দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অভাবেই বৈদেশিক শ্রমবাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলেই মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। সরকার অতিমাত্রায় অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ব্যস্ত থাকায় বৈদেশিক বাণিজ্য, কর্মসংস্থান ও কুটনীতিতে অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছে বলেই মনে হচ্ছে। বৈদেশিক শ্রমবাজার সম্প্রসারণ তো দুরের কথা ক্রমেই তা সঙ্কোচিত হয়ে আসছে। ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহে আশঙ্কাজনকভাবে ভাটা পড়েছে। দেশের ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ বিনষ্ট হচ্ছে। বৈদেশিক বিনিয়োগ কমতে কমতে এখন সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। প্রতিবেশী দেশের সাথে বাণিজ্য ঘাটতিও ক্রমবর্তমান।

রাষ্ট্রযন্ত্রের উদাসীনতায় বৈদেশিক সাহায্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। প্রতিশ্রুত অর্থও ছাড় করাতে পারছে না রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো। ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অনাকাঙ্খিত অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। যদিও সরকার পক্ষে তা স্বীকার করা হচ্ছে না। কিন্তু বাস্তবতাকে তো আর উপেক্ষা করা যায় না।

দেশের অর্থনীতিতে এই হ-য-ব-র-ল পরিস্থিতিতে শুধু দেশীয় নয়; বরং আন্তর্জাতিক মহলও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এমনকি ব্যবসার জন্য বাংলাদেশ আদর্শ স্থান নয় বলে মন্তব্য করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী বাণিজ্য সাময়িকী ফোর্বস। সম্প্রতি প্রকাশিত ফোর্বস সাময়িকীর ‘ দ্য বেস্ট কান্ট্রিজ ফর বিজনেস-২০১৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনের মতে, ব্যবসার পরিবেশের দিক থেকে ১৪৪ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১২১তম। দক্ষিণ এশিয়ার সবার নিচে আছে বাংলাদেশ।

১১টি উপদানের ভিত্তিতে প্রতিটি দেশের ব্যবসার পরিবেশ বিশ্লেষণ করেছে ফোর্বস। এগুলো হলো বাণিজ্য স্বাধীনতা, আর্থিক স্বাধীনতা, সম্পত্তি অর্জনের অধিকার, উদ্ভাবন, প্রযুক্তি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, বিনিয়োগকারীর সুরক্ষা, দুর্নীতি, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, করের বোঝা ও শেয়ারবাজারের অবস্থা। এ উপাদানগুলো বিশ্লেষণে ব্যবহার করা হয় বিশ্বের খ্যাতনামা কিছু গবেষণার তথ্য। সূচকগুলো বিশ্লেষণের ভিত্তিতে ফোর্বস বলেছে, বিশ্বে ব্যবসা করার জন্য উৎকৃষ্ট দেশ ডেনমার্ক। শীর্ষ পাঁচে এরপর রয়েছে নিউজিল্যান্ড, নরওয়ে, আয়ারল্যান্ড ও সুইডেন।

তালিকায় শেষের পাঁচটি দেশ হলো যথাক্রমে মিয়ানমার, হাইতি, লিবিয়া, গিনি ও চাদ। আর দক্ষিণ এশিয়ার দেশেগুলোর মধ্যে শ্রীলঙ্কা ৯১, ভারত ৯৭, ভুটান ১০১, পাকিস্তান ১০৩ ও নেপাল ১১৮তম অবস্থানে রয়েছে। শীর্ষ ২৫টি দেশের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশই ইউরোপের দখলে। বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোর শীর্ষে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান চার ধাপ পিছিয়েছে। এ বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ২২তম ।

আসলে ব্যবসার জন্য সবচেয়ে বেশী প্রয়োজন বিনিয়োগ সুরক্ষা, পরিবেশের স্থিতিশীলতা ও ব্যবসাবান্ধব কর কাঠামো। এছাড়াও ঋণের সহজ প্রাপ্তি, সম্পত্তির মালিকানা লাভের প্রক্রিয়া, আধুনিক প্রযুক্তি, নতুন উদ্ভাবন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতার অনুপস্থিতি এবং বাকস্বাধীনতাও ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। এসব মানদন্ডে কোনটিতেই সুবিধাজনক অবস্থানে নেই বাংলাদেশ। ফলে আন্তর্জাতিক লগ্নী প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশ থেকে তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নিতে শুরু করেছে। আর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে জাতীয় অর্থনীতিতে।

মূলত বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় সবসময়ই রফতানির চেয়ে বেশী। আমদানি যতটুকু বেশী, ততটুকু হলো বাণজ্যি ঘাটতি। বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেলের বড় দরপতনের কারণে বাণজ্যি ঘাটতি কমে আসবে বলে মনে করা হয়েছিল; কিন্তু পরিসংখ্যান তা বলছে না। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানী তেলের মূল্য ব্যাপকভাবে হ্রাস পেলেও অভ্যন্তরীণ বাজারে তার প্রভাব পড়েনি। মনে করা হয়েছিল যে, ব্যাপক ঘাটতি পুরুণ করতে এটি সহায়ক হবে। কিন্তু বাণিজ্যনীতিকে সময়োপযোগী করতে সরকারের উপর্যুপরি ব্যর্থতার কারণেই আমরা সে সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। ফলে জনজীবনে এর খারাপ প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

লেনদেনে ভারসাম্যের ওপর বাংলাদশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনের তথ্য মতে, চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে (জুলাই- ডিসেম্বরে) বানিজ্য ঘাটতি হয়েছে ৩২৬ কোটি ২০ লাখ ডলার। গত অর্থবছরে একই সময়ে ছিল ৩০৫ কোটি ৮০ লাখ ডলার। বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে প্রায় ৭ শতাংশ। আলোচ্য সময়ে আমদানি ও রফতানি বেড়েছে ৭ শতাংশের মতো। চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাস পর্যন্ত বাণিজ্য ঘাটতি আগের বছরের একই সময়রে চেয়ে কম ছিল। এর কারণ, আমদানি ব্যয় ছিল কম। গত নভেম্বর ও ডিসেম্বরে আমদানি বেশ বেড়েছে। কিন্তু রফতানি সে আগের অবস্থায় আছে।

আসলে বৈদেশিক লেনদেনে আমদানি-রফতানি ও রেমিট্যান্স মুখ্য ভূমকিা রাখে। সাম্প্রতিক সময়ে আমদানি বেড়েছে। কমেছে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের পরমিাণও। রেমিট্যান্স নিয়েই এখন দুশ্চিন্তা বেড়েছে। রেমিট্যান্সের সঙ্গে অভ্যন্তরীণ ভোগের সর্ম্পক রয়েছে। রেমিট্যান্স কমে গেল অর্থনীতিতে চাহিদা কমে যেতে পারে। রেমিট্যান্সের সঙ্গে জিডিপি’র প্রবৃদ্ধির সর্ম্পক রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব মতে, চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে রেমিট্যান্স এসেছে ৮৬৪ কোটি ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে বেশ কম। গত র্অথবছরে তেলের দাম কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের সার্বিক পরিস্থিতি ভালো ছিল না। এর পরও রেমিট্যান্সে প্রায় ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ছিল।

আইএমএফ বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের ভবিষ্যত নিয়ে নেতিবাচক বার্তা পাঠিয়েছে। রফতানি নিয়েও সংস্থাটির আশাবাদ খুবই হতাশাব্যঞ্জক। এ অবস্থায় আইএমএফ চলতি র্অথবছর শেষে বাংলাদেশের চলতি হিসাবে ২৭০ কোটি ডলারের ঘাটতি থাকবে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ নিয়ে এক পর্যালোচনায় আইএমএফ এমন মতামত দিয়েছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিদেশের সঙ্গে লেনদেনের ক্ষেত্রে র্বতমানে একমাত্র দুর্বলতা রেমিট্যান্স। আমদানি বেড়ে যাওয়া নেতিবাচক নয়। কিন্তু আমদানি-রফতানির মধ্যে একটা যৌক্তিক ভারসাম্য তৈরি করা জরুরি। সরকারের ভ্রান্তনীতির কারণে বিদেশে শ্রমবাজার ক্রমেই সংকোচিত হচ্ছে, ফলে আশঙ্কজনকভাবে হ্রাস পাচ্ছে রেমিট্যান্স প্রবাহ।

কিন্তু সরকার এ সমস্যা সমাধানে কোন কার্যকর সমাধান না করে কথামালার ফুলঝুড়ির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে। বিদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টির কথা ফলাও করে প্রচার করা হলেও তা একেবারেই অন্তসারশুণ্য বলেই মনে হয়। সম্প্রতি আগামী ৩ বছরে মালয়েশিয়ায় ১৫ লাখ শ্রমিক পাঠানোর কথা বলা হচ্ছে সরকারের পক্ষে। কিন্তু তা কতখানি বাস্তবসম্মত তা অবশ্য সময়ই বলে দেবে।

অবশ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাওয়ার ভিন্ন ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করে, রমেট্যিান্স কিছুটা কমলেও তা বাংলাদেশের বৈদেশিক লেনদেনের ওপর চাপ তৈরি করবে না। এতে বিচলিত হওয়ার কিছু নেই। অবশ্য রেমিট্যান্স বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, রেমিট্যান্স প্রবাহের ওপর গ্রামের ভোগ প্রবণতা নির্ভরশীল। অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়াতে রেমিট্যান্সের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিষয়টি বাস্তবসম্মত মনে করছেন না অর্থনীতিবিদরা।

এদিকে আইএমএফ-এর রিপোর্টে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ রফতানি পণ্যের প্রধান গন্তব্য ইউরোপীয় ইউনিয়নে অর্থনীতিতে মন্দাভাবে চলছে। এ পরিস্থিতি রফতানি আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ ১২টি দেশের মধ্যে সম্প্রতি যে টিপিপি চুক্তি হয়েছে, তাতে ক্ষতিগ্রস্থ হবে বাংলাদেশ। তাদের মধ্যে শুল্কমুক্ত বাণিজ্য হবে বিধায় প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের এক-চর্তুথাংশ রফতানি হয় টিপিপিভুক্ত দেশে। আইএমএফ বলছে, বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। তেলের নিম্নমূল্য মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ওপর ইতোমধ্যেই নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির সবেচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো প্রতিবেশী দেশের সাথে ক্রমবর্ধমান বানিজ্যঘাটতি। দেশটির সঙ্গে ১০ বছরে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে চারগুণ। অর্থাৎ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছর এবং আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের আট বছরে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে প্রায় ৪ গুণ। ক্রমেই বাংলাদেশের প্রতিকুলে যাচ্ছে বাণিজ্য ভারসাম্য। ২০০৫-২০০৬ অর্থবছরে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাতটি ছিল ১৬০ কোটি ৬৫ লাখ ডলার। ১০ বছরের ব্যবধানে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এসে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় ৫৯৭ কোটি ৩০ লাখ ডলার।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী এক বছরের ব্যবধানে ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে ৩৩.৭৬ শতাংশ। যদিও এ সময়টায় ট্রানজিট থেকে শুরু করে বাংলাদেশের বন্দর ব্যবহার করার সুযোগসহ অনেক কিছু পেয়েছে ভারত। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাষায়, ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিক সুসম্পর্ক শুধুই দেয়ার জন্য। ত্যাগে আনন্দিত এ দেশের সাধারণ মানুষ; এমনকি নীতিনির্ধারকরাও।

বাংলাদেশ-ভারত পণ্য বাণিজ্য তালিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০০৫-০৬ অর্থ বছরে ভারত থেকে পণ্য আমদানী হয়েছে ১৮৪ কোটি ৮৭ লাখ ডলার সমমূল্যের, যার বিপরীতে বাংলাদেশ রফতানী করেছে মাত্র ২৪ কোটি ২১ লাখ ডলালের। ওই অর্থবছরে বানিজ্য ঘাটতি দাঁড়ায় ১৬০ কোটি ৬৫ লাখ ডলার। ২০০৬-০৭ অর্থ বছরে বাংলাদেশ আমদানি করে ২২২ কোটি ৬০ লাখ ডলারের পণ্য, যার বিপরীতে রফতানি করে ২৮ কোটি ৯৪ লাখ ডলার সমমূল্যের পণ্য। এ সময় বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়ায় ১৫৩ কোটি ৪৯ লাখ ডলার।

২০০৭-০৮ অর্থ বছরে বাংলাদেশ আমদানি করে ৩৩৮ কোটি ৩৮ লাখ ডলালের পণ্য, যার বিপরীতে রফতানি করে ৩৫ কোটি ৮০ লাখ ডলারের পণ্য। ওই বছর বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়ায় ৩০২ কোটি ৫৭ লাখ ডলার। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে বাংলাদেশ আমদানী করে ২৮৬ কোটি ৩৬ লাখ ডলারের পণ্য, যার বিপরীতে রফতানি করে ২৭ কোটি ৬৫ লাখ ডলারের পণ্য। ফলে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়ায় ২৫৮ কোটি ৭০ লাখ ডলার। ২০০৯-১০ অর্থবছরে বাংলাদেশ আমদানি করে ৩২১ কোটি ৪৬ লাখ ডলার সমমূল্যের পণ্য। সেই বছরের বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ২৯০ কোটি ৯৯ লাখ ডলার। ২০১০-২০১১ অর্থবছরে ভারত বাংলাদেশ বানিজ্যিক বৈষম্য এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ ৪০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যায়।

২০১০-১১ সালে বাংলাদেশ আমদানি করে ৪৫৭ কোটি ডলার মূল্যের পণ্যসামগ্রী এবং ভারতে রফতানি করে মাত্র ৫০ কোটি ডলারের পণ্য। বিদায়ী অর্থবছরে বাংলাদেশ আমদানি করে ৬৫২ কোটি ডলার মূল্যের পণ্য, আর ভারতে রফতানি করে ৫৫ কোটি ডলার মূল্যের পণ্য। এই বছরে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়াল ৫৯৭ কোটি ডলার, যা টাকার অংকে প্রায় সাড়ে ৪৫ হাজার কোটি।

বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্যের চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, তৈরি পোষাক, পাট ও পাটজাত পণ্যসহ মাত্র কয়েকটি পণ্য ভারত নেয়। অন্যদিকে পেঁয়াজ, মরিচ, আদা, জিরা থেকে শুরু করে মোটরযানসহ আড়াই শতাধিক পণ্য আমদানি করে বাংলাদেশ। ২৫টি পণ্য বাদে অন্যগুলোয় শতভাগ শুল্কমুক্ত রাজারসুবিধা দেয়ার পরও বাংলাদেশ থেকে রফতানি আশানুরূপ বাড়ছে না। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজ্য সরকারগুলোর তীব্র অনাগ্রহ এবং বাংলাদেশের রফতানিকারকদের স্বল্প প্রস্তুতি।

মূলত ভারতের রক্ষণশীল বাণিজ্য নীতির কারণেই ঘাটতির পরিমাণ বাড়ছে। সাফটা চুক্তিতে বেশ কিছু পণ্যের ব্যাপারে শুল্ক হ্রাসের কথা বলা হলেও ভারত তা কার্যকর করছে না। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের এই বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি দুই দেশের সম্পর্কোন্নয়নের পথে অন্যতম প্রধান অন্তরায় বলেও মনে করেন অভিজ্ঞমহল।

অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, বিভিন্ন ধরনের অশুল্ক প্রতিবন্ধকতা অব্যাহত থাকায় প্রতিবেশী দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের রফতানি-বাণিজ্য স্তিমিত হয়ে পড়েছে। ভারতে যেসব কারণে বাংলাদেশের পণ্য রফতানি ব্যাহত হয় তার মধ্যে রয়েছে প্রতিটি চালানের ল্যাবরেটরি পরীক্ষা, পরীক্ষার ফল পেতে বিলম্ব, বিভিন্ন রাজ্যের নিজস্ব শুল্ক, এন্টি ডাম্পিং, কাউন্টারভেইলিং ডিউটি ইত্যাদি। এর বাইরে রয়েছে স্থলপথে পণ্য রফতানির বাধা যেমন গুদামব্যবস্থার অপ্রতুলতা, রাস্ত-ঘাটের দুরবস্থা, ভারতীয় কাস্টমসের স্বেচ্ছাচারিতা, পণ্যবাহী যানবাহনের পার্কিংয়ে অসুবিধা, ট্রান্সশিপমেন্ট ইয়ার্ডের অপ্রতুলতাসহ নানাবিধ প্রতিবন্ধকতা ও জটিলতা।

এ দিকে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন, ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি আট গুণ। তিনি বলেন, ভারত থেকে বাংলাদেশ গত পাঁচ মাসে পণ্য আমদানি করেছে ১৭ হাজার ১৫২ কোটি টাকার, আর রফতানি করেছে দুই হাজার ৭৪ কোটি টাকার পণ্য।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে অন্য দেশের বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ ৭৩ হাজার ৮৬ কোটি টাকা (৯৩৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার)। বাণিজ্য সম্প্রসারণের ৪৮টি দেশের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৮টি দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি আছে। এ ছাড়া তিনটি দেশের সঙ্গে চুক্তি করা হলেও তার কার্যকারিতা নেই। এ ছাড়া আরো সাতটি দেশের সঙ্গে চলমান বাণিজ্যের পাশাপাশি সম্প্রসারণের চুক্তি রয়েছে।

জাতিসংঘের অধীন সংস্থা আঙ্কটাডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৪ সালে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ এসেছে যুক্তরাজ্য থেকে, যার পরিমাণ ১৮ কোটি ৯ লাখ ডলার। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া। দেশটির বিনিয়োগ ১৩ কোটি ৪৭ লাখ ডলার। তৃতীয় অবস্থানে পাকিস্তান। এ দেশে ২০১৪ সালে পাকিস্তানের বিনিয়োগ ১৩ কোটি সাত লাখ ডলার। চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে সিঙ্গাপুর। এ সময়ে দেশটির বিনিয়োগ ১১ কোটি ৭১ লাখ ডলার। বিদেশী বিনিয়োগে পঞ্চম অবস্থানে থাকা হংকংয়ের বিনিয়োগ ১১ কোটি ৪১ লাখ ডলার। বাংলাদেশে শীর্ষ বিনিয়োগকারী এই পাঁচটি দেশের তালিকায় ভারতের নাম নেই।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ভারতের অবস্থান ৯ নম্বরে। এ ক্ষেত্রেও রয়েছে প্রত্যাশার বিপরীতপ্রাপ্তি। মূলত বাংলাদেশে পণ্য উৎপাদন করে ভারতে রফতানির মাধ্যমে দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনতে ভূমিকা রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভারতীয়রা এ দেশে বিনিয়োগ করলেও বাস্তবতা সম্পূর্ণ আলাদা। উৎপাদিত পণ্য ভারতে রফতানি করার পরিবর্তে এ দেশের বাজার ধরতেই বেশি ব্যস্ত ভারতীয় কোম্পানিগুলো।

সরকারের বৈদেশিক সাহায্যে ভাটা পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে ৬০০ কোটি ডলার বৈদেশিক সহায়তার প্রতিশ্রুতির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও ২০১৫-১৬ অর্থ বছরের প্রথম ৬ মাসে এক-চতুর্থাংশও পায়নি সরকার। একই সঙ্গে অর্থ ছাড়ের গতিও শ্লথ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ব্যর্থতার কারণে সরকার বড় বড় প্রকল্পের বিপরীতে বৈদেশিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি এবং অর্থ ছাড় কোনটিই ঠিকঠাক মত পাচ্ছে না। গত ৬ মাসে ছোট ছোট কিছু প্রকল্পের বিপরীতে সামান্য কিছু অর্থ ছাড় এবং প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। এজন্য অর্থ বছর শেষে লক্ষ্য অর্জন নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।

প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সঙ্গে বৈদেশিক সহায়তার ছাড়েও ভাটা পড়েছে। যেখানে চলতি অর্থ বছরে ৪৩৬ কোটি ডলার বৈদেশিক সাহায্য ছাড় পাওয়ার কথা ছিল, সেখানে চলতি অর্থ বছরের প্রথম ৬ মাসে পাওয়া গেছে মাত্র ১৬৯ কোটি ডলার অর্থ । এ কারণে বৈদেশিক সহায়তার লক্ষ্য পূরণে সরকারি কর্মকর্তারা সংশয়ের মধ্যে আছেন।

চলতি ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে বৈদেশিক সহায়তার প্রতিশ্রুতির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬০০ কোটি ডলার, কিন্তু সরকার পেয়েছে মাত্র ১৬৭ কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি। এর মধ্যে ঋণ হিসাবে ১৩০ কোটি ডলার ও অনুদান হিসাবে ১৫ কোটি ডলার।

আসলে জাতীয় অর্থনীতিতে চাঙ্গাভাব আনতে হলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের কোন বিকল্প নেই। কিন্তু দেশে যে অচলাবস্থা চলছে তাতে সহসাই এ অবস্থা থেকে উত্তরণের কোন সম্ভবনা দেখা যাচ্ছে না। আর এ কারণেই দেশের সার্বিক পরিস্থিতি ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতিকুলে চলে গেছে।

তাই দেশে ব্যবস্থাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি ও বিদেশী বিনিয়োগকারীরা যাতে বিনিয়োগে নিরাপদবোধ ও আগ্রহী হয়ে ওঠেন সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি দেয়া জরুরি। একই সাথে বৈদেশিক বাণিজ্য ঘাটতিও একটা যৌক্তিক পর্যায়ে আনতে হবে। সংকোচিত বৈদেশিক শ্রমবাজারও সম্প্রসারণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। গতিশীলতা আনতে হবে রেমিট্যান্স প্রবাহেও। একমাত্র সরকারের সদিচ্ছা ও কার্যকর উদ্যোগই এ অবস্থা থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায়। দেশের মানুষ সরকারের কাছে দায়িত্বশীল আচরণই আশা করে।

কেবি

বি.দ্র. মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব। টাইমনিউজিবিডির সম্পাদকীয় নীতিমালার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই।