হঠাৎ করেই আমি সাহিত্য আড্ডায় হাজির হয়েছি। মূলত সে আড্ডায় হাজির হওয়ার আমার কোন ইচ্ছা ছিল না বা আমি নিমন্ত্রিতও নই। কিন্তু জরুরি কাজে মোহাম্মদপুরে গিয়ে দেখি জমজমাট সাহিত্য আড্ডার আয়োজন। তখনও মূল পর্ব শুরু হয়নি। সবে ভোজন পর্ব শুরু হয়েছে। তেহারি পর্ব বললেও একেবারে ভুল বলা হবে না।

যাহোক, সময় মতই হাজির হয়েছি কোন প্রকার নিমন্ত্রণ ছাড়াই। আর একটু দেরী করলে হয়তো ভোজন পর্বটা মিসই হয়ে যেন। পেটে ক্ষুধা নিয়ে আড্ডাটা বেসুরো হতো বলেই মনে হয়। যাহোক বাঁচা গেছে। একেবারে তীর্থের কাকের মত নগদান হাজির হয়েছি।

তেহারী সারার পর্বেই এক ভদ্র মহিলাকে আমার বেশ পরিচিত মনে হলো। কিন্তু কোনভাবেই চিনতে পারছিলাম না। মনে হয় জীবনের কোন এক পর্বে তার সাথে আমার এক সখ্যতা ছিল। তবে কবে, কোথায় তার সাথে এমন গাটছাড়াটাও হয়েছিল, তা আমি কোনভাবেই ঠাহর করতে পারলাম না। তাই সুযোগ বুঝেই মাঝে মাঝে তাকাচ্ছিলাম। সময় সময় ভদ্রতার মাত্রাটা বোধহয় একটু হলেও লঙ্ঘিত হচিছল। কারণ, একজন সমবয়সী মেয়ের দিকে ঘনঘন এভাবে পর্যবেক্ষণ করা ভদ্রতার সীমার মধ্যে তো পরেই না; বরং শিষ্টাচার বিরোধী বলেই অন্তত আমার মনে হয়।

কিন্তু আপ্তবাক্যটা এখন মনে হলেও সেদিন কিন্তু মনে করতে পারিনি। যখন ভদ্র মহিলা দৃষ্টিটা আমার দিক থেকে সরিয়ে নিচ্ছিলেন, আমি তখন তার দিকে হেবলার মত চেয়ে তার পরিচিতি আবিস্কারের ব্যর্থ চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু বিষয়টি বোধ হয় ভদ্র মহিলার গোচরেই এসেছিল। তাই তিনি আমার দিকে খুব একটা তাকাচ্ছিলেন না। যাতে আমি নির্বিঘ্নে তাকে পর্যক্ষেণ করতে পারি। কেন জানি এমনটাই মনে হয়েছিল আমার কাছে।

এ অবস্থাটা বেশীক্ষণ চলতে দেয়া সমীচিন মনে করলেন না ভদ্র মহিলা। তিনি আমার দিকে ধীরে এগিয়ে এলেন। একেবারে গা ঘেঁসে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘আপনি অমুক না ?’ তাৎক্ষণিক জবাব দিয়ে বললাম, হ্যা। আপনি না ‘ মেঘে মেঘে বেলা’ উপন্যাসের লেখক’?

ভদ্রমহিলার কথায় যারপর নাই বিস্মিত হলাম। আমি যাকে কোন ভাবেই চিনতে পারছিলাম না, তিনি আমার সব কিছুই অবলীলায় বলে যাচ্ছেন। বিষয়টা রীতিমত রহস্যের বলতে হবে। তিনি আর দেরী না করে নিজের পরিচয় দিলেন। আমার স্মৃতির মানসপটে ভেসে উঠলে পাঁচ বছর আগের স্মৃতি। যা এতোক্ষণ ছিল বিস্মৃতির অন্তরালে।

আমার উপন্যাস প্রকাশের সময় মাঝে মাঝে বাংলাবাজার যেতে হতো। সে সময় বেশ কিছু কবি, সাহিত্যিক ও লেখকদের সাথে পরিচয় ও সখ্যতা জমেছিল। ভদ্র মহিলার সাথে আমার বাংলা বাজারে প্রকাশনের টেবিলেই প্রথম পরিচয়। তিনি একজন মহিলা কবি। নামের আদাক্ষরটা ‘লি’। স্বামী এমবিবিএস ডাক্তার বলেই জেনেছিলাম। তার বিশ্ববিদ্যালয় পড়া ছেলে-মেয়েও আছে বলে শুনেছি। সে সময় তার একটি কবিতার বইও প্রকাশ হয়েছিল বাংলা বাজারের মুন্নী প্রকাশনী থেকে। তিনি কবিতার বইটা আমাকে উপহারও দিয়েছিলেন।

যাহোক পরিচয় দেয়ায় তাকে ভালভাবেই চিনতে পারলাম। কুশলাদিও বিনিময় হলো। সেই দিনের সে মহিলা কবি আর আজকের মহিলা কবির মধ্যে একটা বিস্তর ফারাক লক্ষ করলাম। পাঁচ বছর আগে তার সাথে যখন আমার দেখা-সাক্ষাৎ ও সখ্যতা ছিল তখন ভূষণ বিন্যাস আর আজকের বিন্যাসটা সম্পূর্ণ আলাদা। আগে দেখেছি তিনি কবিতা প্রেমী ছিলেন। কবিতার মধ্যেও কাব্যের প্রতি অকৃত্রিম ভালবাসায় সার্থকভাবে ফুটে উঠেছে। তিনি কবিতার প্রতিটি শব্দ ও লাইনগুলোকে মনের মাধুরী মিশিয়ে সাজিয়েছিলেন।

এখনকার কবিতায় তিনি কীভাবে কবিত্বকে জাহির করছেন তা অবশ্য আমি জানি না। কিন্তু তাদের দিকে তাকালেই মনে হচ্ছে যে তিনি বোধহয় কবিতায় তার সাহিত্যরস, কাব্য সৌন্দর্য ও অলঙ্করণ বাদ দিয়ে নিজেকেই অলঙ্কৃত করতেই মনোনিবেশ করেছেন। মূলত তার কাব্য প্রতিভা ও কবিত্ব ফুটে উঠেছে দেহাবয়বের মধ্যেই। মনে হয় ডাক্তার স্বামী তার ঠিকমত চিকিৎসাটা দিতে পারেন নি। ভাবটা এরকম যে, মহাস্থান গড় আর মনয়ামতির চর একেবারে একাকার। ধানে-চালে-ঢালে সমান। হবুচন্দ্রীয় রাজ্যের রাজকুমারী!

কিছুক্ষণের মতেই কুশল বিনিময় ও আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলো। তিনি সহাস্যে আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনি কী আমার দিকে বারবার তাকাচ্ছিলেন?’

আমি তো অনেকটা ভয়ই পেয়ে গিয়েছিলাম। কারণ, ওভাবে একটা মেয়ের দিকে অসভ্যের মত তাকানো বড় ধরনের অপরাধই হয়ে গেছে বলতে হবে। মনে হলো ঐ যা এবার বোধহয় ফেঁসেই গেছি! এ পাপের প্রায়াশ্চিতটা কীভাবে করতে হয় তা করুণাময়ই ভাল জানেন।

আমি বাস্তবতা অস্বীকার না করে অপরাধের আত্মস্বীতৃতি দিয়ে বললাম, ‘হ্যাঁ দেখছিলাম, একটু...। তিনি আমাকে কথা শেষ করতে না দিয়ে বললেন, ‘বারবার চোখ ফেরাচ্ছিলেন কেন’? তার একথায় কিছুটা হলেও সাহসী হয়ে বললাম, ‘একজন মেয়ের দিকে এভাবে তাকিয়ে থাকাটা ভদ্রচিত মনে হয়নি’।

তিনি সজোরে হেসে দিয়ে বললেন, ‘আপনি না লেখক-সাহিত্যিক। আপনি তো কবিও। যদি আপনি নারীকে ভালবভাবে অবলোকন, উপলব্ধি করতে না পারেন, আর নারীর রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিচরণ করতে না পারেন তাহলেও আপনি লেখনীর উপাদান ও সম্ভার সংগ্রহ করবেন কোথা থেকে? মনের মধ্যে কাব্যিক দ্যোতনা সৃষ্টি হবে কীভাবে? নারীই তো সাহিত্যের বড় অনুসঙ্গ...............!

মহিলা কবির মুখের হাসি ও আনন্দের কোন কমতি ছিল না। কিন্তু আমি মাথাটা কিছুটা নিচুই করে নিয়েছিলাম। মনে মনে ভাবছিলাম, কবি-সাহিত্যিক হতে গেলে বোধ হয় রমণীমোহনই হওয়া চাই। (ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

বি.দ্র. মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব। টাইমনিউজবিডির সম্পাদকীয় নীতিমালার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই।