প্রথম পর্বের পরে....

১৫

মৃত্যু আমার দরজায় এসে গিয়েছে। অনন্তের দিকে আমার মন উড়ে চলেছে ... এত সুন্দর, এত কঠিন, এত পূতপবিত্র সময়ে আমি তোমাদের জন্য কি রেখে যাব? একটাই জিনিস। সেটা হচ্ছে আমার স্বপ্ন মুক্ত ভারতের সোনালি স্বপ্ন।

১৮ এপৃল ১৯৩০ তারিখটি কখনোই ভুলে যেও না চট্টগ্রামে পূর্বঞ্চলীয় বিদ্রোহের দিনটি ... ভারতের স্বাধীনতার জন্য যেসব দেশপ্রেমিক জীবন দিয়েছেন তাদের নামগুলো তোমার হৃদয়ের অন্তঃস্থলে লিখে রেখ।

সূর্য সেন (পূর্ণ নাম সূর্যকুমার সেন যিনি মাস্টারদা নামে সমধিক পরিচিত ছিলেন, (২২.৩.১৮৯৪ - ১২.৩.১৯৩৪)। চট্টগ্রামে অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের বিপ্লবী মহানায়ক। সূর্য সেনের জন্ম হয়েছিল নোয়াপাড়া, রাওজান, চট্টগ্রামে।

নন্দনকাননে একটি স্কুলের টিচার সূর্য সেন যোগ দেন বিপ্লবী সংগঠন অনুশীলন সমিতি-তে। লক্ষ্য ছিল ভারতে বৃটিশ শাসনের অবসান। অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের পর জালালাবাদ পাহাড়ের কাছে তাকে ও তার দলকে ঘিরে ফেলে বৃটিশ বাহিনী।

খণ্ডযুদ্ধে মারা যান বারোজন বিপ্লবী। কেউ আহত হন। কেউ ধরা পড়েন। সূর্য সেন পালিয়ে যেতে পারেন। ছদ্মবেশ ও ছদ্মপরিচয়ে (এমনকি মুসলিম পরিচয়েও)। সূর্য সেন কিছুদিন লুকিয়ে থাকার পর নেত্র সেন নামের এক ব্যক্তির বিশ্বাসঘাতকতায় ধরা পড়েন। সূর্য সেনকে টর্চার করা হয়। বিচারে তার মৃত্যুদণ্ড হয়। চট্টগ্রাম জেলে সূর্য সেনের ফাসির মঞ্চ এখন বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক সংরক্ষিত। তার নামে ঢাকায় একটি ছাত্রাবাস হয়েছে।

বিশ্বাসঘাতক নেত্র সেনকে হত্যা করে বিপ্লবীরা প্রতিশোধ নিয়েছিল। সূর্য সেন (৩৯) তার এক বন্ধুকে শেষ যে চিঠি লিখেছিলেন তার কয়েকটি লাইন ওপরে উদ্ধৃত হয়েছে। তবে মূল বাংলা চিঠি না পাওয়ায় তার ইংরেজি অনুবাদের একটি ভাষান্তর প্রকাশিত হয়েছে।

১৬

কুত্তার বাচ্চারা, আমার মা-কে ভালোবাসা জানিয়ে দিস।

ফ্রান্সিস ক্রাউলি (Francis Crowley,? - ১৯৩৯)। আমেরিকান ডাকাত ও খুনি। ১৯৩৯-এ সিং সিং জেলখানায় ইলেকটৃক চেয়ারে বসে মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে তিনি এই নির্দেশ দিয়েছিলেন।

১৭

আমি শুধু একটাই অনুরোধ করছি আমাকে আমার কাজটা শেষ করতে দিন।

আইজ্যাক বেবেল (Isac Babel, ১৮৯৪ - ১৯৪১)। ছোট গল্প লেখক রাশিয়ান ইহুদি। গুপ্তচরবৃত্তি ও সন্ত্রাসের মিথ্যা অভিযোগে সভিয়েট সিক্রেট পুলিশ ১৯৩৯-এ তাকে গ্রেফতার করে। যে অসম্ভব অবিচারের দুঃস্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন সেটা ফ্রানজ কাফকা তার দি ট্রায়াল উপন্যাসে কল্পনা করেন।

১৯৪০-এ বেবেল (৪৪) বাধ্য হন একটা স্বীকারোক্তি দিতে। তার মৃত্যুদণ্ড হয়। গুলি করে তাকে হত্যার আগে এই ছিল তার শেষ কথা।

১৮

আর সোয়া ঘণ্টা পরে আমি মারা যাব। নিজের দেশের মানুষের হাতে মরাটা কঠিন। কিন্তু এই বাড়িটা ঘিরে রাখা হয়েছে। আর হিটলার দেশদ্রোহিতার অভিযোগ করেছেন আমার বিরুদ্ধে।

জার্মানির জন্য আফৃকাতে আমি যেসব কাজ করেছি, তার স্বীকৃতি স্বরূপ আমাকে বিষ খেয়ে মরার সুযোগ দেওয়া হয়েছে ... সেটা যদি আমি করি তাহলে আমার পরিবারের কারো বিরুদ্ধে, অর্থাৎ, তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ওরা নেবে না। আমার কর্মচারিদের বিরুদ্ধেও কোনো শান্তিমূলক ব্যবস্থা নেবে না।

আরউইন রোমেল (Erwin Rommel ১৮৯১ - ১৯৪৪)। জার্মান জেনারেল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক পর্যায়ে তিনি হিটলারের প্রতি শ্রদ্ধা হারিয়ে ফেলেন এবং তাকে হত্যার চক্রান্তে যোগ দেন। সেই চক্রান্ত ব্যর্থ হয়। রোমেল ধরা পড়েন।

হিটলার তাকে দুটি বিকল্প দেন, ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যু অথবা বিষপানের আত্মহত্যা। রোমেল (৫২) দ্বিতীয় বিকল্পটি বেছে নিয়েছিলেন এবং বিষ খাওয়ার আগে এই কথাগুলো তার ছেলে ম্যানফ্রেড-কে বলেছিলেন।

১৯

আমার কাহিনী হচ্ছে একটি প্রেমের কাহিনী। কিন্তু এটা বুঝবে শুধু তারাই যারা প্রেমের ফলে নির্যাতিত হয়েছে। আমার সম্পর্কে বলা হয়েছিল আমি আবেগবিহীন মোটা নারী। হ্যা, আমি মোটা।

কিন্তু সেটাই যদি অপরাধ হয়, তাহলে কয়জন নারীকে মোটা হওয়ার অপরাধে দোষী রায় দেওয়া হয়েছে? আমি আবেগবিহীন স্টুপিড নই। বোকাও নই। আমার শেষ কথা এবং শেষ চিন্তা হলো : যে নিষ্পাপ সে যেন প্রথম পাথরটি ছুড়ে মারে।

মার্থা বেক (Martha Beck, ৬.৫.১৯২০ - ৮.৩.১৯৫১)। আমেরিকার সিরিয়াল খুনি। স্থূলাঙ্গী নারী মার্থা বেক ও তার প্রেমিক রেমন্ড ফার্নান্ডেজ খুনের জন্য অভিযুক্ত হয়েছিল। ১৯৪৯-এ তাদের বিচার চলার সময়ে লোনলি হার্টস কিলার ((Lonely Hearts Killer) নামে মামলাটি পরিচিত হয়।

মার্থা (৩০) ও রেমন্ড (৩৬) ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপন দিয়ে লোনলি বা নিঃসঙ্গ নারীদের প্রলুব্ধ করে হত্যা করত। ১৯৫১- তে সিং সিং জেলখানায় মার্থা ও রেমন্ডের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

২০

জার্মানি দীর্ঘজীবী হোক। আর্জেনটিনা দীর্ঘজীবী হোক। অস্টৃয়া দীর্ঘজীবী হোক। এই তিনটি দেশের সঙ্গে আমি সবচেয়ে বেশি জড়িত ছিলাম এবং এটা আমি ভুলব না।

আমার স্ত্রী, আমার পরিবার এবং আমার বন্ধুদের ভালোবাসা জানাচ্ছি। আমি রেডি। আমাদের আবার দেখা হবে। এটাই সবার নিয়তি। আমি ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস রেখে মরছি।

অটো এডলফ আইখম্যান (Otto Adlof Eichman ১৯০৬ - ১৯৫২)। জার্মান নাৎসি লেফটেনান্ট কর্নেল। যুদ্ধ শেষের পরে বুয়েনস আইরেস, আর্জেন্টিনাতে পালিয়ে থাকেন। মোসাদ বাহিনী তাকে কিডন্যাপ করে ইসরেলে নিয়ে যায়।

সেখানে বিচারে যুদ্ধ অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দণ্ডিত হন। আইখম্যানের (৫৬) ফাসি কার্যকর করা হয় ৩১ মে ১৯৬১-তে। এখন পর্যন্ত এটাই ইসরেলে বেসামরিক আদালতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের একমাত্র ঘটনা।

২১

আমেরিকান ফ্যাসিজমের প্রথম ভিকটিম আমরা।

ইথেল রোজেনবার্গ (Ethel Rosenberg, ২৫.৯.১৯১৫ - ১৯.৬.১৯৫৩)। অভিনেত্রী ও গায়িকা।

এটম বোমা স্পাই রূপে অভিযুক্ত ও ইলেকটৃক চেয়ারে মৃত্যুদণ্ড দণ্ডিত হয়েছিলেন। অনেকের মতে তিনি ও তার স্বামী, তারা দুজনই নিরপরাধ ছিলেন।

১৯৫৩- তে ইথেলের (৩৭) মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে নিয়ম অনুসারে তিনটি ইলেকটৃক শকের পরেও তার মৃত্যু হয় না। তখন ডাক্তাররা পরীক্ষা করে বোঝেন ইথেলের হার্ট বিট চলছে। এরপর তাকে আরো দুটি ইলেকটৃক শক দেওয়া হয় ইথেলের মাথা থেকে ধোয়া বের হয়। তিনি মারা যান।

২২

আমরা দুজনই নিরপরাধ। এটাই পূর্ণ সত্য। জীবন একটা অমূল্য সম্পদ। কিন্তু সেই সম্পদটাও রক্ষার জন্য এই সত্যটাকে অস্বীকার করা যাবে না। সত্য এড়িয়ে আমাদের জীবন কিনলেও আমরা সম্মান নিয়ে বেচে থাকতাম না।

জুলিয়াস রোজেনবার্গ (Julius Rosenberg, ১২.৫.১৯১৮ - ১৯.৬.১৯৫৩)। ইলেকটৃকাল ইনজিনিয়ার। এটম বোমা স্পাই রূপে অভিযুক্ত ও ইলেকটৃক চেয়ারে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত।

একই অভিযোগে তার স্ত্রী ইথেলও দণ্ডিত হয়েছিলেন। জুলিয়াসের (৩৫) মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় ১৯৫৩-তে। প্রথম শকেই জুলিয়াস মারা যান।

২৩

হ্যা, নিশ্চয়ই। আমি একটা বুলেটপ্রুফ ভেস্ট (গেঞ্জি) চাই।

জেমস ডাবলিউ রজার্স (James W. Rodgers - ১৯৬০)। আমেরিকান কৃমিনাল। ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুর আগে তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তার শেষ অনুরোধটা কি?

২৪

আমি দেশের, জাতির ও ধর্মের বৃহত্তর মঙ্গলের জন্য তাকে হত্যা করতে রাজি হয়েছিলাম।

তালদুয়ে সোমারায়া থিরো (১৯৯৫ - ১৯৬২)। বৌদ্ধ ভিক্ষু। ২৬ সেপ্টেম্বর ১৯৫৯-তে কলম্বোতে শ্রী লংকার প্রধানমন্ত্রী সলোমন বন্দরনায়েক (৬০)- কে তার বাসভবনে গুলি করে হত্যার পর আদালতে ওপরের উক্তিটি করেন থিরো।

বিচার প্রাপ্ত থিরোর ফাসি হয় ৭ জুলাই ১৯৬২-তে। মুমূর্ষ অবস্থায় বন্দরনায়েক অনুরোধ করেছিলেন থিরোকে ক্ষমা করে দিতে এবং কোনো প্রতিশোধ না নিতে।

বন্দরনায়েকের মৃত্যুর নয় মাস পরে ২১ জুলাই ১৯৬০-এ তার স্ত্রী শ্রীমাভো বন্দরনায়েক হন শ্রী লংকার এবং বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী।

২৫

আমি এই মুহূর্তটার জন্যই অপেক্ষা করছি। আমি যেভাবে বেচে আছি তেমনভাবে আগে কখনোই বাচিনি। ঈমানের (প্রকৃত বিশ্বাসের) মানে আমি বুঝতে পারছি।

আকিদাহর (প্রকৃত ইসলামি বিশ্বাসের) মানেও আমি বুঝতে পারছি... আমি শাহাদাতের জন্য অপেক্ষা করছি। এর চাইতে ভালোভবে আমি এর আগে আর কখনোই বাচিনি।

সাইয়িদ কুতুব (১৯০৬-১৯৬৬)। ইজিপ্টের ইসলামি তাত্ত্বিক, লেখক, কবি ও ইসলামি ব্রাদারহুড পার্টির অন্যতম নেতা। প্রেসিডেন্ট জামাল আবদুল নাসের চেষ্টা করেছিলেন তাকে নিজের পক্ষে টানতে। সেই চেষ্টা ব্যর্থ হবার পরে একটি প্রহসনমূলক বিচারে কুতুবকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

আদেশটি শোনার পরে কুতুবের মুখে হাসি ফুটে ওঠে। তিনি আদালতে বলেন, আলহামদুলিল্লাহ। আমি পনের বছর যাবৎ জেহাদ করে এই শাহাদত অর্জন করতে চলেছি। ফাসির সময়ে তার মুখে হাসি ছিল এবং তিনি হাত নেড়ে জেল গার্ডদের বিদায় জানান।

২৬

যা করে থাকি না কেন তার জন্য আমি গর্বিত। আমি ভীত নই। শেষে শুধু বলব, আমি আমার দেশ ও জাতিকে ভালোবাসি। এ জাতির প্রাণে আমি মিশে রয়েছি।

কার সাহস আছে আমাদের আলাদা করবে? নিঃশঙ্ক চিত্তের চেয়ে জীবনে আর কোনো বড় সম্পদ নেই। আমি তার অধিকারী। আমি আমার জাতিকে তা অর্জন করতে ডাক দিয়ে যাই।

আবু তাহের (১৪.১১.১৯৩৮ - ২১.৭.১৯৭৬)। মুক্তিযোদ্ধা ও কর্নেল। ১৯৭৫- এ সেনাবাহিনীতে সংঘটিত হত্যা ও দেশদ্রোহিতার অপরাধে ২৪ নভেম্বর ১৯৭৫- এ গ্রেফতার হন আবু তাহের। ২১ জুন ১৯৭৬-এ ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে তার বিচার শুরু হয়।

বিচারের সময়ে আবু তাহের যে সুদীর্ঘ বিবৃতি দিয়েছিলেন তার শেষাংশ ওপরে উদ্ধৃত হয়েছে। ১৭ জুলাই তার মৃত্যুদণ্ড ঘোষিত হয় এবং ২১ জুলাই ১৯৭৬ সেটি কার্যকর করা হয়।

২৭

ওই লোকটাকে আমি খুন করিনি। আমার আল্লাহ সেটা জানেন। আমি খুন করে থাকলে সেটা স্বীকার করার মতো সাহস আমার আছে। এখন যে বিপদ ও অপমানের মধ্য দিয়ে আমাকে যেতে হচ্ছে, তার চাইতে কম হতো ওই স্বীকারোক্তি করলে।

কোনো আত্মমর্যাদা বোধ সম্পন্ন ব্যক্তি এই বর্বর বিচার সহ্য করতে পারেন না। আমি একজন মুসলিম। একজন মুসলিমের ভাগ্য নিয়ন্ত্রা আল্লাহ। আমি পরিষ্কার বিবেক নিয়ে তার সামনে দাড়াতে পারব। তাকে বলতে পারব একটা ধ্বংসস্তূপ থেকে আমি তার ইসলামি রাষ্ট্র পাকিস্তানকে পুনর্গঠিত করে একটা সম্মানজনক অবস্থায় উন্নীত করেছিলাম।

কোটি লাখপতি- এর দুর্বিষহ স্থানে আমি আমার বিবেক নিয়ে পূর্ণ শান্তিতে আছি। মৃত্যুর জন্য আমি ভীত নই। তুমি দেখেছ আগুনের মধ্য দিয়ে আমি কিভাবে হেটে গিয়েছি।

জুলফিকার আলী ভুট্টো (৫.১.১৯২৮ - ৪.৪.১৯৭৯)। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী। ১৯৭৭-এ একটি সামরিক ক্যু-তে পদচ্যুত ও গ্রেফতার হন ভুট্টো। নতুন শাসক জেনারেল জিয়াউল হকের নির্দেশে ভুট্টোর বিচার হয় মার্চ ১৯৭৪-এ বিরোধী পলিটিশিয়ান আহমেদ রাজা কাসুরির পিতা আহমেদ খান কাসুরিকে গুলি করে হত্যার অপরাধে।

হুকুমের আসামি রূপে ভুট্টোকে কাঠগড়ায় দাড়াতে হয়। তার প্রতিবাদ গ্রাহ্য হয় না। ফাসিতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ভুট্টো তার কন্যা বেনজিরকে যে শেষ চিঠি লিখেছিলেন তার কিছু অংশ ওপরে উদ্ধৃত হয়েছে। কথিত আছে, ফাসির মঞ্চে যাওয়ার সময়ে ভুট্টো (৫১) খুব ভীত হয়েছিলেন।

তার মৃত্যুর জন্য দায়ী জিয়াউল হক প্রেসিডেন্ট পদে থাকার সময় ১৯৮৪-তে একটি নাশকতামূলক বিমান দুর্ঘটনায় মারা যান।

২৮

মনে রেখ, আজ থেকে তুমি আমার সন্তানের মা-ই শুধু নও। তুমি তাদের পিতাও।

নওয়াজিশ উদ্দীন (? - ১৯৮১)। মুক্তিযোদ্ধা ও কর্নেল। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যার সময়ে সেনাবাহিনীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত। সেপ্টেম্বর ১৯৮১-তে মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে তার স্ত্রীকে লেখা চিঠির অংশ।

২৯

প্রিয় বিশ্বাসী জনগণ, আমি তোমাদের কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছি। কিন্তু আমি থাকব পরম করুণাময় আল্লাহর সঙ্গে। তার কাছে যারা আশ্রয় চান তিনি তাদের সাহায্য করেন এবং কখনোই কোনো বিশ্বাসীকে নিরাশ করেন না ... আল্লাহ মহান ... আল্লাহ মহান ... আমাদের জাতি দীর্ঘজীবী হোক ... আমাদের সংগ্রামী জনগণ দীর্ঘজীবী হোক ... ইরাক দীর্ঘজীবী হোক ... প্যালেস্টাইন দীর্ঘজীবী হোক ... জেহাদ ও মুজাহেদিন দীর্ঘজীবী হোক।

সাদ্দাম হোসেন (২৮.৪.১৯৩৭ - ৩০.১২.২০০৬)। ইরাকের প্রেসিডেন্ট। আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ১৩ ডিসেম্বর ২০০৩-এ তিনি ধরা পড়েন। বিচারে তার ফাসিতে মৃত্যুদণ্ড হয়। ৩৯ বছর (ফেব্রুয়ারি ১৯৬৪ - এপৃল ২০০৩) ক্ষমতায় থাকা কালে সাদ্দাম হোসেনের নির্দেশে বহু ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছিল।

সাদ্দামের পতন অনিবার্য ভেবে তার দুই জামাই সপরিবারে জর্ডানে পালিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু সাদ্দামের অনুরোধে এবং নিরাপত্তার আশ্বাসে তারা ফিরে এলে তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। শ্বশুর সাদ্দামের নির্দেশে দুই জামাইয়ের ফাসি হয়েছিল।

ইরাকে সাদ্দাম বিরোধী আমেরিকা অভিযাগের পর একটি ইরাকি আদালতে ১৯৮২-তে ১৪৮ ইরাকি শিয়া হত্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে সাদ্দামকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। ফাসির মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে মোবাইল ফোন ক্যামেরায় ধারণ করা সাদ্দামের (৬৯) ছবিতে তাকে অকুতোভয় ও দৃঢ়চেতা রূপে দেখা যায়। মৃত্যুর আগে সাদ্দাম তার উকিলকে শেষ যে চিঠি লিখেছিলেন তার কিছু অংশ ওপরে উদ্ধৃত হয়েছে।

৩০

তওবা আমি নিজেই জানি। আমি জিন্দা পীরের আওলাদ। আপনারা জানেন না, আমার পূর্বপুরুষরা ইয়েমেন থেকে এসেছিলেন। আমি নিজেও একজন পীর। তবে কখনো পীরগিরি করতে যাইনি। মৃত্যুকে কখনো ভয় পাইনি ... ওই যে ড্রেসটি দেখছেন, সেটি আমি আগেই ধুয়ে রেডি করে রেখেছি।

নামাজও আমি আগেই পড়েছি ... আমি জুতা পায়ে মঞ্চের দিকে যেতে চাই তবে মঞ্চে ওঠার আগে সেটা খুলে নেবেন।

সৈয়দ ফারুক রহমান (? - ২৭.০১.২০১০)। মুক্তিযোদ্ধা ও লেফটেনান্ট কর্নেল। ৩ নভেম্বর ১৯৭৫-এ ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে বন্দি চার আওয়ামী লীগ নেতাকে হত্যার অভিযোগে দণ্ডিত ফারুক তার ফাসি কার্যকর হবার আগে জেলের পেশ ইমাম ও জেল কর্মকর্তাদের উদ্দেশে এ উক্তিটি করেন।

৩১

রিভিউ পিটিশনের আগেই আপনারা ফাসির প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছেন। আমি কিন্তু জেল কোড ভালো করেই জানি।

সুলতান শাহরিয়ার রশিদ (? - ২৭.০১.২০১০)। মুক্তিযোদ্ধা ও লেফটেনান্ট কর্নেল। ৩ নভেম্বর ১৯৭৫-এ ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে বন্দি চার আওয়ামী লীগ নেতাকে হত্যার অভিযোগে দণ্ডিত সুলতান রশিদ তার ফাসি কার্যকর হবার আগে জেল কর্মকর্তাদের উদ্দেশে হাসিমুখে এই উক্তিটি করেন।

এর আগে একটি শাদা কাগজে তিনি লেখেন, আমি একজন ফৃডম ফাইটার। এর সঙ্গে আমি জড়িত না। তাই নীতিগত কারণে রাষ্ট্রপতির কাছে আমি প্রাণভিক্ষা চাইতে পারি না।

৩২

আমাকে এই অবস্থানে ওঠানোর জন্য আল্লাহকে শত কোটি কৃতজ্ঞতা জানাই। সকল বিশ্বাসীকেও আমার অভিনন্দন জানাই। কারণ, আমরা সবাই একসঙ্গে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাড়িয়েছি এবং আমাদের শেষটাও হতেই হবে সত্য ও ন্যায়ের পথে।

আমার পরিবারের প্রতি অনুরোধ, আমার মৃত্যুতে শোকার্ত না হয়ে তাদের উচিত হবে আমি যে অবস্থান অর্জন করেছি তাকে শ্রদ্ধা করা। আল্লাহ তোমাদের সবচেয়ে বড় রক্ষাকর্তা ও সাহায্যদাতা। আল্লাহ হাফেজ।

আফজাল গুরু (১৯৬৯ - ৯.২.২০১৩)। কাশ্মিরে জন্ম হওয়া ইনডিয়ান ব্যবসায়ী যিনি কাশ্মিরিদের স্বাধিকারের পক্ষে ছিলেন। ২০০১-এ ইনডিয়ান পার্লামেন্ট ভবনে সন্ত্রাসী হামলায় সংশ্লিষ্ট থাকার অভিযোগে ওই বছরেই গ্রেফতার হন।

১২ বছর সলিটারি কনফাইনমেন্টে তাকে রাখা পর ৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৩-তে আফজাল গুরুর (৪৩) মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় দিল্লির তিহার জেলে। মৃত্যুর আগে তার পরিবাবের কাছে ১০ লাইনের শেষ চিঠির শেষাংশ ওপরে উদ্ধৃত হয়েছে।

৩৩

মৃত্যুবরণকারীদের আল্লাহর কাছে অতি উচ্চ মর্যাদার কাথা আল্লাহ স্বয়ং উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ নিজেই যদি আমাকে জান্নাতের মর্যাদার আসনে বসাতে চান তাহলে আমার এমন মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার জন্য প্রস্তুত থাকা উচিত।

কারণ জালেমের হাতে অন্যায়ভাবে মৃত্যু তো জান্নাতের কনফার্মড টিকেট ... যদি সম্ভব হয় তাহলে মহল্লার মসজিদে এবং বাড়িতে জানাজার ব্যবস্থা করবে।

পদ্মার ওপারের জেলাগুলোর লোকেরা যদি জানাজার শরিক হতে চায়, তাহলে আমাদের বাড়ির এলাকায় যেন আসে।

তাদের অবশ্যই খবর দেওয়া দরকার ... কবরের ব্যাপারে তো আগেই বলেছি, আমার মায়ের পায়ের কাছে। কোনো জৌলুসপূর্ণ অনুষ্ঠান বা কবর বাধানোর মতো বেদআত যেন না করা হয়। সাধ্য অনুযায়ী ইয়াতিমখানায় কিছু দান খয়রাত করবে।

ইসলামি আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সাহায্য-সহযোগিতা করবে। বিশেষ করে আমার গ্রেফতার এবং রায়ের কারণে যারা শহীদ হয়েছে, অভাবগ্রস্ত হলে ওই সব পরিবারকে সাহায্য-সহযোগিতার ব্যাপারে অগ্রাধিকার দিতে হবে ...

পেয়ারী, হে পেয়ারী,

তোমাদের এবং ছেলেমেয়ের অনেক হকই আদায় করতে পারিনি। আল্লাহর কাছে পুরস্কারের আশায় আমাকে মাফ করে দিও। তোমাদের জন্য বিশেষভাবে দোয়া করেছি। ইনশাআল্লাহ, জান্নাতের সিড়িতে দেখা হবে ...

আবদুল কাদের মোল্লা (২.১২.১৯৪৮ - ১২.১২.২০১৩)। জামায়াতে ইসলামী নেতা। ১৯৭১-এ যুদ্ধ অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে বিচারে প্রথমে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত। পরে প্রচলিত আইন বদলিয়ে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

বিচারকালে তিনি দাবি করেছিলেন একই এলাকায় বসবাসকারী জনৈক কসাই কাদেরের সঙ্গে তার পরিচয় গুলিয়ে ফেলা হয়েছে এবং তিনি (কাদের মোল্লা) নির্দোষ।

স্ত্রীকে লেখা তার শেষ চিঠির কিছু অংশ ওপরে উদ্ধৃত হয়েছে। প্রেসিডেন্টের কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করতে তিনি রাজি হননি। ১২ ডিসেম্বর ২০১৩ ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে কাদের মোল্লার ফাসি হয়।

অপরাধী এবং নিরপরাধী উভয় ধরনের দণ্ডিত ব্যক্তিদের শেষ কথাগুলো থেকে আমরা যারা জীবিত আছি, তারা গভীরভাবে বিবেচনা করতে পারি, মৃত্যুদণ্ডের কার্যকারিতা ও তাতপর্য কি?

জীবনের অধিকার, রাইট টু লাইফ (Right to life) মানুষের একটি মৌলিক অধিকার। আমরা বিবেচনা করতে পারি, মানুষের এই মৌলিক অধিকার হরণের ক্ষমতা রাষ্ট্রের থাকা উচিত কিনা?

আমরা সিদ্ধান্তে আসতে পারি, সভ্য দেশ হলে রাষ্ট্র কর্তৃক মৃত্যুদণ্ড দেওয়া রহিত করতেই হবে।

মধ্যম আয়ের দেশ না হতে পারলেও, বাংলাদেশ যেন মধ্যম সভ্যতার দেশ হতে পারে, সেই লক্ষ্যে আমরা সবাই কাজ করতে পারি।সূত্র:অন্য দিগন্ত

এসএইচ