় নির্বাচন হলো দলীয় নির্বাচন।
তবে দুঃখের বিষয়, আমাদের রাজনৈতিক নেতারা স্থানীয় নির্বাচনকে এখন দলীয় নির্বাচন বানিয়ে ফেলেছেন। এ নির্বাচনে দলীয় পরিচয় ব্যবহার করার নিয়ম না থাকলেও তারা দলীয় মনোনয়ন দিয়ে থাকেন। রাজনৈতিক দলের নেতারা তাদের সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে দলীয় সাফল্যের ফিরিস্তি তুলে বিরোধী পক্ষের সমালোচনা করে জনগণের কাছে ভোট চান।
স্থানীয় নির্বাচন স্থানীয়ভাবে সম্পন্ন হওয়ার কথা। কারা কোন নির্বাচনী এলাকার প্রার্থী হবেন তা ঠিক করার দায়িত্ব কোন রাজনৈতিক দলের নয়। তবে আমাদের রাজনৈতিক নেতারা স্থানীয় নির্বাচনকে দলীয় নির্বাচন হিসেবে দেখে দলীয়ভাবে প্রার্থী সমর্থন দিয়ে থাকেন। ফলে তারা তাদের মনোনীত দলীয় প্রার্থীর জয়ের জন্য যেকোনো ধরনের কাজ বা অন্যায় করতেও দ্বিধা করেন না। রাজনৈতিক দলগুলো এ নির্বাচনকে দলীয় নির্বাচন হিসেবে দেখে তাদের জনপ্রিয়তা প্রদর্শনের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেন। ফলে এ নির্বাচনগুলোতে সহিংসতা দিন দিন বেড়েই চলছে এবং নির্বাচনী আচরণবিধি লংঘন মামুলি ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় প্রার্থী নির্বাচনে দলীয় সমথর্ন না থাকলে এ নির্বাচনে সহিংসতা অনেকটা কমে যেত। আমাদের রাজনৈতিক নেতারা যদি এ স্থানীয় নির্বাচনকে স্থানীয়ভাবে সম্পন্ন করতেন তাহলে এ ধরনের সহিংসতা আমাদের দেখতে হত না। তাই স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় সমর্থনের সংস্কৃতি আমাদের পরিহার করতে হবে।
এখন সিটি কর্পোরেশন, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা এমনকি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের চেয়ারম্যান পর্যন্ত দলীয় মনোনয়ন পেয়ে থাকে। হয়তো আর বেশিদিন নেই যখন ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য পদপ্রার্থীরাও তাদের রাজনৈতিক দলের সমর্থন নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে। আমাদের অতিরঞ্জিত কিছু গণমাধ্যম স্থানীয় নির্বাচনে কোনো দল থেকে কতজন প্রার্থী হয়েছেন বা তাদের পক্ষে দলের কারা কারা কাজ করছেন, নির্বাচনে যেসব প্রার্থী অংশগ্রহণ করেছেন তারা কোন দলকে সমর্থন করেন এসব প্রচারে ব্যস্ত থাকে। অথচ এসব নির্বাচনকে নির্দলীয় নির্বাচন হিসেবে প্রকাশ করতে গণমাধ্যম গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। স্থানীয় নির্বাচনকে নির্দলীয় নির্বাচন হিসেবে প্রকাশ করতে গণমাধ্যম ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে।
১লা এপ্রিল জাতীয় সংসদে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আইন সংশোধন করে স্থানীয় সরকারের প্রতিটি নির্বাচন দলীয়ভাবে হওয়া জরুরি।’এর আগে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকসহ অনেকে স্থানীয় সরকারের নির্বাচনকে দলীয়ভাবে করার পক্ষে মত দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তেব্যে ভারত ও ইংল্যান্ডসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয়ভাবে হওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। তবে দুঃখের বিষয়, সেসব দেশের সাথে আমাদের তুলনা করা ভুল হবে। তাদের মানসিকতা আর আমাদের মানসিকতা এক নয়। তারা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় বদ্ধপরিকর হলেও আমরা যেকোনো ভাবেই ক্ষমতায় থাকতে বা ক্ষমতায় যেতে বদ্ধপরিকর। সেসব দেশ স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করতে কাজ করলেও আমরা তার উল্টো কাজ করে থাকি। তাই তাদের সাথে আমাদের তুলনা বাতুলতা ছাড়া আর কিছুই নয়।
স্থানীয় নির্বাচন যদি দলীয়ভাবে হয়ে থাকে তাহলে তার ফল কিরূপ হবে তা অনুমান করা এখন কষ্টসাধ্য ব্যাপার নয়। কয়েকদিন আগে একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার খবর থেকে জানা যায়, ‘মামলার জালে জড়িয়ে সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদের অন্তত ২৫ জন বিরোধী সমর্থক নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকে গত এক বছরে সাময়িক বরখাস্ত বা সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।’এ প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘আরও কয়েক জনকে সরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। তবে সরকার সমর্থক স্থানীয় জনপ্রিতিনিধিদের কারও কারও বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের মামলা বা অভিযোগ থাকলেও তার নির্বিঘ্নে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। এর মধ্যে কারও বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ থাকার পরও মাসের পর মাস ছুটি পাচ্ছেন। আবার কারও বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি থাকলেও গ্রেপ্তার হচ্ছেন না।’ এমনকি, একজন সাজাপ্রাপ্ত হয়েও জামিন নিয়ে দায়িত্ব পালন করার খবর পত্রিকাটি প্রকাশ করেছে।
২৮ এপ্রিল ঢাকার দু’টি ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন হয়ে গেল। এ নির্বাচনে জাল ভোট, কেন্দ্র দখল, সাংবাদিকদের কেন্দ্রে প্রবেশে বাধা ও তাদের উপর হামলাসহ বহুবিধ অন্যায় ঘটনা ঘটেছে। এত কিছুর পরেও নির্বাচন কমিশন ও ক্ষমতাসীন দল দাবি করেছেন, বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। তবে বিরোধী পক্ষ নির্বাচন চালাকালীন সময়েই অনিয়ম হচ্ছে দাবি করে এ নির্বাচনকে বর্জন করে। সবাই আশা করেছিল, এ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে। তবে রাজনৈতিক প্রভাবে পড়ে তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি যা গণমাধ্যমের খবরে বেরিয়ে এসেছে। তাই এ কথা স্পষ্ট, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থীদের পক্ষে রাজনৈতিক সমর্থন দেওয়া অব্যাহত থাকলে এ রকম নির্বাচন আগামীতেও দেখতে হবে যাতে কোনো সন্দেহ নেই।
স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা এখন রাজনীতির যাঁতাকলে পিষ্ঠ। এ রকম অবস্থা চলতে থাকলে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার আসল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হলে এটিকে অবশ্যই রাজনীতির আওতার বাইরে বের করে আনতে হবে।
স্থানীয় নির্বাচন নির্দলীয় নির্বাচন। নির্দলীয় এ নির্বাচনে দলীয় সমর্থনদানের সংস্কৃতি পরিহার করতে হবে। সেই সাথে দলীয় প্রচারণাও বন্ধ করতে হবে। এ নির্বাচনকে দলীয় নির্বাচনে রূপান্তর করলে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা যে ভেঙ্গে পড়তে খুব বেশি সময় নিবে না তা সহজেই অনুমেয়।
লেখক; মোঃ মাইদুল ইসলাম, শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ইমেইল: [email protected]
কেএইচ





