রমাদান এল। চলেও গেল ১৭ টি। ই'ত্তেকাফের আয়োজনে মন টা কেবল ব্যাকুল ....মনে হয় কি যেন করব কি যেন করা উচিৎ কিন্ত করা হচ্ছেনা।

আমাদের যুগল- জীবন শুরু ১৯৭৯ এর জানুয়ারী থেকে।

'৮৩ সাল পর্যন্ত দেখেছি কাজ কাজ আর কাজ। সারাদিন মানকাটে নানান কাজে দৌড়ের উপর।রমাদানে কাজের পারিমান যায় আরো বহুগুন বেড়ে।তারাবীর নামাজ কোন দিন পড়ে আসেন কোন দিন বাসায় এসে পড়েন মীর কাসেম। শিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি...... নিজেই থাকি ভয়ে ভয়ে কি জানি কখন কি ভুল ধরা পরে যায়।!

অনেক প্রত্যাশা নিয়ে এসেছি শিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতির নিকট কত কি শিখব.... বাট.... এ তো দেখি হাতে কোন সময়ই নেই..... শেখাবে কখন? তারপর আছে ট্যুর - কর্মস্থল কক্সবাজার- বাবা মা চিটগঙ বউ ঢাকা। কিছুদিনের মধ্যেই সবাই ঢাকায় বাসা নিয়ে চলে এলেন কিন্ত কর্মস্থল থেকে গেল কক্সবাজার। হেড অফিস জেদ্দা -কাজের এক অংশ এমব্যাসী। তারপর জামাতে নুতন আসা।বিরাট ক্ষেত্র।

তারাবী একনকার মত সব মসজিদে একনিয়ম বেধে পড়ান হোতনা।তাই যে কোন মসজিদ ফিক্সড থাকতে হত খতম তারাবীর জন্য। সে টা সব সময় সম্ভব হতনা।অগত্যা জামাত বাদ হয়ে যেত।ভাব খানা এমন যে আল্লাহর দে য়া ফরজ দায়ীত্ব ই তো পালন করছি-সুন্নাত না হয় হলনা । এটা নিয়ে অনেক ভাবনা চিন্তার পর এ চিন্তাই প্রধান্য পেল --

আল্লাহর রাসুল সাহাবাকেরাম যে কাজ করেছেন তাদের জীবন তো আরো ব্যাস্ত কঠিন ছিল তারা তো তারাবীর নামাজ জামাত ছাড়া পড়েননি। আমাদের জীবন এখনও অতটা কঠিন হয়নি।তদের তো দিনের সিয়াম রাতের কিয়াম বাদ যায়নি বরং তারা ছিলেন রাতের দরবেশ। সারা দিন ঘোড় সওয়ার সারারাত জায়নোমাজে।আবার বাড়তি রোজাও করতেন।

কাজের অন্ত নেই ঠিক কিন্তু আমরা যদি আল্লাহর ইবাদতের হাক্ক ঠিকমত আদায় করতে পারি -আল্লাহ সুবহানু অতা ওল্লাহ আমাদের সময়ের বরকত দিবেন- কাজের বরকত দিবেন তাতে আবার আমাদের আধ্যাত্মিক মুল্যবোধ ও বেড়ে যাবে।এতে জজবা বেড়ে যাবে অনেক বেশি।

দেখলাম শুরু হয়ে গেল এবাদত। বন্দেগীতে মনযোগী হওয়া বেড়ে গেল।১৯৮৪ সালথেকেই ই'ত্তেকাফ করা শুরু কুরলেন।আর আমিও স্বস্তি পেতে থাকলাম অন্তরে। ফিরে গেলাম শৈশবে। আব্বা ই'ত্তেকাফ করতেন। যখন থেকে আমি মনে করতে পারছি তখন তেকেই দেখেছি আব্বা ইত্তিক্কাফে বসেন।

আমার দুই ভাইই ঢাকায় পড়াশুনা করতেন বলে বাড়ীতে মা আর আমরা মেয়েরা থাকতাম।আব্বা চাকরী করতেন ঢাকা আর তাবলীগ নিয়ে থাকতেন।রোজায় বাড়ী আসতেন আর শেষ দশ দিন বসতেন মসজিদে ই'ত্তেকাফে।আর আব্বার সব কিছু দেয়া নেয়ার দায়ীত্ব পরতো আমার উপর।আব্বা আমার নাম রেখে ছিলেন আয়েশা যেন মা আয়েশা (রঃ) মত হই।তাই খেদমত হত আর আব্বার তা'লীম ও চলত আমাকে ঘিরে।আমাদের বাড়ীর দরজায় ই মসজিদ।তাই রাতেও খাবার নিয়ে আমি যেতাম।সে সময় শরৎ কালে রোজা হত।অত ছোটবেলার কথা কেন যেন খুব নস্টালজিক হয়ে যাই সেসব কথা ভেবে।একটা দৃশ্য বারবার ই মনে পরে।মসজিদের শিড়ির দুই পাশে ছিল হাসনাহেনা আর শিউলী ফুলের গাছ।আর সামনেই ছিল বেলীফুলের ঝার।

শেষ রাতে আসতে শুরু করলেই দক্ষিনের হাওয়ায় এমন সুঘ্রান ভেসে আসতে থাকত আমি বিমোহিত হয়ে যেতাম।সিড়ি তক এলেই দেখতাম ফুলেফুলে ছেঁয়ে আছে সিড়িগুল পাশে সবুজ দূর্বাঘাসে কমলা বোটা সাদা সাদা পাপড়ী নিয়ে মুখ থুবরে পরে অপরুপ রূপের মায়া ছড়িয়ে এক রুপের নগরী।শুভ্র-শ্যমল-সুবাস মিলে মোহচ্ছন্য আমি....সাথে দখিনা মৃদুমন্দ মলয় উর্ধে স্বচ্ছাকাশ আলোর বন্যা.........

মীর কাসেম যখন ই'ত্তেকাফ শুরু করলেন-আমার স্মৃতিময় শৈশব কেবলি জড়িয়ে থাকত আমার চেতনা জুড়ে।

মীর পুরে ১ম ই'ত্তেকাফে টিনের চাল -বাইরে টয়লেট বর্ষাকাল- প্রচন্ড মশা আমার মসজিদ ঘর যখন বিল্ডিং হচ্ছে ভীষন শীত দরজা জানালা লাগান হয়নি। আবার তীব্র গরম -গায়ে ঘামাচী উঠে ঘা হয়ে যেত।

আলহামদুলিল্লাহ!! আল্লাহ বান্দা প্রশান্ত চিত্তে ই'ত্তেকাফ থেকে ফিরে যথন অনুভুতি শেয়ার করতেন যেন শুদ্ধ,মুক্ত,পবিত্র কিন্ত আল্লাহর প্রেমে পরিপুর্ন এক দরবেশ কিন্ত আল্লাহর দেয়া দায়িত্ব পালনে কর্তব্য পরায়ন দৃঢ় প্রত্যয়ী বিপ্লবী পুরুষ।

পঁচিশ টি বছর।একবার শুধু বাদ গেল সাংগঠনিক সিদ্ধান্তে।এই ২৪ বছর ই'ত্তেকাফ করেছেন আজ তিন বছর ধরে তাকে জুমার নামাজ পরার সুযোগ দেয়া হয়না। মসজিদে জামাতে নামাজ পড়তে দেয়া থেকে বিরত রাখা হয়েছে আর বঞ্চিত করা হয়েছে এত বড় স্রস্টার নৈকট্য লাভের উপায় আত্মশুদ্ধির আত্মগঠনের মত ইবাদত থেকে।

আর এত দিনের অভ্যাস মতে আমি মনে মনে প্রস্তুতি নিই কি কি লাগবে তার ই'ত্তেকাফে।তার বিছানা চাদর বালিশ। থালাবাটি চামচ রশি থেকে শুরু করে সব সব।লিস্ট করি।আসাদ কে কিন্তে বলি।মুন্নাকে প্রযোজনীয় কাজের জন্য থাকতে বলি।আমার জন্য বারবার দোয়া করতে বলি।না না কেউ দেখেনা। কেউ শোনেও না। এসব করি যে মনে মনে। আর কাঁদতেও কেউ দেখেনা।কান্না নয় জালিমের বিরুদ্ধে এক। প্রচন্ড দ্রোহ কেবলি আমায় অবশ বিবশ করে দেয়।আমি কেবলি ফরিয়াদ জানাই বিচার দিনের মালিকের সমীপে।

লেখাটি মীর কাশেম আলীর স্ত্রী আয়েশা খন্দকারের ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে সংগৃহীত। তার ফেসবুক লিংক দেয়া হল:    https://www.facebook.com/ayesha.khandkar/posts/1612794409001326

ইআর