বিএনপির পুর্নাঙ্গ মহাসচিব হওয়ায় মোবাইল ফোনে অভিনন্দন জানাতেই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ধন্যবাদ জানিয়ে বললেন, “সকলের সহযোগিতা নিয়েই আমি আমার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে চাই।”
উত্তরার বাসায় তার সঙ্গে কথা বলার ইচ্ছে প্রকাশ করলে মির্জা ফখরুল জানালেন, তিনি জরুরি কাজে ঢাকার বাইরে যাচ্ছেন। ফেরার পর তার সঙ্গে কথা বলতে বললেন। অথবা জরুরি হলে ফোনেই কথা বলা যাবে বলে জানালেন বিএনপির এই নবনির্বাচিত মহাসচিব। এ ব্যাপারে দেরি করা ঠিক হবে না, তাই মোবাইলেই কথা বলতে আগ্রহ প্রকাশ করলাম।
বিএনপির মতো একটি বৃহৎ দলের মহাসচিবের দায়িত্ব পাওয়ার পর তার কাজের অগ্রাধিকার (প্রায়োরিটি) কী জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল বললেন, “গণতন্ত্র পুনঃউদ্ধার করাই তার দায়িত্বের প্রথম অগ্রাধিকার।”
তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, “বাংলাদেশে এখন গণতন্ত্র নির্বাসিত। একটি সুখি-সমৃদ্ধশালী দেশ গড়তে হলে প্রয়োজন গনতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম এই চেতনা হচ্ছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভিত্তি। কিন্তু জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার আজ ভ‚লুণ্ঠিত। বিএনপির মূল চ্যালেঞ্জ গণতন্ত্রকে পুনরায় ফিরিয়ে নিয়ে আসা। জনগণের অধিকারকে ফিরিয়ে নিয়ে আসা।
তিনি বলেন, “জনগণের ভোটের অধিকার, বাক-স্বাধীনতার অধিকার, জনগণের সংগঠন করার অধিকার এবং মৌলিক অধিকার ফিরিয়ে নিয়ে আসাই বিএনপির বড় কাজ।”
বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া গত ৩০ মার্চ মির্জা ফখরুলকে বিএনপির মহাসচিব পদে নির্বাচিত করেন। ১৯ মার্চ দলের ৬ষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে কাউন্সিলরদের দেয়া ক্ষমতাবলে খালেদা জিয়া মহাসচিব পদে মির্জা ফখরুলের নাম ঘোষণা করেন। এর আগে ২০১১ সালের মার্চে যখন দলের মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন মারা যান, তখন থেকেই মির্জা ফখরুল দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। তিনি ৫ম জাতীয় কাউন্সিলে দলের যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব পেয়েছিলেন।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলগীর বলেন, “আমার দ্বিতীয় অগ্রাধিকার হচ্ছে, সংগঠনের মধ্যে গতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। বিএনপি হচ্ছে, গ্রামেগঞ্জে-তৃণমূলে শিকড়গাড়া একটি সাধারণ মানুষের আর্শীবাদপুষ্ঠ একটি দল। এখন প্রয়োজন এ দলকে আরো গতিশীল করে গড়ে তোলা। এ জন্য আমরা এবারের কাউন্সিলে দলের গঠনতন্ত্রে সংশোধনীর মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, এক নেতা এক পদ।”
তিনি বলেন, “আমি নিজে ইতোমধ্যে একটি পদ রেখে বাকী পদগুলো থেকে পদত্যাগ করেছি। অন্য যারা একের অধিক পদে রয়েছেন, তাদের সবাই একটি পদ রেখে বাকী পদ থেকে পদত্যাগ করবেন। সেই সব পদে আমরা যোগ্যদের নির্বাচিত করব।”
তিনি বলেন, “একটি দল গতিশীল কি-না, তা নির্ভর করে সেই দলে তরুণ-তুর্কীরা নেতৃত্বে আছে কিনা। আপনারা জানেন, দলের দ্বিতীয় গুরুত্বপুর্ণ পদ সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হচ্ছেন তারেক রহমান। তিনি একেবারেই তরুন। এছাড়া এবারে যে কমিটি হবে তাতে প্রবীণদের পাশাপাশি তরুণদেরও রাখা হবে।”
তিনি বলেন, “নতুন কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি ঘোষণা হয়ে গেলে দায়িত্ব প্রাপ্তদের নিয়ে আমরা একটি নতুন কর্মসূচি হাতে নিয়ে সারাদেশ সফর করব। প্রয়োজনে জেলা, বিভাগে জনসভা, সভা ইত্যাদি করব। এভাবে দলের মধ্যে গতিশীলতা ফিরিয়ে আনব।”
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তার তৃতীয় অগ্রাধিকার সম্পর্কে বলেন, “বিএনপির নেতাকর্মীদের নেতৃত্বে বিগত কয়েকটি আন্দোলন পরিচালিত হয়েছে-এমন আন্দোলন বাংলাদেশের ইতিহাসে আর দেখা যায়নি। এতে আমাদের নেতাকর্মীরা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছেন। অনেকে নিহত হয়েছেন, গুম হয়েছেন এবং গ্রেফতার রয়েছেন। হাজার হাজার নেতাকর্মীর নামে মামলা রয়েছে। অনেক নেতাকর্মী গ্রেফতার আতঙ্কে নিজের ঘরে ঘুমোতে পারছেন না। এই যে এক ভীতিকর অবস্থা তা থেকে দলের নেতাকর্মীদের মুক্ত করতে হবে।”
উল্লেখ্য, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ১৯৪৮ সালের ১ আগস্ট তারিখে ঠাকুরগাঁও জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতি বিষয়ে স্নাতক (সন্মান) ডিগ্রী অর্জন করেছেন। ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে মির্জা ফখরুল অধ্যাপনাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। অন্যান্য সরকারী দায়িত্বের মধ্যে মির্জা ফখরুল বাংলাদেশ সরকারের পরিদর্শন ও আয়-ব্যায় পরীক্ষণ অধিদপ্তরে একজন অডিটর হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সক্রিয় ছাত্র রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের সময়ে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের (অধুনা বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ছিলেন।
মির্জা ফখরুল বলেন, “বিএনপি প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা একটি দল। এ দলকে শেষ করে দেয়ার জন্য প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। এরশাদ আমলে বিএনপিতে ভাঙ্গন ধরানো হয়েছে। এখনও এ অবস্থা চলছে। নতুন লোকদের দিয়ে নতুন নুতন বিএনপির জন্ম দেয়া হচ্ছে। সরকার যত চেষ্টাই করুক বিএনপিকে শেষ করতে পারবে না। আমি বলি, বিএনপি হচ্ছে ফিনিক্স পাখি। সেই গ্রিক উপকথার ফিনিক্স পাখিকে ধ্বংস করা যায় না। ধ্বংস করতে চাইলেই আবার সবেগে জেগে ওঠে।”
তিনি বলেন, “কেউ যদি বিএনপিকে অন্যান্য মৃত বা ভগ্নপ্রায় দলের সঙ্গে তুলনা করে তাহলে ভুল করবে। কেননা, যেসব দল মৃত বা ভগ্ন দলগুলো যুগের প্রয়োকজনে তাদের কর্মসূচিতে পরিবর্তন, পরিবর্ধন আনতে পারেনি। কিন্তু আমরা পেরেছি এবং পারছি।”
তিনি বলেন, “ওয়ান-ইলেভেনের সময় থেকে আজ পর্যন্ত একটু সময়ও আমরা অবসর পাইনি। দলকে এবং আমাদেরকে সুস্থির হতে দেয়া হচ্ছে না। কিন্তু তারপরও কী পারছে, আমাদের কাজ থেকে আমাদের বিরত করতে। আমরা দলের পুনর্গঠন কাজ করছি। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে অংশ নিয়েছি। এখন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছ্।ি শত বাধার মুখেও আমরা কাউন্সিল করতে পেরেছি। তাই বিএনপিকে শেষ করে দেয়া এত সহজ নয়।”
মির্জা ফখরুল ১৯৮০-র দশকে তিনি মূলধারার রাজনীতিতে আসেন। তিনি ১৯৭০-র দশকের শেষে তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী এস.এ. বারির ব্যাক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, যে পদে তিনি ১৯৮২ সালে এস.এ. বারির পদত্যাগ পর্যন্ত বহাল ছিলেন।
১৯৮৬ সালে পৌরসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে মির্জা ফখরুল তার শিক্ষকতা পেশা থেকে অব্যাহতি নেন এবং সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। তিনি সফল নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে ১৯৮৮ সালের পৌরসভা নির্বাচনে অংশ নেন এবং ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
জেনারেল এরশাদের সামরিক সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে যখন দেশব্যাপী আন্দোলন চলছে, তখন মির্জা ফখরুল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)- তে যোগদান করেন। ১৯৯২ সালে মির্জা ফখরুল ঠাকুরগাঁও বিএনপির সভাপতি মনোনীত হন।
(বি.দ্র. মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব। টাইমনিউজবিডির সম্পাদকীয় নীতিমালার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই)
মতামত
বিএনপির নয়া মহাসচিবের অগ্রাধিকার গণতন্ত্র পুনঃউদ্ধার
বিএনপির পুর্নাঙ্গ মহাসচিব হওয়ায় মোবাইল ফোনে অভিনন্দন জানাতেই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ধন্যবাদ জানিয়ে বললেন, “সকলের সহযোগিতা নিয়েই আমি আমার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে চাই।”





