এক.

লালমনিরহাট থেকে বছর তিনেক আগে ঢাকায় এসেছিলেন জরিনা ও হাবলা বেগম। এর পর থেকে দুই বোন বাসাবাড়িতে কাজ করে জীবনযাপন করছিলেন। যা আয় হয় তা চলে যায় পেট চালাতেই। ঈদ এলে একটি নতুন কাপড় কেনার সাধ্য হয় না তাদের।

এরই মধ্যে খবর পান রাজধানীর ফকিরাপুল ১০৫ নম্বরে মালেক সাহেবের বাড়িতে যাকাতের কাপড় বিতরণ করা হবে। খবর শুনে সকালেই ওই বাড়ির সামনে গিয়ে লাইনে দাড়ায় দুই বোন। তাদের মতো লাইনে দাড়ায় ময়নাসহ আরও অনেক দরিদ্ররা।

দুপুরের মধ্যেই লাকি সেভেন নামে ভবনটির নিচতলা থেকে সাত তলা পর্যন্ত মহিলাদের লাইন হয়। সময় যতো গড়াতে থাকে, মহিলাদের সংখ্যাও বাড়তে থাকে। দীর্ঘ লাইনে চাপাচাপি আর গরমে হাসফাস অবস্থা। এর পরও কাপড় বিতরণ শুরু করেনি মালেক সাহেবের পরিবার।

একপর্যায়ে তিন তলা ও চার তলায় কিছুটা হৈ চৈ শুরু হয়। এসময় বাড়ির তত্বাবধায়ক আক্তারের নির্দেশে ধাক্কা দিয়ে মহিলাদের সরিয়ে দেয়ার সময় হুড়োহুড়ি শুরু হয়। এতে পদদলিত হয়ে ময়নাসহ নিহত হন তিন নারী। আহত হন অন্তত ১০ জন।

নিহতরা হলেন-ময়না (৩০), জরিনা (৩৬) ও সাহেরা। তারা এসেছিলো নতুন কাপড় নিতে। নতুন কাপড়ই পেয়েছে তবে ঈদের নয়, কাফনের কাপড়।

ঘটনাটি ঘটেছিলো ২০১২ সালের ১৬ আগস্ট। মালেক সাহেবের পরিবারের সদস্যদের আসামি করে মামলা করে পুলিশ। ২ বছরে এ মামলার অগ্রগতি কি হয়েছে? এমন প্রশ্নে-মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা মতিঝিল থানার উপ পরিদর্শক কবির হোসেন জানান, ওই ঘটনায় সব আসামিকে দায়ী করে চার্জশিট দেয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, তিন নারী নিহতের ঘটনা তদন্তে আসামিদের অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেছে। কারণ তারা সারাদিন কেন লাইনে দাড় করিয়ে রাখবে। যারা আসছে তাদের কাপড় দিয়ে বিদায় দিবে। তাছাড়া পুলিশের সহায়তা নিতেও পারতো।

গত দুই বছর আগে যখন মর্মান্তিক এই ঘটনাটি ঘটে, তখন পত্র-পত্রিকা খুব গুরুত্ব দিয়ে খবরটি প্রকাশ করে। অনেকেই মানবিক রিপোর্ট করে-সামান্য একটি নতুন কাপড় নিতে এসে জরিনাদের দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়ার ঘটনা নিয়ে।

তখন একটি অনলাইন পত্রিকা লিখেছিলো-হয়তো এর আগে জীবনের সঙ্গে কতই না সংগ্রাম করেছেন, কিন্তু এখন আর তাকে সেই যন্ত্রণা ভোগ করতে হবে না।

শোষণ-শোষক নিয়ন্ত্রিত এই ভোগবাদী সমাজের নিষ্ঠুর বিড়ম্বনার শিকার এই সকল মানুষেরা সামান্য একটু সহযোগীতা নিতে এসে লাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছে।

জাকাতের কাপড় শাড়ি-লুঙ্গি বা টাকা নিতে আবারও তারা যাবে লাইন দিতে অন্য কোনো মালেক মার্কেটে! আবার ঘটবে এরকম ঘটনা, মরবে অসহায় মানুষ, মিডিয়াকর্মী আর পুলিশ ছুটে যাবে। আবার লাশ যাবে মর্গে, মানবিক রিপোর্ট হবে পত্রিকার পাতায়।

দুই.

পত্রিকাটির ওই ভবিষ্যতবাণী যে কতটা সত্য ছিলো তার প্রমাণ দিলো ২০১৪ সালের ২৫ জুলাই।

শুক্রবার সকাল বরিশাল নগরীর কাটপট্টি রোডে ‌খান এ- সন্স’গ্রুপের দেয়া যাকাতের কাপড় আনতে গিয়ে দুই নারীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।

নিহতরা হলেন- কর্ণকাঠি এলাকার ফজলে আলীর স্ত্রী ফিরোজা বেগম (৫০) ও রসুলপুরের মহনের স্ত্রী নুপুর বেগম (৩৫)।

এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও পাঁচজন। আহতদের শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এদের মধ্যে দুইজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

তিন.

আগের দিন ২৪ জুলাই মানিকগঞ্জে বসুন্ধরা গ্রুপের জাকাতের কাপড় নিতে গিয়ে মানুষের চাপে অসুস্থহয়ে দুই বৃদ্ধার মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া একই ঘটনায় আহত হয়েছেন ১০ জন দরিদ্র নারী। জেলা শহরের গার্লস স্কুলরোড এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

নিহতরা হলেন- সদর উপজেলার বারইল গ্রামের মোঃ আইনুদ্দিনের স্ত্রী জামিলাবেগম (৫৩) এবং মানিকগঞ্জ পৌর এলাকার পূর্ব দাশড়া গ্রামের আব্দুস সালামের স্ত্রী ছাহেলা বেগম (৬২)

এভাবে একটি নতুন কাপড়ের জন্য আর কতো জারিনাদের জীবন যাবে। আমরা যারা নিজেদের যাকাত দেয়ার জন্য উপযুক্ত মনে করি তারা কী ঢোল না পিটিয়ে যাকাত দিতে পারি না। কেন এত হট্টগোল করে কাপড় বিতরণ করতে হবে। সমাজে নিজেকে বড় করে তুলে ধরতে, বাহাদুরি দেখাতে।

এতে হয়তো কিছুটা বাহাদুরি করা যায় কিন্তু পরকালীন কল্যাণ বয়ে আনবে না।

যাকাতের গুরুত্ব:

যাকাত- ইসলামের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিধান। কুরআন শরীফে আল্লাহ তা’আলা যখনই নামায আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন, পাশাপাশিঅধিকাংশ ক্ষেত্রে যাকাত আদায়েরও নির্দেশ দিয়েছেন। বলেছেন, “নামায কায়েম করো এবং যাকাত আদায় করো”।

কুরআনের শরীফের একেবারে শুরুর দিকে, সূরা বাক্বারায়, হেদায়াতপ্রাপ্ত মুত্তাকীদের পরিচয় দিতে গিয়ে আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, “…আমার দেয়া রিযক হতে যাকাত প্রদান কর”। এ আয়াত থেকে প্রমাণিত হয়যে, আল্লাহর ভয় অন্তরে লালন করা ও হেদায়াতের পূর্ণতায় পৌঁছুতে যাকাতপ্রদানের কোনো বিকল্প নেই।

আবু হুরায়রা থেকে বর্নিত, নবী বলেছেন, যে আল্লাহ কর্তৃক ধনবান হয়েছে অথচ যাকাত দেয়নি, কেয়ামতের দিন তার সমস্ত সম্পদ একটা ভয়ংকর বিষাক্ত সাপের আকার নিয়ে তার গলা পেচিয়ে থাকবে, আর সে লোকটির গালে কামড়াতে কামড়াতে বলতে থাকবে- আমি তোর সমস্ত সম্পত্তি । সহি বুখারী, বই -২৪, হাদিস-৪৮৬

আবু সাইদ বর্নিত, যাকাত তাদের জন্য প্রজোয্য নয় যাদের পাঁচটি রৌপ্য মূদ্রা বা পাঁচটি উট বা পাঁচ ওয়াস্ক ( প্রায় ৯০০ কিলোগ্রাম) এর সমান বা এর বেশী সম্পদ নেই। সহি বুখারী, বই-২৪, হাদিস-৪৮৭

উপরোক্ত হাদিস দ্বারা পরিস্কার ভাবে বোঝানো হচ্ছে যারা সম্পদশালী তারাই যাকাত দেবে আর কত সম্পদ থাকলে একজন মুসলমানের জন্য যাকাত বাধ্যতামূলক করা হয়েছে তাও পরিস্কারভাবে বলা আছে।

কোরআন ও হাদিসের আলোকে পর্যালোচনা করলে এটা পরিস্কার যে আপনি যাকাত দিবেন আপনার স্বর্থে। আপনাকে দিতে হবে, এটা বাধ্যতামূলক (ফরজ)। কিন্তু এটা যারা নিবেন তারা আপনার দেয়া যাকাত নাও নিতে পারেন। তারা অন্য কারও থেকে নিতে পারেন। এজন্য সুষ্ঠুভাবে যাকাত দেয়া, যাকাতদাতারই দায়িত্ব।

তাই যাকাত নিতে গিয়ে মৃত্যুর খবর শুনে-প্রশ্ন আসতেই পারে, এমন যাকাত দেয়ার প্রয়োজন কতটুকো যে যাকাত জীবন কেড়ে নেয়।

ঢাকা, ২৫ জুলাই, টাইম নিউজবিডি.কম, জেএ