সময় দুপুর ১২ টা। সিদ্ধেশ্বরীর মুক্তি মেটার্নিটি গলির ফুটপাথ থেকে প্রায় ৩ হাজার টাকার মাছ ক্রয় করে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন জনৈক ব্যবসায়ীর স্ত্রী মিসেস নাহার। মধ্যবয়সী রিকশা চালককে ভাড়া করলেন পঞ্চাশ টাকায়। রিকশা শান্তিনগর বাজারের কাছাকাছি আসলে কিছু কাঁচা বাজার সদাইয়ের মনস্থির করার পরক্ষনেই তা মন থেকে উবে গেলপাছে রিকশাওয়ালা মাছগুলো নিয়ে চম্পট দেয় কিনা এই ভয়ে।
রিকশা শান্তিনগর বাজার অতিক্রম করে বেশ কিছুটা সামনে। এমন সময় রিকশার চাকায় সমস্যা দেখা দেয়। রিকশা একদিকে হেলে চলতে থাকে। কিছুদুর যাবার পর রিকশাওয়ালা মিসেস নাহারকে বলে আপা রিকশায় সমস্যা যাবোনা, আপনি অন্য রিকশা দেখেন। মিসেস নাহার নেমে অন্য আরেকটি রিকশা নিয়ে চলতে থাকে। অল্প সময় পর প্রথম রিকশাওয়ালা মিসেস নাহারের বর্তমান ভাড়াকৃত রিকশার সামনে এসে দাড়ায় এবং রিকশা থামাতে বলে। মিসেস নাহারকে জিজ্ঞাসা করে তার কিছু পড়ে গিয়েছে কিনা? মিসেস নাহার বলে, না।
প্রথম রিকশাওয়ালা মিসেস নাহারের হাতে একটি মলিন দশটাকায় মোড়ানো ভারী কিছু একটা দেয়। মোড়ানো দশটাকার নোটটি খুলে দেখা যায় তাতে এটি গোল্ডবার এবং একটি কাগজ। যাতে লেখা আছে “এই ৪ ভরি ওজনের বারটি বায়তুল মোকাররম এর ওমুক দোকানে দিয়ে আসতে হবে। যার বর্তমান বাজার মূল্য এক লক্ষ ষাট হাজার টাকা।” মিসেস নাহার ঘোরের মধ্যে পড়ে যান। নেড়েচেড়ে দেখার পর তিনি শতভাগ নিশ্চিত হন যে স্বর্ণের বারটি খাঁটি। দ্বিতীয় রিকশাওয়ালাটি আশ্চর্য হয়ে বলে, “এটা তো সোনারবার। তুই তো বেটা বড়লোক হয়ে গেলি।”
প্রথম রিকশাওয়ালা কথার খেই হারিয়ে ফেলে বলে “আমি এখন কি করবো? এক কাজ করি আর রিকশা চালামুনা, এইডা বিক্রি কইরা গ্রামে যাইয়া বোনরে বিয়া দিমু।” দ্বিতীয় রিকশাওয়ালা বলে “আরে বেটা তোরে তো মানুষ ঠকাইবো, আর তোরে কেউ বিশ্বাস করবোনা। তার চেয়ে বরং আপাই বায়তুল মোকাররমে যাক। সেখান থেইকা তোরে খুশি হইয়া যা দেয় সেইডা তোর লাভ।” প্রথম রিকশাওয়ালা মিসেস নাহারের দিকে তাকায়। মিসেস নাহার বলেন, “না না আমি নিবোনা”। দ্বিতীয় রিকশাওয়ালা বলে “আপা ওতো গরিব মানুষ, ওতো কিছু বুঝেনা। তার থেইকা আপনি এইডা নিয়া ন্যান। আর ওরে খুশি হইয়া কিছু দ্যান। আর ওখান থেইকা আমিও কিছু নিমুনে।”
মিসেস নাহার বলে, “আমার কাছে এখন কোন টাকাও নাই, অলংকারও নাই”। তিনি কাউকে ফোন দিতে উদ্যত প্রথম রিকশাওয়ালা বলে, “আপা কাউরে ফোন দিয়েন না, পুলিশ আসলে আবার আমাগো সোনা চোরা-কারবারি কইয়া জেলে দিবো”। দ্বিতীয় রিকশাওয়ালা বলে, আপা আমি বরং আপনেরে বাসায় নিয়া যাই, সেইখান থেইকা টাকা পয়সা যা পারেন দিয়েন। আমি আপনেরে আবার নিয়া আইসা ওর থেইক্যা সোনার বারটা নিয়া আপনেরে দিমু।”
মিসেস নাহার এবার বিশ্বাস করে বসে। গরীব লোকটির সাহায্যের জন্যও মনটা ভারাক্রান্ত হয়। মিসেস নাহারের সম্মতিতে দ্বিতীয় ভাড়াকৃত রিকশাটি তার বাসার দিকে চলতে থাকে। তিনি ভাবতে থাকেন, গোল্ডবারটি বিক্রি করে গরীব দুখীর জন্য অন্তত কিছু একটা করা যাবে।” ভাবতে ভাবতে রিকশা তার এপার্টমেন্টের নিচে এসে থামে। বাসায় উঠে সন্তোর্পনে ব্যাগে কিছু স্বর্ণালংকার ভরে বের হয়ে যেতে থাকেন।
মিসেস নাহারের ব্যবসায়ী স্বামী জনাব হোসাইনের যদিও এই ভরদুপুরে বাসায় না থেকে অফিসে থাকার কথা। তবে আজ কি একটা কাজে বাসায় আছেন। তিনি মিসেস নাহারকে আবার বাইরে বেরুতে দেখে প্রশ্ন করেন কোথায় যাচ্ছে সে? মিসেস নাহার খানিকটা এড়িয়ে বের হয়ে যাবার পরোক্ষনেই চিন্তা করেন, অন্তত তার স্বামীর সাথে বিষয়টা শেয়ার করা দরকার। তিনি সব খুলে বলেন।
জনাব হোসাইন আশ্চর্য হয়ে বলেন “তুমি কি এখনো বুঝতে পারছোনা?” মিসেস নাহার বিরক্ত হয়ে ভাবতে থাকেন, “না বলাটাই ভালো ছিলো”। জনাব হোসাইন, তাকে আলতো ধমকের সুরে বলেন, “তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেলো? তুমি কি এখনো বুঝতো পারছোনা যে তুমি প্রতারক চক্রের খপ্পরে পড়তে যাচ্ছো? মিসেস নাহারের ঘোর কাটে। তিনি অবাক হয়ে ভাবেন তার মত মানুষকেও কিভাবে প্রতারক চক্রের খপ্পরে পড়তে হচ্ছিলো। তিনি ইন্টারকমে গার্ডকে বললেন রিকশাওয়ালাকে চলে যেতে। আর সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞতাবোধ জ্ঞাপন করলেন।
এখন কয়েকটি ভাবনার বিষয় বা অনুমান সামনে চলে আসে-
১. পুরো ঘটনাটিই দুর থেকে প্রতারক চক্র অবলোকন করছিলো। আর রিকশাওয়ালা দুটি কেবল নাটকের চরিত্রায়ণ করছিলো।
২. ঘটনাটিকে বিশ্বাসযোগ্য করার জন্যই স্বর্ণবারটি অবশ্যই খাঁটি ছিলো, তাই প্রথম রিকশা ওয়ালা কখনোই টার্গেটকৃত ব্যক্তিকে নিয়ে কোথাও যায়নি স্বর্ণবারটি খোয়ানোর ভয়ে।
৩. মিসেস নাহার ফিরে আসার আগেই প্রথম রিকশাওয়ালা লাপাত্তা হতো এবং অলংকার অথবা নগদ টাকা পয়সা নিয়ে আসার পথে মিসেস নাহারকে ছিনতাইয়ের সম্মুখীন হতে হতো কিংবা টানা পার্টির খপ্পরে পড়তে হতো।
৪. তৎক্ষনাত যদি টাকা, স্বর্ণালংকার দিয়ে বারটি নেওয়াও হতো, তবুও কিছুদুর যাবার পর ওই চক্রই বারটি ছিনতাই করতো।
অথবা
৫. স্বর্ণবারটি নকল ছিলো।
রাজধানীতে অনেক আগে থেকেই শক্তিশালী একটি প্রতারক চক্র বিভিন্ন পন্থায় প্রতারণার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছথেকে মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, অলংকার, হাতের আলগা জিনিসপত্র প্রভৃতি হাতিয়ে নিচ্ছে। এতে কখনও কখনও যাত্রীরা আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি শারিরীক ভাবেও আক্রান্ত হচ্ছেন। একই প্রতারক চক্র সময়ের সাথে সাথে ভোল পাল্টে বেছে নিচ্ছে নানা রকম আধুনিক ও অভিনব কৌশল।
শক্তিশালী এই প্রতারকচক্র আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে আটক হলেও টাকার বিনিময়ে ছাড়া পেয়ে অথবা স্বল্পকালীন কারানিবাসের পর আবারো ফিরছে পুরোনো রাস্তায়। যদিও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় তাদের কার্যক্রমে বিঘ্নঘটে ঠিকই তবে তৎক্ষনাতই কৌশল পাল্টে ফেলে তারা।
তবে আশার কথা হচেছ, মানুষ আগের থেকে অনেক বেশি সতর্ক হয়ে গেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও আগের থেকে বেশি তৎপর এবং অচিরেই এই প্রতারক চক্রের দিন শেষের পথে।
(মতামত একান্তভাবে লেখকের নিজস্ব। টাইমনিউজবিডির সম্পাদকীয় নীতিমালার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই)





